জীবনজয়ীর ‘নাই নেট’-এ আমি অংশ নিয়েছিলাম গত ডিসেম্বরের ২৮ তারিখ।
কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের ‘বেড টি’ ছাড়া ঘুম ভাঙে না। ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসে চা পান করে তাঁদের দিন শুরু হয়। আমার কাছে মুঠোফোন ব্যবহারটাও সেরকম। আমার মুঠোফোন আমার জন্য ‘ডিজিটাল বেড টি’ বলা যায়। আমার নিজস্ব স্মার্টফোন হয় ২০২১ সালে। তারপর থেকে বলা যায়, এই অভ্যাসে আছি। মুঠোফোনের অ্যালার্মে ঘুম থেকে উঠি। অ্যালার্ম বন্ধ করি। তারপর শুরু হয় নানা কিছু। মেইল, হোয়াটসঅ্যাপ, নোটিশ, ফোনের মেসেজ, মেসেঞ্জার, নিউজফিড সব চেক করি। গুরুত্বপূর্ণ কোনো টু-ডু আছে কি না, তাও দেখি। এভাবে দশ পনেরো মিনিট ফোন স্ক্রল করে দিনের শুরু হয়। ঘুম থেকে উঠতে বেশি দেরি হলে অবশ্য এসব করা হয়ে ওঠে না। তখন সোজা ক্লাসের দিকে দৌড় দিতে হয়।
[এখানে পড়ুন: নেটহীন একদিন: বই, কবিতা আর তিস্তার পাড়]
নাই নেটের দিনটা অন্য দিনের মতো নয়। আজ অ্যালার্ম বন্ধ করে কিছুক্ষণ এ মনিই শুয়ে থাকলাম। সারা দিন কী কী করা যায়, ভাবলাম। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেছি। ভাবলাম, একটু শরীরচর্চা কেন্দ্রে যাই। সদস্য হয়েছি অনেক দিন। দেরিতে ঘুম থেকে ওঠা আর আলসেমির কারণে যাওয়া হয় না।
এখন সময় সকাল ১০:২৫। এক ঘণ্টা ব্যায়াম করে হলে ফিরে এসে হল ক্যান্টিনে সকালের নাশতা করছি। নাশতা শেষ করে রুমে গিয়ে কিছু কাজ করে ফ্রেশ হব।
ঘড়িতে সময় বেলা ১১:৪৮। আজ ক্লাস নেই। মোটামুটি অবসর। ক্লাস না থাকা দিনে এই সময়টাতে সাধারণত আমি শুয়ে শুয়ে কিছু সময় মোবাইল দেখি। এই কিছুক্ষণ কখনো কখনো দেড়-দুই ঘণ্টাও হয়ে যায়। সময় বহিয়া যায়! আজ কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলাম। ফোনটা হাতে নিলাম। এটা-সেটা দেখলাম। বুঝলাম, ইন্টারনেট না থাকলে গ্যালারি দেখা ছাড়া ফোনে আর তেমন কিছু করা হয় না। কি আর করি! মোবাইলের নোটে একটু-আধটু এটা-ওটা লিখেছি। মনে পড়ল, ছুটিতে আমার কিছু অনলাইন ক্লাস হয়েছিল। এর মধ্যে দুটো ক্লাস আমি করিনি। রেকর্ডেড ক্লাস। ল্যাপটপে ডাউনলোড করে রেখেছিলাম। এখন আমি সেই দুটো ক্লাস করব।
বেলা ৩:২৫। ক্লাস শেষ করে নামাজ পড়ে দুপুরের খাবার খেয়েছি। এখন যাব কার্জন হল। আমার বন্ধু এসেছে কয়েকজন। ওদের সঙ্গে গল্প করব, ঘুরব। তারা আমাকে অনলাইনে অ্যাকটিভ না পেয়ে মুঠোফোনে কল করেছে।
সারা দিন বেশ ভালো কাটলেও সন্ধ্যায় রুমে ফিরে মনটা বেশ আনচান করছিল। সন্ধ্যায় কিছুক্ষণ ফোন দেখার অভ্যাস রয়েছে। বাসা থেকে ভিডিও কল দেয়। সবাইকে দেখি। কথা বলি। আজ আর সেসব হচ্ছে না। অগত্যা কোর্সের একটা বই নিয়ে পড়তে বসলাম। ঘণ্টা দুয়েক পড়লাম। বেশ মনোযোগ দিয়েই পড়েছি বলা যায়। ফোন থাকলে সাধারণত এত মনোযোগ আসে না। এর মধ্যে কয়েকবার ফোন দেখা হয়ে যেত, ল্যাপটপে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে উঁকি দেওয়া হয়ে যেত।
এখন রাত ১০:৩৪। রাতের খাবার খেয়েছি। ইন্টারনেটে না পেয়ে বাবা মুঠোফোনে কল করলেন। তাঁকে সবটা বললাম। তিনি বেশ খুশি হয়েছেন এ রকম একটা অভিজ্ঞতার কথা শুনে। আমাকে ‘নাই নেট’-এ উৎসাহিত করে দ্রুত ফোন রাখলেন।
[এখানে পড়ুন: আজ খাবারের স্বাদ এত অসাধারণ লাগল কেন জানি না]
রাত পৌনে ১২টা বাজল। আমার আজকের দিন শেষ হতে আরও ৪৫ মিনিট সময় বাকি আছে। এই সময়টুকু আমি বই পড়ব। এটা আগেই ভেবে রেখেছিলাম। এই মাসের শুরুতে পড়তে শুরু করেছি ট্রেন টু পাকিস্তান। ১৫৮ পৃষ্ঠার বইটির ৩৪ পৃষ্ঠার মতো পড়েছি। আগে এ রকম বই আমি দুই থেকে তিন দিনে শেষ করতাম, এখন তা এক মাসেও শেষ করা হয় না।
নেট ছাড়া একটা দিন কাটানোর অভিজ্ঞতা আমার কাছে দারুণ লাগল। নিজেকে অন্যভাবে আবিষ্কার করছি। এখনকার সময়ে একটা দিন নেট ছাড়া থাকব, ভাবতেই পারি না। এর আগেও আমি দুই থেকে তিন দিন চেষ্টা করেছি। পারিনি। আজকের দিনটা আমি বেশ একটা স্বাস্থ্যকর জীবনধারা অনুসরণ করেছি বলে মনে হলো। পর্যাপ্ত ঘুমিয়েছি। ব্যায়াম করেছি। জাঙ্ক ফুড খাইনি। তিনবেলা সময়মতো খেয়েছি। বিকেলে কিছুক্ষণ হেঁটেছি। নিজের জন্য বেশ কিছুটা সময় পেয়েছি। চিন্তা করতে পেরেছি। বই পড়েছি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমি সোশ্যাল মিডিয়া একদম ব্যবহার করিনি।
নিজের কাছে খুব ভালো লাগছে। পুরোপুরি উশুল হওয়া একটা দিন। প্রতিদিন অবশ্য এভাবে মেনে চলা বেশ কঠিন। একেক দিনের একেক রকম কার্যতালিকা থাকে। কাজেই অধিকাংশ সময় এই জীবনধারা বজায় রাখা সম্ভব হয় না। এখনকার সময়ে ইন্টারনেট একটা নিত্যপ্রয়োজনীয় উপাদান। প্রতিদিন ইন্টারনেট ছাড়া চলা আসলে সম্ভব নয়। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, ইন্টারনেটে বিরতি দেয়াটা নিজের জন্য খুব ভালো।
২৮ ডিসেম্বর, রবিবার রাত পৌনে বারোটায় আমি আমার সব ডিভাইসের ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দিয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। তার মানে পরদিন একই সময়ে আমার ‘নাই নেট’ পালন শেষ হয়। সে রাতে আমি আর নেট চালু করিনি। মঙ্গল্বার সকাল সাতটায় নেট চালু করি। অর্থাৎ আমি ২৪ ঘণ্টা নয়, মোট ৩১ ঘণ্টারও বেশি সময় নেট ছাড়া ছিলাম।