বাস্তব কাহিনি “সাবাতিনার কী হয়েছিল?” অবলম্বনে লিখিত গল্প।
এখানে পড়ুন: “সাবাতিনার কী হয়েছিল?
এক শীতার্ত ডিসেম্বরে নিঃসঙ্গ এক মেয়ের রাতের ট্রেনযাত্রায় ছায়ার মতো পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল এক অচেনা মানুষ। মিতবাক, বিনয়ী, অথচ আশ্বাসদায়ী। কোনো প্রশ্ন করেনি, কোনো উত্তর চায়নি, শুধু সুরক্ষার ছায়া হয়ে পুরোটা সময় পাশে ছিল।
শীতার্ত এক আঁধারমাখা ভোরে লোকটা হয়ে উঠেছিল আমার অচেনা আশ্রয়।
লোকটা কেন বলছি? তার কী নাম নেই? নামতো থাকবেই তবে আমি তার নামটা জানতাম না, ফোন নম্বরও না। শুধু তার দেওয়া একটা ওমানি টাকার নোট ছিল আমার পার্সে; যেটা আমি আজও যত্ন করে রেখে দিয়েছি।
তারপর তো কেটে গেছে কয়েক বসন্ত, কত ব্যস্ততা, আর কত বিস্মৃতি। তার সঙ্গে আমার আর দেখাও হয়নি। এরপর, একদিন হঠাৎ করেই আমার আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্কলারশিপে উচ্চশিক্ষার ডাক আসলো। বই-খাতা, জামাকাপড়ের ব্যাগ গুছিয়ে পাড়ি জমালাম আরেক মহাদেশে। একদম নতুন একটা জীবনে প্রবেশ করলাম!
দিনের পর দিন কেটে গেল লাইব্রেরি, ক্লাস, ক্যাম্পাস আর কফির কাপের ভেতর। তার কথা কখনো ঝলকে মনে পড়লেও, সময় তাকে পুরোপুরি স্মৃতিতে আটকে রাখার অবকাশ দিত না। আবার মাত্র কয়েক ঘন্টার পরিচিত একটা লোকের জন্য অপেক্ষা করাটাও সমীচিন লাগেনি!
এভাবে দিন গিয়ে মাস, মাস কেটে বছর গড়ালো চিরায়ত রুটিনে। দুই বছর পর দেশে ফিরলাম। ফেব্রুয়ারি তখন সবে শুরু, আর বইমেলার মৌসুম। অমর একুশে বইমেলা; সে এক অমোঘ টান। বইয়ের ঘ্রাণ আর কাগজে ছাপা অক্ষরের প্রেমে আমি চিরকাল দুর্বল। বরাবরের মতোই একদিন বইমেলায় ভিড়ের ভেতর একেকটা স্টল ঘুরে দেখছি, দেখে দেখে নতুন বই কিনছি, পছন্দের লেখক পেলে অটোগ্রাফও নিচ্ছি।
ঘুরতে ঘুরতেই গিয়ে পড়লাম ভীড়ে ভর্তি এক স্টলের সামনে। দূর থেকে দেখলাম স্টলের এক কোণে এক তরুণ লেখক দাঁড়িয়ে। তার বই কিনতে স্টলের সামনে পাঠক-পাঠিকাদের মোটামুটি লম্বা লাইন লেগে গেছে। বেশ! পাঠকেরা বই কিনে লেখকের সঙ্গে ছবি তুলছে।
অচেনা কিন্তু জনপ্রিয় লেখক! ইন্টারেস্টিং! চিনে রাখতে হয়। সেই ভেবে কিছুটা উঁকিঝুঁকি মারার চেষ্টা করলাম। ভীড় ঠেলে একটু কাছে গিয়ে লেখকের মুখ দেখার সাথে সাথেই বিদ্যুৎ বেগে স্মৃতি-বিস্মৃতির আবগাহনে লেখকের মুখটা যেন কোথাও দেখেছি কী দেখিনির টানাপোড়েন! মনে করতে না পেরে যেই ধরে নিয়েছি যে, 'না, চিনিনা!' তখনই তার কণ্ঠস্বর...
একটা গলার শব্দে যেন সময় থমকে গেল। হাতছানি দিয়ে সে আমায় ডাকছে, 'হ্যালো ম্যাডাম, আপনাকে আমি কোথাও দেখেছি মনে হচ্ছে...'
চোখ তুলে ফের তাকাতেই কণ্ঠটা যেন বুকের অতল থেকে উঠে এলো। সেই ঢাকা-পার্বতীপুর ট্রেন, পার্বতীপুর স্টেশনের কুয়াশাভেজা শেষ রাত্রির চা, ভোরবেলার ঠান্ডা বেঞ্চ, হাতে থাকা একটা ওমানি নোট। সব স্মৃতি একসাথে হুড়মুড় করে নেমে এলো।
অপার আনন্দে সম্বিত ফিরে এলো।
আমি মুগ্ধ বললাম, 'আপনাকে আমি চিনি।'
কত দিন পরে! আবার দেখা! দু’জনেই অবাক, বাকরুদ্ধ। বুঝতে পারছিলাম এক নীরব আত্মিক চেনা অনুভূতি হচ্ছে আমাদের দু’জনের মধ্যেই। জনারণ্যে তখন আমরা একা।
নীরবতা ভেঙে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কফি খাবো কিনা। একটু দূরে ছিল ছোট একটা কফির দোকান। আমি মাথা নেড়ে সম্মতি দিলাম। তারপর আস্তে আস্তে গল্প জমতে লাগলো। পার্বতীপুর থেকে আমেরিকা, চায়ের দোকান থেকে বইমেলার ভিড় পর্যন্ত। জানলাম। জানালাম।
কতদিন ধরে আপনমনে আওড়ানোর পর অবশেষে তাকে বলার অবকাশ পেলাম, 'সেই রাতের জন্য ধন্যবাদ; যা আমাকে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছে।'
এটুকু বলে আমি চুপ করে গেলাম, আর কী বলবো! কয়েক মূহুর্তের নীরবতা ভেঙে তিনি হেসে বললেন, 'আপনার মতো কাউকে সেই রাতে পাশে পাওয়াটাও আমার জন্য কম কিছু ছিল না।'
'ওমা, তাই নাকি?'
কফির কাপ হাতে নিয়ে মৃদু পায়ে আমরা লেকের পারে বেঞ্চের দিকে হাঁটলাম। সন্ধ্যার কুয়াশা না থাকলেও বাতাসে তখনও ফেব্রুয়ারির নরম ঠান্ডা।
আমি বেঞ্চে বসে পড়লাম। তিনি একটু সময় নিলেন। মনে হলো ভাবছেন আমার পাশে বসা ঠিক হবে কিনা। অতপর তিনি বসলেন। আমাদের কথা এবার লতা হলো।
মেলা শেষে হেঁটে টিএসসি। সেখান থেকে সেদিনের মত আলাদা হলাম। রাতে কিছু টেক্সটে আরো কথা। এরপর প্রায় দিন বইমেলা, শহরের ছোট্ট ক্যাফে, ধানমণ্ডির লেকপাড়, রমনার পার্কের ওয়াকওয়ে।
বলতে দ্বিধা নেই, অস্পষ্ট ভালোলাগার আবেশ প্রেম হয়ে ধীরে ধীরে ভাষা খুঁজে পেল। এমন একদিন, সেই একই রকম সন্ধ্যায়, সে আমার হাত ধরে বললো, ' সাবাতিনা, চলো, আমরা একসঙ্গে একবার ট্রেনে উঠি।'
আমার শ্বাস-প্রশ্বাস বড় হতে থাকলো। হৃদয়ে উঠলো ঝড়, মনে লাগলো দোলা। তার কথা যেন আমারকানে রবীন্দ্রনাথের গানের মত বাজতে লাগলো।
আমি বললাম, 'হ্যাঁ, এবার আর আলাদা গন্তব্যে নয়।'
সেই কবে একটা ট্রেনযাত্রায় যে গল্প শুরু হয়েছিল সে তার পরিণতি আজ পেল। আজ আমরা দু’জনই ভালোবাসার সেই ট্রেনটাতে উঠেছি একসাথে।
আর পাশে বসে থাকা এই মানুষটা এখন ‘অপরিচিত সহযাত্রী’ নয়, বরং আমার জীবনের সবচেয়ে পরিচিত, প্রিয় নাম।
আর সেই ওমানি টোকেনটা? এখনো আছে। আমাদের বসার ঘরের শোকেসে। ভালোবাসার প্রথম চিহ্ন হিসেবে। একটা কফির চুমুক আর পুরোনো স্মৃতির পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে ওটাই এখন আমাদের সবচেয়ে প্রিয় গল্প।
এখানে পড়ুন: সাবাতিনার গল্প: আবার দেখা