নিজেকে অন্তত একটি দিন মোবাইল-ইন্টারনেট থেকে দূরে রাখার পরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরে আমার মাথায় ঘুরছিল। জীবনজয়ীর আহ্বানে শেষমেশ সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়ে গেল। সেদিন ছিল ১০ এপ্রিল, ২০২৫। সকাল নয়টা থেকে শুরু হলো আমার ‘নাই নেট’।
ফোনটা হাতের পাশেই রাখলাম। শুরুতে বারবার কিছু একটার অভাব অনুভব করছিলাম। প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখা, নোটিফিকেশন চেক করা এবং ফিড স্ক্রল করা সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আজকের দিনটি সেই বৃত্ত থেকে বের হওয়ার জন্য।
প্রথমদিকে মনে হচ্ছিল, হাতটি যেন মোবাইলের জন্য আকুল হয়ে আছে। কিন্তু নিজেকে সংবরণ করে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম, প্রকৃতির মধ্যে কিছুটা স্বস্তি খুঁজতে। কিছুক্ষণ বাদে হঠাৎ হাওয়ার স্পর্শে বহুদিনের চমক ভাঙল যেন! কতদিন পর সচেতনভাবে চোখ মেলে দেখছি গাছে গাছে মিঠে রোদের খেলা। চোখের সঙ্গে দেখি, কানও সক্রিয় হচ্ছে। পাখির ডাক শুনতে পাচ্ছি! কতদিন হয় এসব দেখা-শোনা হয়নি। একই সঙ্গে আমার আনন্দ ও অনুশোচনা হচ্ছিল।
অনেকদিন পরে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে পরিবারের সবার সঙ্গে বসার সুযোগ পেলাম। সকালের মুহূর্তগুলো ভাগ করে নিলাম। সকালের নরম রোদের আলোয় গল্প আর হালকা হাসির শব্দ যেন বহুদিন বাদে আমার দিনের শুরুকে সুন্দর করে তুলল!
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবার মনে হলো, রান্নাঘরে গিয়ে মাকে একটু সাহায্য করা যাক। দুপুরের রান্নায় মাকে সাহায্য করলাম। ফোনের সাহায্য ছাড়াই মায়ের মুখে শোনা রেসিপি মনে করে নিজ হাতে কিছু তৈরি করলাম। সেই খাবারের গন্ধ এবং স্বাদ যেন নিজের প্রতি এক আত্মবিশ্বাস এনে দিল। দুপুরের খাবারের পর, বাড়ির সবার সঙ্গে বসে পুরনো স্মৃতিচারণের মধ্যে হারিয়ে গেলাম। ছোটবেলার গল্প, জীবনের ছোট ছোট হাসির মুহূর্তগুলো উঠে এল আলোচনায়।
বিকেলে ঘর থেকে বের হলাম। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করব। মোবাইল ছাড়াই বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করলাম, বিভিন্ন মজার স্মৃতি ভাগ করে নিলাম। স্ক্রিনের বাইরের এই সরাসরি সংযোগ যেন আরও আন্তরিক এবং জীবন্ত হয়ে ধরা দিল আমার কাছে!
সন্ধ্যায়, যখন নীরবতা চারপাশে ঘিরে ধরেছিল, তখন নিজের ডায়েরি খুলে লিখতে বসে গেলাম। পুরো দিনের অভিজ্ঞতা এবং মনে জমে থাকা কথাগুলো লিখতে গিয়ে নিজেকে এক অন্যরকম মুক্ত মানুষ মনে হচ্ছিল। নিজের সঙ্গে কথোপকথনের এই মুহূর্ত যেন এক নতুন শক্তি এনে দিল। ক্রমে রাত গভীর হলো। ঘরের বারান্দায় বসে চাঁদের আলোয় প্রকৃতির নীরবতাকে উপভোগ করলাম। মনে হলো, এই পুরো দিনটি আমাকে নতুনভাবে জীবনকে দেখার শিক্ষা দিল।
পরদিন সকাল ৯টা। একদিনের জন্য আমার ফোন থেকে দূরে থাকার চ্যালেঞ্জ শেষ! কিন্তু আজ ইন্টারনেট এবং ফোনে ফেরার সুযোগ থাকলেও, তা আর খুব আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে না। মোবাইলের প্রতি একদিনের জন্য হলেও আসক্তি কাটিয়ে প্রকৃতি, পরিবার এবং নিজের অনুভূতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার মধ্যে আমি সত্যি খুব আনন্দ খুঁজে পেয়েছি।