বিশ্বের প্রথম নারী সরকারপ্রধানদের পথচলা


  • জীবনজয়ী ডেস্ক  ঢাকা, বাংলাদেশ |
  • প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:২৯
বিশ্বের প্রথম নারী সরকারপ্রধানদের পথচলা
ছবি: এআই দিয়ে নির্মিত

একজন নারী যখন কোনো দেশের সরকারপ্রধান হন, তখন সেটি শুধু একটি রাজনৈতিক পদে আসীন হওয়ার ঘটনা থাকে না। অনেক সময় তা হয়ে ওঠে দীর্ঘদিনের সামাজিক ধারণা, রাজনৈতিক বাধা ও পুরুষতান্ত্রিক নেতৃত্বের প্রচলিত কাঠামোর বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মুহূর্ত।

কেউ এসেছেন স্বামীর মৃত্যুর পর রাজনীতির মঞ্চে, কেউ স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছেন, আবার কেউ বিজ্ঞানী বা গবেষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে পৌছেছেন। তাদের কেউ যুদ্ধের সময় নেতৃত্ব দিয়েছেন, কেউ অর্থনৈতিক সংস্কার করেছেন, কেউবা নারীর অধিকার ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন।


আধুনিক বিশ্বের রাজনীতিতে প্রথম সারির নারী সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে যারা ইতিহাস গড়েছেন, তাদের কয়েকজনের গল্প জেনে নেওয়া যাক হিস্ট্রি ডট কমের সৌজন্যে।


১. সিরিমাভো বন্দরনায়েকে, শ্রীলঙ্কা


১৯৬০ সালে সিরিমাভো বন্দরনায়েকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তখন শ্রীলঙ্কার নাম ছিল সিলন। তিনি ছিলেন আধুনিক বিশ্বের প্রথম নারী, যিনি নির্বাচনের মাধ্যমে কোনো সরকারের প্রধান হন।


রাজনীতিতে তার প্রবেশ ঘটে এর আগের বছর, এক মর্মান্তিক ঘটনার পর। প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তার স্বামীকে এক বৌদ্ধ ভিক্ষু হত্যা করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর সিরিমাভো বন্দরনায়েকে শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।


তিনি ১৯৬০ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত এবং পরে ১৯৭০ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার শাসনামলে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়া হয় এবং রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়।


তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারও পরবর্তী সময়ে অব্যাহত থাকে। তার মেয়ে চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী হন এবং ১৯৯৪ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।


২. ইন্দিরা গান্ধী, ভারত


ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর মেয়ে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে ভারতের প্রভাবশালী কংগ্রেস দলের গুরুত্বপূর্ণ নেত্রী হয়ে ওঠেন।


১৯৬৬ সালে তিনি দলের নেতৃত্বে আসেন এবং প্রধানমন্ত্রী হন। পরের বছর নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি পদটি নিশ্চিত করেন। এরপর আরও দুবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।


ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রতি দৃঢ় সমর্থন দেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব আরও শক্তিশালী হয়।


১৯৭৭ সালে জনঅসন্তোষের মুখে তিনি নির্বাচনে পরাজিত হন। তবে ১৯৮০ সালে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন। ১৯৮৪ সালে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে সেনা অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে তার নিজের দেহরক্ষীদের গুলিতে তিনি নিহত হন।


৩. গোল্ডা মেয়ার, ইসরায়েল


১৯৬৯ সালে গোল্ডা মেয়ার ইসরায়েলের চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী হন। তবে তার আগেই প্রায় ৪০ বছর তিনি দেশটির রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন।


ইউক্রেনে জন্ম নেওয়া গোল্ডা মেয়ার ছোটবেলায় যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন করেন এবং উইসকনসিনের মিলওয়াকিতে বেড়ে ওঠেন। পরে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজে অংশ নিতে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসিত ফিলিস্তিনে চলে যান।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি জায়নবাদী আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখপাত্র হয়ে ওঠেন। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করা মাত্র দুজন নারীর একজন ছিলেন তিনি।


প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আলোচনার চেষ্টা করেছিলেন মেয়ার। কিন্তু ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে ইয়োম কিপুর যুদ্ধ শুরু হলে সেই প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হয়। ১৯৭৪ সালে তিনি পদত্যাগ করেন। চার বছর পর, ১৯৭৮ সালে, লিম্ফোমা রোগে তার মৃত্যু হয়। ১৯৬৫ সালেই তার এই রোগ ধরা পড়েছিল।


৪. মার্গারেট থ্যাচার, যুক্তরাজ্য


পরিবারের মুদি দোকানের ওপরের একটি ফ্ল্যাটে বেড়ে ওঠেন মার্গারেট থ্যাচার। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি শিল্প রসায়নবিদ হিসেবে কাজ করেন। পরে রাজনীতিতে যোগ দেন।


রক্ষণশীল দলের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে ১৯৭৫ সালে দলটির নেতা হন তিনি। চার বছর পর, ১৯৭৯ সালে, যুক্তরাজ্যের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন কোনো বড় পশ্চিমা দেশের নেতৃত্বে আসা প্রথম নারী।


কমিউনিজমের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল কঠোর। একটি ভাষণের পর সোভিয়েত সংবাদমাধ্যম তাকে ‘লৌহমানবী’ নামে অভিহিত করে। অর্থনীতিতে তিনি মুক্তবাজারভিত্তিক নীতির পক্ষে ছিলেন এবং শ্রমিক ইউনিয়নের ক্ষমতা কমানোর উদ্যোগ নেন। তার নীতিতে ব্রিটেন অর্থনৈতিকভাবে ডানপন্থার দিকে এগিয়ে যায়।


থ্যাচার ১১ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। এটি তাকে বিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে দীর্ঘসময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী এবং দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী নেতায় পরিণত করে।


৫. ভিগদিস ফিনবোগাদোতির, আইসল্যান্ড


১৯৮০ সালে ভিগদিস ফিনবোগাদোতির আইসল্যান্ডের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন দেশটির প্রথম নারী রাষ্ট্রপ্রধান এবং বিশ্বের প্রথম নারী, যিনি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে কোনো দেশের রাষ্ট্রপতি হন।


তখন তিনি ছিলেন বিবাহবিচ্ছিন্ন ও একক মা। এর আগে আর্জেন্টিনার ইসাবেল পেরন রাষ্ট্রপতি পদে বসা প্রথম নারী হলেও, তিনি নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসেননি। স্বামী রাষ্ট্রপতির মৃত্যুর পর, তার উপ-রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন।


ভিগদিস ফিনবোগাদোতির নিজ দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা এবং দেশে-বিদেশে তা তুলে ধরার জন্য পরিচিত ছিলেন। জনগণের মধ্যে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। পরপর তিনবার পুনর্নির্বাচিত হন। এর মধ্যে দুটি নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন এবং অন্যটিতে ৯৬ শতাংশের বেশি ভোট পান।


১৬ বছর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করে তিনি ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘসময় নির্বাচিত নারী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে পরিচিত হন। তার সাফল্য আইসল্যান্ডে লিঙ্গসমতার অগ্রযাত্রাকেও আরও শক্তিশালী করে।


৬. অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেল, জার্মানি


সাবেক পূর্ব জার্মানিতে বেড়ে ওঠেন অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেল। রসায়নে ডক্টরেট অর্জনের পর তিনি গবেষণাগারে বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেন। বার্লিন প্রাচীরের পতনের পরপরই রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।


সরকারপ্রধান হেলমুট কোলের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালনের সময় তিনি কখনো কখনো ম্যার্কেলকে অবজ্ঞার সুরে ‘আমার মেয়েটি’ বলে সম্বোধন করতেন।


২০০০ সালে ম্যার্কেল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন দলের নেতৃত্বে আসেন। পাঁচ বছর পর, ২০০৫ সালে, তিনি জার্মানির প্রথম নারী সরকারপ্রধান হন। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন দেশটির প্রথম পূর্ব জার্মান সরকারপ্রধান এবং ৫১ বছর বয়সে দায়িত্ব নেওয়া সবচেয়ে কমবয়সী সরকারপ্রধান।


তার দীর্ঘ শাসনামলে ইউরো অঞ্চলের ঋণসংকট, শরণার্থী সংকট এবং এর জেরে উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান প্রত্যক্ষ করে জার্মানি। এ সময় ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তও নেয়। ২০১৭ সালে চতুর্থবারের মতো নির্বাচিত হওয়ার পর ম্যার্কেল জানান, এটিই হবে তার শেষ মেয়াদ।


তার নেতৃত্বে জার্মানি ইউরোপের সবচেয়ে জনবহুল ও শক্তিশালী দেশ এবং বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


৭. এলেন জনসন সারলিফ, লাইবেরিয়া


যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এলেন জনসন সারলিফ। এর মধ্যে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি জনপ্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।


নিজ দেশ লাইবেরিয়ায় সরকারি সেবায় কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। উনিশ শতকে দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়া মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতিষ্ঠিত দেশ লাইবেরিয়া দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যায়। সেই সময়ে সারলিফ কেনিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত জীবন কাটান। এ সময় তিনি ব্যাংকিং খাত এবং জাতিসংঘে কাজ করেন।


২০০৫ সালে গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর লাইবেরিয়ায় অনুষ্ঠিত প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি একাধিক পুরুষ প্রার্থীকে পরাজিত করেন। নারী ভোটারদের প্রায় ৮০ শতাংশের সমর্থন নিয়ে তিনি আফ্রিকার প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নারী রাষ্ট্রপ্রধান হন।


১২ বছর ক্ষমতায় থেকে সারলিফ দেশে শান্তি বজায় রাখতে, জাতীয় ঋণ কমাতে এবং অর্থনীতি পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখেন। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১১ সালে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পান।


তবে তার শাসনামল সমালোচনামুক্ত ছিল না। স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠে, কারণ তিনি তার তিন ছেলেকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এ ছাড়া তার সরকারের বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির অভিযোগ নিয়েও সমালোচনা ছিল।



ক্যাটাগরি: সাময়িকী

         

  রেটিং: ৫

এই বিভাগের আরও পোস্ট

ফুল তরু লতা ও আমার জীবন

ফুল তরু লতা ও আমার জীবন

  • খালেদ হাসান শান্ত |
  •  ২৫-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৫

সাবাতিনা, তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও?

সাবাতিনা, তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও?

  • সুমাইয়া রহমান তুলি|
  •  ২১-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৪

বিশ্বের প্রথম নারী সরকারপ্রধানদের পথচলা

বিশ্বের প্রথম নারী সরকারপ্রধানদের পথচলা

  • জীবনজয়ী ডেস্ক|
  •  ১৫-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৫

আমার সেরা তিনটি দিন

আমার সেরা তিনটি দিন

  • ইসমাইল সাব্বির|
  •  ১২-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৫

আমার মেয়েবেলা

আমার মেয়েবেলা

  • মৌমিতা সেন |
  •  ০৯-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

০

পুরুষশাসিত চীনে যেভাবে হলো এক নারীর উত্থান

পুরুষশাসিত চীনে যেভাবে হলো এক নারীর উত্থান

  • জীবনজয়ী ডেস্ক |
  •  ০৪-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৩.৭