শুক্রবার। ছুটির দিন। সকাল শুরু হলো হলের সংকীর্ণ কক্ষটিতে, যেখানে প্রতি ভোরে জেগে উঠতে হয় জড়সড় শরীর আর একরাশ নীরবতা নিয়ে। চোখ মেলে জীর্ণ দেয়ালের দিকে স্থির তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত কাটানোর পর ঘুমের ঘোর কাটে। বাস্তবে ফিরে এসে সবার আগে মনে হলো, আজ সারা দিন অফুরন্ত অবসর। আবার নেটওয়ার্কের সঙ্গে আমার সংযোগও অচল। আজ ২১ নভেম্বর ২০২৫। জীবনজয়ীর আহ্বানে আমার নেট ছাড়া দিন।
ইন্টারনেটের ভেতরে থাকা সেই রঙিন দুনিয়া, বিশ্বের খবর, কোরিয়ান সংস্কৃতির উচ্ছ্বাস, রোমহর্ষক থ্রিলার, রোমান্টিক ড্রামা কিংবা প্রিয় গানের প্লেলিস্ট, কিছুই নেই। আজকের দিনটি অনেকটা সেই কলেজজীবনের মতো কাটবে, যখন স্মার্টফোনটি ছিল না। দিনগুলো ছিল সাদা-কালোয় ঢাকা, তবে অনেক বেশি বাস্তব। অবসরগুলো কাটত বইয়ের পাতায়, গানের সুরে, টইটই করে ঘুরে।
টেবিলে চোখ পড়তেই দেখলাম গত রাতে বানানো ‘টু ডু লিস্ট’। সেখানে আজকে অবসর যাপনের পরিকল্পনা সুসজ্জিত ছিল। আধুনিকতাবিচ্ছিন্ন, খানিকটা প্রাচীনতার ছোঁয়ামেশানো।
নভেম্বরের মাঝামাঝি। শীত শীত ভাব। কার্জন হলের পথ ধরে হাঁটতে বের হয়েছি। চিরপরিচিত এই স্থান, লাল ইটের দালানগুলো হালকা কুয়াশায় আবৃত হয়ে আরও নান্দনিক দেখাচ্ছে। এক জায়গায় ঘাসের ওপর বেশ কয়েকটি কাঠগোলাপ পড়ে রয়েছে। চারদিকে একধরনের সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়েছে যেন। আশপাশে কয়েকজনের পদধ্বনি আর কণ্ঠস্বর পেছনে ফেলে আমি একা পথ হাঁটছি। একটুকরো নিজস্ব শান্তি খুঁজে নেওয়ার উদ্দেশ্যে চলে আমার এই প্রাতঃভ্রমণ। শরীর শ্রান্ত হয়ে এলে আমি ফিরে যাই।
এখানে পড়ুন: চাঁদের আলোয় প্রকৃতির নীরবতাকে উপভোগ করলাম
কক্ষে ফিরতেই দেখলাম, জানালা দিয়ে হলুদ আলোর ছটা এসে বিছানার একটি অংশে পড়েছে। ইন্টারনেটের সঙ্গে আজ সম্পর্ক নিষিদ্ধ হওয়ায় জানালার পাশে কিছুক্ষণ নীরবে বসতেই মন চলে যায় মাইল মাইল দূরে আমার নিজ বাড়িতে। ঢাকার চেয়ে নিশ্চয়ই উত্তরবঙ্গে এখন শীত বেশি। সেখানে আমার ঘরের বারান্দায় সোনালি রোদ এসে ঢোকে। বারান্দার লোহার শিক ভেদ করে কিছু দূরের রাস্তায় মানুষের চলাচল, সবজিওয়ালার হাঁকাহাঁকি চোখে পড়ে। পাশের টবে রাখা গোলাপগাছটিতে হয়তো কখনো লাল গোলাপ ফুটে থাকে। সেই সব সময়ে মা আমার হাতে গরম চায়ের কাপ ধরিয়ে দিতেন। বুকের ভেতরটা হঠাৎ যেন মোচড় দিয়ে উঠল। কত দিন আমার সেই আপন আশ্রয়স্থলে ফেরা হয় না!
আজকের দিনে আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল বইয়ের সঙ্গে বসবাস। অরুন্ধতী রায়ের ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ বইটি দীর্ঘদিন টেবিলের কোণে অযত্নে পড়ে থাকার কারণে তাতে ধুলার আস্তরণ পড়ে গেছে।
বইটি হাতে নেওয়ার পর এর গম্ভীর প্রেক্ষাপট মনকে আচ্ছন্ন করে তোলে। যতই পাতা ওল্টাতে থাকি, বিষণ্ন এক অনুভব আমাকে ছুঁয়ে যেতে থাকে বারবার। খুব তীব্র নয়, তবে চাপা হাহাকার মনের মধ্যে ভিড় করে। তবু কৌতূহলের টানই আমাকে বইটির সঙ্গে আবদ্ধ করে রাখে দীর্ঘক্ষণ। প্রায় চারটি অধ্যায় শেষ করার পর মস্তিষ্কে ভার বোধ করায় বুকমার্ক রেখে বন্ধ করে ফেলি বইটি।
এরপর সেই অবসন্নতা দূর করতে হলের মাঠের দিকে পা বাড়ালাম। উদ্দেশ্য ছিল, কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে গিয়ে আবার ওই কাহিনির গভীর দুনিয়ায় ডুব দেওয়া।
কিন্তু সেখানেই কিছু অসাধারণ সময় কাটে পছন্দের দুজন মানুষের সঙ্গে। আমার দুই আদিবাসী বন্ধু, একজন চাকমা, অন্যজন রাখাইন। আজ বিকেলে তাদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার কথা। কিন্তু ততক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। ওদের পেয়ে গেলাম। হাঁটতে হাঁটতেই শুরু হয় আলাপচারিতা।
তারা পাহাড়ের ভাঁজে আর উপকূলের নিকটে লুকিয়ে থাকা সংগ্রামের গল্প বলে। বিচিত্র জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস, উৎসব, পরিবারগুলোর কত অজানা ইতিহাস, আমাকে ধীরে ধীরে ওই জগতে টেনে নিয়ে যায়। কথা হয় নাপ্পি, মুন্ডি, বাঁশকোড়ল নামক খাদ্য তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে এক স্বতন্ত্র পরিবেশে খাপ খাইয়ে চলা, নিজস্ব ভাষা ছেড়ে বাংলাকে আপন করে নেওয়া, উচ্চারণগত বাধা সত্ত্বেও প্রতিনিয়ত আমাদের সঙ্গে সাবলীলভাবে কথোপকথন তাদের প্রতি আমার সখ্য বাড়িয়ে দেয়।
আমার রাখাইন বন্ধুটি তখন অনর্গল তার জীবনী বলে যাচ্ছিল। কক্সবাজারের সমুদ্র অঞ্চলে কাটানো তার ছোটবেলার প্রতিটি বর্ণনা মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম।
তোর ভাষায় আমাকে বল তো, ‘কেমন আছিস?’
‘নিং কং লা?’ বলে এক স্নিগ্ধ হাসি হাসে সে।
আমার চাকমা বন্ধুটি অন্তর্মুখী চরিত্রের। সে ধীরে ধীরে নিজ সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনযাপনের ধাঁচ, আচার-অনুষ্ঠান বলে যাচ্ছিল। বিজু উৎসব, বুদ্ধ পূর্ণিমার রীতিনীতি, ভিন্ন আঙ্গিকে অতিথি আপ্যায়নের ঐতিহ্য... আরও কত কী!
বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার মধ্য দিয়ে তাদের জানার সেই অনুভূতি অনন্য।
প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই, বৈচিত্র্য, সবকিছু ছাপিয়ে তাদের ঠোঁটে লেগে থাকা অনাবিল হাসি আর অকৃত্রিম আন্তরিকতা আমাকে আনন্দ দেয়।
বিকেলে চায়ের কাপ হাতে হলের পেছনের মাঠে বসি। এই মাঠে নিভৃতে বসে ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দিতে দিতে একধরনের গভীর স্বস্তি অনুভব করা যায়। দেখি মেঘমুক্ত আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে কাক উড়ে যাচ্ছে, সময়ে সময়ে তাদের তীক্ষ্ণ কা-কা ডাক পরিবেশের স্তব্ধতা কাটিয়ে দিচ্ছে। দূর থেকে সবার কোলাহল, হাসির শব্দ কানে আসছে।
হঠাৎ পাশের দেয়ালে চোখ যায়, সেখানে কারা যেন কালো কালিতে লিখেছে, ‘জীবন বহমান’। পথচলা থামে না। কখনো মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ প্রান্তর, কখনো জলাভূমি, কখনো উপত্যকা। এভাবেই চলতে থাকে। তবে আজকাল বেশ কাটছে দিন।
ক্রমশ আকাশ রাঙা হয়ে সূর্য ডুবে যায়।
শীতকালে হলের মূল মাঠে ব্যাডমিন্টন কোর্ট তৈরি করা হয় প্রতিবার। সন্ধ্যা নামতেই সেটি সরব হয়ে ওঠে। রাত একটা–দেড়টা পর্যন্ত খেলা চলে। বেশ কিছুদিন ধরেই দূর থেকে হেঁটে যাওয়ার সময় কোর্টটির দিকে চোখ যেত আর খেলার এক তীব্র ইচ্ছা মনে জমাট বাঁধত। নানা কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। গতকাল রাতেই ভেবে রেখেছিলাম, আজ খেলতে নামব।
এখানে পড়ুন: নেটহীন একদিন: বই, কবিতা আর তিস্তার পাড়
একটি ভবনের তিনতলার বারান্দা থেকে আমার বন্ধু ডাকে। আমি নিচ থেকে উচ্চস্বরে বলি, ‘খেলবি নাকি?’ সে সাগ্রহে সম্মতি জানিয়ে দ্রুত নেমে আসে।
বহুদিন পর নরম ঘাসের ওপর পায়ের পাতা রাখলাম। শিশিরভেজা ঘাসে পা রাখায় হালকা শীতলতা অনুভূত হলো। মাঠের ব্যাডমিন্টন কোর্টে লাইটের সাদা আলোয় সন্ধ্যাটা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
নেটের দুই পাশে আমরা দুই বন্ধু তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। কখনো শূন্যে লাফিয়ে, কখনো ডানে-বাঁয়ে দ্রুত দৌড়ে, ক্রমাগত ধেয়ে আসা ককটিকে আমরা বিপরীত দিকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। শক্তি ব্যয় করে খেলতে খেলতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা জড়তা কমে আসতে শুরু করে। সেখানে প্রতিটি আঘাতে শাটলককের ক্ষিপ্র গতি আর বারবার আঘাতের তীব্র আওয়াজ আমাকে যেন কৈশোরে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
ঘর্মাক্ত শরীর আর মাটি লেগে থাকা পায়ে যখন ঘরে ফিরি, তখন ফোনের স্ক্রিনের উজ্জ্বল আলো নয়, ক্লান্তিই চোখে ঘুম এনে দেয়। দিনটি নেট ছাড়া দিব্যি কাটিয়েছি।
এখানে পড়ুন: ইন্টারনেট ছাড়া এক শান্তিপূর্ণ দিন