নাই নেট: স্বেছায় ইন্টারনেট ছাড়া চব্বিশ ঘন্টা

ইন্টারনেট ছাড়া এক শান্তিপূর্ণ দিন


  • আবু সায়েম   |
  • প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ২৩:২৮
ইন্টারনেট ছাড়া এক শান্তিপূর্ণ দিন
ছবি: মুশফিয়া আহমেদ বুশরা

আজকের সকালটা রোজকার থেকে আলাদা। ঘুম ভাঙতেই চারদিকে এক অদ্ভুত শান্তির পরশ। জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালাম, মৃদু রোদে ঝলমল করছে আকাশ। ভাবলাম, প্রতিদিনের মতো আজ আর ইন্টারনেটের ভারী জগতে ডুবে থাকব না। পুরো দিনটা কাটাব ইন্টারনেট ছাড়া। শুধুই নিজের আর প্রিয়জনের জন্য। প্রকৃতির ছোঁয়ায়। জীবনজয়ীর ‘নাই নেট’ নিমন্ত্রণ নিয়েই ফেললাম অবশেষে। আজ ২৫ এপ্রিল, ২০২৫। ঢাকা থেকে বাড়ি এসেছি কয়েক দিন হলো। 

ফোনটা বন্ধ করে ড্রয়ারে রেখে দিলাম। মনে হচ্ছিল, একটা বোঝা নামালাম। আধুনিক জীবনের তাড়াহুড়ো আর ডিজিটাল অশান্তি থেকে মুক্ত হওয়ার অদম্য ইচ্ছা একটা দিনের জন্য হলেও বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। নাশতা সেরে হাতে তুলে নিলাম অনেক দিন পড়ে থাকা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’। জানালার পাশে বসে, হালকা রোদের ছায়ায় একের পর এক পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে হারিয়ে গেলাম অতীতের গ্রামবাংলায়। যেখানে অনুকূলের জীবন, প্রেম, লড়াই আর শিল্পীসত্তার যুদ্ধ গেঁথে আছে প্রতিটি লাইনে।

বই পড়তে পড়তে কখন সময় পেরিয়ে গেল, বুঝিনি। গল্পের ছন্দ, ভাষার গাম্ভীর্য আর চরিত্রের আবেগে এক ভিন্ন জগতে পাড়ি জমালাম। এ যেন শুধুই বই পড়া নয়, জীবনেরই আরেকটি অধ্যায় আমি অনুভব করছি।

(এখানে পড়ুন: শরৎবাবুকে রেখে চলে গেলাম জাবির বটতলায়) 

বেলা গড়াতেই দুপুরের রান্নার সময় হলো। আজ রান্নাঘরের কাজটাও বিশেষভাবে করতে চেয়েছিলাম। আমি আর আমার স্ত্রী দুজনে মিলে আম্মুকে রান্নাঘরে সাহায্য করতে ঢুকে পড়লাম। মজা করেই দুজনে একসঙ্গে সবজি কেটেছি, মসলা ঘেঁটেছি। মাঝেমধ্যে একটু অগোছালো হয়ে পড়লেও আনন্দের কমতি ছিল না।

দুপুরের খাবার খেলাম একসঙ্গে। ইন্টারনেটের নোটিফিকেশনের টুংটাং নেই, রিপ্লাই দেওয়ার তাড়াহুড়ো নেই। কেবল চুপচাপ ঘর, ভালোবাসার মানুষ আর এক প্লেট গরম ভাতের সঙ্গে মুরগির ঝোলের ঘ্রাণ। এই সহজ-সরল সুখের মুহূর্তগুলোই হয়তো জীবনের আসল সৌন্দর্য।

বিকেল গড়িয়ে এল। হালকা রোদ আর ঠান্ডা বাতাসে মনে হলো, কিছু একটা করতে হবে, একটু প্রকৃতির সান্নিধ্যে যাওয়া দরকার। ঠিক করলাম, স্ত্রীকে নিয়ে মোটরসাইকেলে ঘুরতে বের হব। অনেক দিন পর আজ আবার মোটরসাইকেলটা গর্জে উঠল। স্ত্রীকে পেছনে বসিয়ে গাইবান্ধা শহর থেকে রওনা দিলাম বালাশীঘাটের দিকে।

বাইকের চাকা ঘুরতে ঘুরতে শহর পেরিয়ে সবুজ মাঠ, ছোট ছোট পাড়া-গাঁ ধরে এগিয়ে চললাম। বাতাস যেন চুলগুলো উড়িয়ে নিচ্ছিল, হালকা সুরে পাখির ডাক ভেসে আসছিল দূর থেকে। রাস্তায় খুব একটা ভিড় ছিল না, তাই দুজনে মিলে গল্প করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। বাইক চালাতে চালাতে মনে হচ্ছিল, মন থেকে চাইলে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই সুন্দরভাবে উপভোগ করা যায়।

বালাশীঘাটে শান্ত নদীর ধারে নেমে এলাম। সোনালি বিকেলের আলো পড়ে নদীর জল কী অপূর্ব রূপ পেয়েছে! নৌকায় উঠলাম আমরা। ছোট্ট এক মাঝি আমাদের নিয়ে রওনা দিল নদীর বুকে।

নৌকা এগোচ্ছে ধীরে ধীরে। আমরা দুজনে পাশাপাশি বসে আছি। মুখে খুব একটা কথা হচ্ছিল না, কিন্তু চোখের ভাষায় যেন সব কথা বলা হয়ে যাচ্ছিল। যেন সেই গানটা বাজছিল কানে,

‘আমাদেরও মুখে কোনো কথা নেই

শুধু দুটি আঁখি ভরে রাখে হাসিতে।’

দূরে নৌকা থেকে জেলেরা জাল ফেলছে, কোথাও কোথাও শিশুরা গোসল করছে। বাতাসে একটা কাঁচা মাটির গন্ধ হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছিল। নদীর বুকজুড়ে নীরবতা, তার মাঝে আমাদের নৌকা ছপছপ শব্দে এগিয়ে যাচ্ছে।

(এখানে পড়ুন: নেটহীন দিন: আকাশের লালচে আভা মন ছুঁয়ে গেল) 

প্রায় এক ঘণ্টা নদীতে ঘুরলাম। সূর্যটা পশ্চিমে হেলে পড়ছিল তখন। নদীর ওপর ছড়িয়ে পড়ছিল কমলা আর লাল আভা। মনে হচ্ছিল, পুরো প্রকৃতি আজ আমাদের এই বিশেষ দিনটার সাক্ষী হয়ে রইল।

ফেরার পথে আবার বাইকে চড়ে শহরের দিকে রওনা দিলাম। নদীর বাতাসে ভিজে থাকা চুল আর মন দুটোই ভরে ছিল প্রশান্তিতে। মনে হচ্ছিল, আমরা যেন কিছুটা হলেও জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য উপলব্ধি করেছি আজ।   

রাতের খাবারের পর আবার বইয়ের পাতায় ফিরে গেলাম। শুয়ে শুয়ে ‘কবি’র শেষ অংশগুলো পড়ছিলাম। ঘরের জানালা দিয়ে চাঁদের আলো আসছিল। বাইরে চারপাশ নিস্তব্ধ। আমি বই বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম। মনে মনে ভাবলাম, দিনটা ছিল নিখাদ শান্তির। প্রকৃতি, ভালোবাসার মানুষ আর বইয়ের সান্নিধ্যে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। ইন্টারনেট ছাড়াই দিনটা কতটা পূর্ণ হতে পারে, আজ তা সত্যিই অনুভব করলাম। মনে হলো, মাঝে মাঝে সবকিছু থেকে দূরে সরে গিয়ে কেবল প্রকৃতি, প্রিয়জন আর নিজের সঙ্গে সময় কাটানোতেই আসল সুখ।


ক্যাটাগরি: নাই নেট

         

  রেটিং: ৪

এই বিভাগের আরও পোস্ট

বই পড়ে অন্য এক জগতে হারিয়ে গিয়েছিলাম

বই পড়ে অন্য এক জগতে হারিয়ে গিয়েছিলাম

  • ফারিহা আনজুম নোশিন|
  •  ০৫-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: নাই নেট

ইন্টারনেট ছাড়া এক শান্তিপূর্ণ দিন

ইন্টারনেট ছাড়া এক শান্তিপূর্ণ দিন

  • আবু সায়েম |
  •  ২৫-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: নাই নেট

আমি যেন এক নতুন জগতে পা রাখতে যাচ্ছি

আমি যেন এক নতুন জগতে পা রাখতে যাচ্ছি

  • পূজা প্রামানিক|
  •  ২৩-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: নাই নেট

একদিন নেটবিহীন:  রান্না, ছবি আঁকা আর দূরদেশের স্ত্রী

একদিন নেটবিহীন: রান্না, ছবি আঁকা আর দূরদেশের স্ত্রী

  • রাফি আন্ নূর|
  •  ১০-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: নাই নেট

 আষাঢ়ের এক নেটহীন দিন

আষাঢ়ের এক নেটহীন দিন

  • স্বর্না আক্তার লিজা|
  •  ০৪-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: নাই নেট

পুরোপুরি উশুল হওয়া একটা দিন

পুরোপুরি উশুল হওয়া একটা দিন

  • সামিয়া ইফফাত|
  •  ২৮-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: নাই নেট

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।