সাময়িকী

হুমায়ুন স্যারের হিমু নাকি অন্য কেউ


  • নাবিলা তাসনিম স্নেহা  |
  • প্রকাশ : ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৭:৩০
 হুমায়ুন স্যারের হিমু নাকি অন্য কেউ
ছবি: এআই

আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্রী। ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, লাইব্রেরি, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে জীবন। আমার হল থেকে ক্যাম্পাসে যেতে হয় নিউমার্কেট-নীলক্ষেত পাড়ি দিয়ে। একটা ভরপুর দুপুরে এই রাস্তা পাড়ি দেওয়াটা যে কতটা বিতিকিচ্ছিরি, তা যারা ওদিকে যায় না, তাদের বলে বোঝানো যাবে না। ঢাকা শহরের দুপুরগুলোকে আমি যে কখনো পছন্দ করি না, তার জন্য এই একটা কারণই যথেষ্ট।

সে রকম এক দুপুরবেলা। আমি একজনের জন্য গেছি টিএসসি। সড়কদ্বীপের উল্টোদিকের চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে রৌদ্রে ভাজাভাজা হচ্ছি। যার আসার কথা, সে কোথায় কে জানে! মোবাইলে পাওয়া যাচ্ছে না। রোদের তাপে চারপাশ ঝাপসা। 

হঠাৎ দেখি, রংজ্বলা হলুদ পাঞ্জাবি পরা একজন। খালি পায়ে হাঁটছে! হাতে বা কাঁধে কোন ব্যাগ বা ঝোলা নেই। আমার সামনে এসে থামল। আরে, এ তো দেখতে পুরো হিমু সাহেব! 

“তুমি কি অপেক্ষা করছ?” সে জিজ্ঞেস করল। 

“হ্যাঁ।” 

“কার জন্য?” 

আমি একটু ভেবে বললাম, “হয়তো নিজের জন্য।” 

লোকটা মৃদু হাসল। সেই হাসিতে শান্তি ছিল।

লোকটা হেঁটে চলে যাচ্ছে মিলন চত্বরের দিকে। পিছু নেব নাকি? না চিনে না জেনে আমাকে প্রশ্ন করে কোন সাহসে? কিন্তু আমি তো অপেক্ষায় আছি একজনের। 

টিএসসিতে আমার অপেক্ষা নিস্ফল হলো। যার আসার কথা, সে আসেনি। আমি চলে এলাম লাইব্রেরিতে। একটা মোটাসোটা বইয়ে মন বসাতে চাচ্ছিলাম। এ কী! হিমু সাহেব এখানে! 

পাশে বসে বলল, “মানুষ পৃথিবী বোঝার চেষ্টা করে, কিন্তু নিজের মনটা বোঝে না।” 

“আপনি কি সবসময় এ রকম কথা বলেন?” 

“সবসময় না। মাঝে মাঝে চুপ থাকি।” 

লোকটা আমার পিছু নিচ্ছে নাকি? বিরক্ত হওয়ার কথা ছিল আমার। কিন্তু বিরক্ত হতে পারছি কই? হিমু উঠে চলে গেল।

বিস্ময় বাকি ছিল। বিকেলে সামান্য কেনাকাটার জন্য শাহবাগ যাচ্ছি। 

চারুকলার আগেই হিমু বাবু দাঁড়িয়ে। 

“আপনি কি আমায় ফলো করছ?” 

হিমু স্বাভাবিক গলায় বলল, “না। যারা একই রকম একা, তারা বারবার একে অপরের সামনে পড়ে যায়।” 

আমি চুপ করে রইলাম। শেষ বিকেল। এখনো খরতাপ। ক্লান্ত লাগছে। আবার হিমুর থেকে ছুটি নিতেও ইচ্ছে করছে না। 

“তোমার চোখ লাল কেন? দুপুরে কেঁদেছিলে তাইতো? মাঝেমধ্যে কান্নাকাঁটি উত্তম।” 

“তাই নাকি?” আমি বলি। 

“চলো হাঁটি।” 

“কোথায়?” 

“পথ যেদিকে নিয়ে যায়।” 

“ঠিক আছে।” 

এরকম প্রস্তাব আমার জীবনে এই প্রথম। আমি কেমন করে রাজি হলাম কে জানে! 

হিমুর প্রস্তাব শুনে মনে হচ্ছে গরম কমতে শুরু করেছে। আকাশ মেঘে ছেয়ে যাচ্ছে। সহস বৃষ্টি এলো। হলুদ পাঞ্জাবিওয়ালার সঙ্গে আমি হাঁটছি। কাঁধের ব্যাগ বুকের কাছে টেনে নিয়েছি। বিনা-ছাতার লোকেরা দৌড়ঝাঁপ করে বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ছুটছে। 

হিমু খালি পায়ে কী সুন্দর বৃষ্টির পানিতে হাঁটছে। দেখে মনে হয়, এ তো স্বাভাবিক। 

হঠাৎ বলল, “তুমি জানো, বৃষ্টির একটা ভালো দিক কী?” 

“কী?” 

“এটা মানুষকে সাময়িকভাবে সমান করে দেয়। ধনী-গরিব সবার জামাকাপড়ই ভিজে যায়।” 

আমি হেসে ফেললাম। সে আমার হাসির দিকে তাকিয়ে রইল, যেন খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু দেখছে। হিমুর তো গন্তব্য নেই। আমি মনে মনে ভাবছিলাম আজিজ মার্কেটে গিয়ে ঢুকি। অথবা রিকশা নিয়ে হলে চলে যাই। হিমুকে কথাটা বলব মনে করে ঘাড় ঘুরালাম। 

কোথায় হিমু? নেই তো নেই। 

অবাক হলাম। তবে বিচলিত নই। স্যারের বইয়ে এভাবে লেখা আছে। হিমুরা এই ধারার। 

হলে ফিরে রুমমেটদের হিমুর কথা বললাম। 

ওরা বলল, “এটা ফেইক হিমু।” 

আসল হিমু নাকি ক্যাম্পাস-শাহবাগের দিকে আসার কথা নয় এই গরমের মধ্যে।

পরদিন কলাভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। 

“আমাকে খুঁজছ?” 

“হিমু।” 

“চলো।” 

“কোথায়?” 

“একটা বাড়ি দেখাব।”

“অন্যের বাড়ি দেখে কী হবে?” বললাম বটে, কিন্তু আমি জানি যে আমি যাচ্ছি। 

আজ মেঘলা দিন। যাচ্ছি আমরা। ফুলার রোড, পলাশী পার হয়ে, লালবাগের দিকে চলে এসেছি। গলি-উপগলির হিসাব রাখতে পারছি না। কোথায় যাচ্ছি? কার সঙ্গে যাচ্ছি? অবশেষে ভাঙা লোহার ফটকের সামনে আসা গেল। ফটকের ওপরে মরিচা ধরা ফলকে লেখা, ‘নীলমঞ্জিল, ১৯৩১’। বাড়িটা দেখে মনে হলো, বহু বছর ধরে কেউ এখানে থাকেনি। জানালার কাচ ভাঙা। দেয়ালে বটগাছের শিকড় নেমে এসেছে। চারপাশে নীরবতা। 

 “এখানে কেন এসেছি?”

“আর তিন মিনিট,” হিমু বলল। তার হাতে ঘড়ি নেই যদিও। 

“কিসের তিন মিনিট?” সে উত্তর দিল না। 

আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম। 

দুপুর ঠিক বারোটা বেজে ত্রিশ মিনিট হলো। কোনো বাতাস নেই। কেউ নেই। বাড়িটার গেট খুলে গেল নিঃশব্দে। 

“এসো।”

আমি কিছু না বলে পা বাড়াই। 

হিমু শান্ত গলায় বলল, “প্রতি মাসের শেষ বৃহস্পতিবার, ঠিক মধ্যদুপুরে এই দরজা পাঁচ মিনিটের জন্য খোলে।” 

“আপনি জানেন?” 

“হ্যাঁ।” 

“কেউ ভেতরে যায় না?”

 “যায়।” 

“তারপর?” 

হিমু আমার দিকে তাকাল। বলল, “তারা আবার ফিরে আসে। কিন্তু আগের মানুষ হয়ে আসে না।” 

আমি ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। ধীরে ধীরে বাগান পেরিয়ে সামনের ঘরের ভেতরে ঢুকলাম আমরা। সাবেকি বনেদি বাড়ি। ভেতরে ধুলো জমে আছে। মেঝেতে শুকনো পাতা। দেয়ালের রং উঠে গেছে। ঘরের একটা কোণা পরিষ্কার। প্রতিদিন কেউ এসে ঝাড়ু দিয়ে যায় বলে মনে হচ্ছে। ঘরের মাঝখানে একটা পুরোনো কাঠের টেবিল। 

“ওটা তোমার। খুলে দেখ।” 

“মানে?” হিমু চোখ দিয়ে অভয় দিল। 

টেবিলের ওপর একটা ডায়েরি। আমি হাত বাড়িয়ে ডায়েরিটা খুললাম। 

প্রথম পাতায় বড় বড় অক্ষরে লেখা, “সেনহা”। 

আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। 

প্রথম পাতায় লেখা, “আজ সেনহার বয়স সাত বছর। ও নদীর ধারে একা যাবে। ওকে বাঁচাতে হবে।” 

আমার হাত কাঁপতে লাগল। পাতা উল্টালাম। এক জায়গায় লেখা, “স্নেহা আজ কলেজে প্রথম ক্লাস করবে। ও খুব ভয় পাবে। কিন্তু কাউকে বুঝতে দেবে না।” 

আরেকটা পাতায়, “আজ স্নেহা কাঁদবে। কাঁদতে কাঁদতে মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। সে কাউকে কারণ বলবে না।” তারিখটা মিলিয়ে দেখলাম। একেবারে ঠিক তারিখ। সেদিন আমি অকূলপাথারে পড়া মানুষের মতো কেঁদেছিলাম। কারণটা কাউকে বলতে পারিনি। 

প্রতিটি পাতায় আমার জীবনের ঘটনা। অনেকগুলো আমার বাড়ির লোকেরা জানে। কিছু ঘটনা আমি ছাড়া আর কেউ জানার কথা নয়। জানেও না। আমার শরীর কাঁপছে। ডায়েরিটা বন্ধ করে হিমুর দিকে তাকালাম। 

“এগুলো কে লিখেছে?” 

হিমু দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। 

তারপর খুব আস্তে বলল, “আমি না।” 

“তাহলে?” “যে মানুষটা তোমাকে সবচেয়ে বেশি চেনে।” 

“সে কে?” হিমু উত্তর দিল না। 

ঘরের ভেতর কোথা থেকে শিশুর হাসির শব্দ ভেসে এল। আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। একটা ছোট্ট মেয়ে। সাত-আট বছরের বেশি বয়স হবে না। সাদা একটা ফ্রক পরে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে মিষ্টি হাসি। চিনতে পারলাম। চিনতেই হলো। এ যে ছোটবেলার আমি।

 “তুমি এত দেরি করে এলে কেন?” 

উত্তর দেওয়ার আগেই আমার আমিটা কোথায় যেন চলে গেল। 

হিমুও নেই। বাড়িটাও নেই। 

আমি দাঁড়িয়ে আছি কলাভবনের পূর্ব গেটের সিঁড়িতে। 

চারপাশে কত মানুষ। একটু আগে স্বপ্নে বা বাস্তবে দেখা ডায়েরিটা আমার হাতে ধরা। 

ধীরে ধীরে ডায়েরির শেষ পাতাটা খুললাম। এ

কটি লাইন লেখা আছে দেখতে পাচ্ছি: “যদি এই ডায়েরি সেনহার হাতে এসে থাকে, তাহলে হিমুর হাতে আর বেশি সময় নেই।”

 এই দুই দিন আমি কার সঙ্গে চলেছি? হিমু, নাকি হলুদ পাঞ্জাবির তরুণ মিসির আলী? মাথাটা ঘুরছে। ডাকসু ক্যান্টিনে যাই। একটু চা খাই। বন্ধুদের খুঁজি।  


ক্যাটাগরি: সাময়িকী

         

  রেটিং: ৫

এই বিভাগের আরও পোস্ট

শিউলিফুলেরা ও আমি

শিউলিফুলেরা ও আমি

  • দিলারা রহমান|
  •  ১২-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৪.১

পার্বতীপুরের পরের গল্প

পার্বতীপুরের পরের গল্প

  • আকমাল হোসাইন|
  •  ১১-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

অ্যারিস্টটলের কাছে আলেকজান্ডার কী শিখেছিলেন

অ্যারিস্টটলের কাছে আলেকজান্ডার কী শিখেছিলেন

  • ফারিয়া আক্তার জুঁহি|
  •  ০৬-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৩.৫

কে সেরাহ, সেরাহ

কে সেরাহ, সেরাহ

  • জাওয়াহ বিনতে মিজান স্বর্ণা|
  •  ০৪-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

 হুমায়ুন স্যারের হিমু নাকি অন্য কেউ

হুমায়ুন স্যারের হিমু নাকি অন্য কেউ

  • নাবিলা তাসনিম স্নেহা|
  •  ৩১-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

কেন আপন লাগে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল

কেন আপন লাগে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল

  • মোঃ আরাফাত হোছাইন|
  •  ৩০-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।