আষাঢ় মাসের শেষ দিক। ঠিক যেন শ্রাবণ ওপারে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। গত দুদিনের টানা বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বন্যার পানি গ্রামগুলোকে ডুবিয়ে দিয়েছে। আমাদের এখানে পরিস্থিতি তেমন ভয়াবহ না হলেও, রাত থেকেই টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। ভোরে ঘুম ভাঙতেই জানালার বাইরে তাকালাম। ধূসর আকাশ, ভেজা গাছের পাতা আর টিনের চালে বৃষ্টির মৃদু শব্দ। ভেজা মাটির গন্ধে চারপাশ ভরে আছে। এমন একটা সকাল, যেটা মানুষকে শান্ত করে দেয়।
কিন্তু অনেক দিন ধরে আমার সকালগুলো আর এমন ছিল না। ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই হাত চলে যেত ফোনের দিকে। কে মেসেজ দিল, কোন খবর এলো, কোন নোটিফিকেশন জমে আছে—সবকিছু দেখতে দেখতেই দিনের শুরু হতো। রাতেও ঘুমানোর আগে শেষবারের মতো ফোনটা দেখে তবেই চোখ বন্ধ করতাম। কখন যে এই অভ্যাসটা আমার অজান্তেই জীবনের অংশ হয়ে গেছে, তা বুঝতেই পারিনি।
আসলে আমরা সবাই এখন এমন একটা সময়ে বাস করছি, যেখানে ইন্টারনেট শুধু প্রয়োজন নয়, অভ্যাসও। প্রয়োজনের কাজ শেষ হওয়ার পরও আমরা স্ক্রল করি, আবার স্ক্রল করি। একটার পর একটা ভিডিও দেখি, কোনো কারণ ছাড়াই ফোন আনলক করি। যেন অদৃশ্য কেউ আমাদের বলে যাচ্ছে, “আরও একটু দেখো।”
সেদিন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে হলো, আজ যদি একদিনের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার না করি, তাহলে কী এমন হবে? ‘জীবনজয়ী’র পক্ষ থেকে ‘নাই নেট’-এ অংশ নেওয়ার আহ্বান আমার কাছে কয়েক দিন আগেই এসেছে। এখন আবার ‘নাই নেট’ মাথায় এলো।
প্রথমে নিজের কাছেই প্রশ্নটা অদ্ভুত লাগল। তারপর মনে হলো, চেষ্টা করে দেখতেই তো পারি। ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে দিলাম। মনে মনে বললাম, আজ তোমার ছুটি। মজার ব্যাপার হলো, সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই বুঝলাম কাজটা এত সহজ নয়। কিছুক্ষণ পরপরই মনে হচ্ছিল, ফোনটা একবার দেখি। কে জানে, হয়তো কেউ মেসেজ দিয়েছে! কখনো মনে হচ্ছিল ফোনটা ভাইব্রেট করছে। পরে বুঝলাম, ওটা ফোন নয়, আমার বহু দিনের অভ্যাস।
নিজের এই অবস্থা দেখে হাসিও পেল। একটা সময় ছিল, ছুটির দিনে সকালবেলা বই নিয়ে বসতাম। এখন ছুটি মানেই ফোন নিয়ে বসে থাকা। কখন যে এই বদলটা হয়েছে, সেটা বুঝতেই পারিনি।
ভাবলাম, আজ যেহেতু ফোনটা বিশ্রামে, আমিও একটু নিজের কাছে ফিরে যাই। ঘরের এক কোণে রাখা আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গাটার দিকে এগিয়ে গেলাম। আমার বুকশেলফ। বইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা খুব ব্যক্তিগত। গল্প, উপন্যাস, থ্রিলার, ভ্রমণকাহিনি, প্রবন্ধ—সব ধরনের বই-ই আমার ভালো লাগে। কোনো একজন লেখককে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, এমন নয়। বরং আমি বিশ্বাস করি, প্রতিটি ভালো বই মানুষের ভেতরে কিছু না কিছু বদলে দেয়। কোনো বই নতুন একটা ভাবনা শেখায়, কোনো বই ধৈর্য শেখায়, কোনো বই আবার নিজের জীবনটাকেই নতুন করে দেখতে শেখায়। তাই বই আমার কাছে শুধু পড়ার জিনিস নয়, এক ধরনের আশ্রয়। বুকশেলফ থেকে কয়েকটি পুরোনো বই বের করলাম। পাতাগুলো হলদেটে হয়ে গেছে। কোথাও নিজের হাতে দাগ টেনে রাখা, কোথাও ছোট্ট একটা মন্তব্য লিখে রেখেছি। বইগুলো হাতে নিয়েই মনে হলো, কত দিন এদের সঙ্গে বসে গল্প করা হয়নি।
বইগুলো গোছাতে গিয়েই চোখে পড়ল একটা পুরোনো ডায়েরি। ডায়েরিটা খুলতেই যেন কয়েক বছর আগের আমি সামনে এসে দাঁড়াল। পাতা উল্টাতে উল্টাতে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে উচ্চশিক্ষা জীবনের প্রথম দিনের কথা মনে পড়তে লাগল। নতুন ক্যাম্পাস, নতুন মানুষ, নতুন বন্ধু, নতুন স্বপ্ন। কত ছোট ছোট ঘটনা লিখে রেখেছিলাম! কোনো দিন খুব আনন্দে লিখেছি, কোনো দিন মন খারাপের কথা, আবার কোনো দিন শুধু আকাশের রঙ নিয়েও একটা পুরো পাতা ভরে ফেলেছি।
[এখানে পড়ুন: নেট ছাড়া দিনে মনে এলো রবিনসন ক্রুসো]
এক জায়গায় নিজের লেখা পড়ে হেসে ফেললাম। আরেক জায়গায় এসে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলাম। মনে হলো, সময় চলে যায়, মানুষ বদলে যায়, কিন্তু কাগজে লেখা অনুভূতিগুলো ঠিক আগের মতোই থেকে যায়। এভাবে কখন যে অনেকটা সময় কেটে গেল, খেয়াল করিনি। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এতক্ষণে একবারও ফোনের কথা মনে পড়েনি। ঠিক তখন বাইরে আবার বৃষ্টি একটু জোরে নামল।
বৃষ্টির দিনের সঙ্গে খিচুড়ির সম্পর্কটা পুরোনো।
মনে হলো, আজ দুপুরের রান্নাটা আমি করি।
মায়ের কাছে গিয়ে বললাম, “আজ খিচুড়ি আমি রান্না করব।”
তিনি হেসে বললেন, “বেশ, তাহলে আজ রান্নাঘর তোমার।”
তার সেই হাসিটুকু যেন আলাদা এক উৎসাহ হয়ে গেল।
তিনি প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়ে দিলেন। আমি চাল-ডাল ধুয়ে, সবজি কেটে, মসলা প্রস্তুত করে রান্না শুরু করলাম। রান্নাঘরের জানালা দিয়ে বৃষ্টির শব্দ ভেসে আসছিল, আর ধীরে ধীরে ঘর ভরে উঠছিল খিচুড়ির সুগন্ধ। অনেক দিন পর মনে হলো, আমি কোনো কাজ শুধু শেষ করার জন্য করছি না, কাজটার প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ...। ঠিক তখনই দূরের মসজিদ থেকে ভেসে এলো যোহরের আজান। রান্না শেষ করে সবকিছু গুছিয়ে রাখলাম। তারপর গোসল করে নামাজ আদায় করলাম। নামাজ শেষে মনে হলো, অনেক দিন পর যেন মনটা সত্যিই শান্ত। কোনো তাড়া নেই, কোনো নোটিফিকেশনের অপেক্ষা নেই, শুধু এক ধরনের নির্ভার অনুভূতি।
এরপর পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে বসে খিচুড়ি খেলাম। বাইরে তখনো টিপটিপ বৃষ্টি। গরম ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি, জানালার কাচে বৃষ্টির ফোঁটা আর ঘরের ভেতরের হাসি—সব মিলিয়ে দুপুরটা যেন ছবির মতো সুন্দর হয়ে উঠেছিল।
খেতে খেতে নানা গল্প শুরু হলো। ছোটবেলার দুষ্টুমি, গ্রামের পুরোনো ঘটনা, আত্মীয়স্বজনের মজার স্মৃতি। কত দিন পর সবাই এতটা নির্ভার হয়ে গল্প করছিল! হঠাৎ মনে হলো, আমরা একসঙ্গে থাকি ঠিকই, কিন্তু এমন করে একসঙ্গে সময় কাটানো কত কম হয়ে গেছে। অনেক সময় একই ঘরে বসেও আমরা আলাদা আলাদা পৃথিবীতে ডুবে থাকি। কারও চোখ ফোনে, কারও মন অন্য কোথাও।
খাওয়া শেষ করে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। বৃষ্টি তখন একটু থেমেছে। ছাদের কার্নিশ থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ছে। গাছের পাতায় জমে থাকা ফোঁটাগুলো হালকা বাতাসে ঝরে পড়ছে। দূরে কয়েকটি শিশু বৃষ্টিতে ভিজে খেলছে। তাদের হাসির শব্দ ভেসে আসছিল। মনে হলো, আনন্দের জন্য খুব বেশি কিছু লাগে না। অনেক সময় একটা বৃষ্টিভেজা বিকেলই যথেষ্ট। বিকেলটা কেমন ধীরে ধীরে গড়িয়ে যাচ্ছিল। কোনো কাজ শেষ করার তাড়া ছিল না, কোথাও যাওয়ার ব্যস্ততাও না। পরিবারের সবার সঙ্গে গল্প করলাম। মাঝেমধ্যে আবার বুকশেলফ থেকে নেওয়া বইগুলো হাতে তুলে নিলাম। কিছু পাতা পড়লাম, কিছু লাইন বারবার পড়লাম। এমনও হলো, একটি বাক্য পড়ার পর বই বন্ধ করে কয়েক মিনিট শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলাম। অনেক দিন পর মনে হলো, নিজের সঙ্গে এমন নির্ভার হয়ে বসার সুযোগ তো আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম।
একসময় বুঝতে পারলাম, সকালে যে আমি প্রতি একটু পরপর ফোনের কথা ভাবছিলাম, বিকেলে এসে সেই কথাটা ভুলে গেছি। ফোনটা যেখানে রেখে গিয়েছিলাম, সেখানে পড়ে আছে। আর আমি ব্যস্ত হয়ে আছি এমন কিছু মুহূর্ত নিয়ে, যেগুলোর কোনো নোটিফিকেশন আসে না, কোনো শব্দ হয় না, কিন্তু যেগুলোই সবচেয়ে বেশি মনে থেকে যায়।
[এখানে পড়ুন: আলুচাষিদের সাথে ভালোই সময় কাটালাম]
সেদিন আমি ইচ্ছে করেই সারাদিন ইন্টারনেট ব্যবহার করিনি। আশ্চর্যের বিষয়, তাতে পৃথিবীর কিছু থেমে যায়নি। কোনো বড় খবর মিস করেছি বলে আফসোস হয়নি। বরং মনে হয়েছে, এত দিন ধরে যে ছোট ছোট সুখগুলোকে আমি অজান্তে অবহেলা করেছি, সেদিন সেগুলো আবার ফিরে এসেছিল। বইয়ের পাতায় হারিয়ে যাওয়া, পুরোনো ডায়েরি পড়ে নিজের সঙ্গে দেখা হওয়া, নিজের হাতে রান্না করা, পরিবারের সঙ্গে গল্প করা, বৃষ্টির শব্দ শুনে চুপচাপ বসে থাকা—সবকিছু মিলিয়ে দিনটা এক অন্যরকম পূর্ণতায় ভরে উঠেছিল।
সেদিন একটা বিষয় খুব গভীরভাবে বুঝেছিলাম। আমরা প্রতিদিন পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি যে নিজের সঙ্গে যুক্ত থাকার সময়টাই হারিয়ে ফেলছি। অথচ জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্তগুলো ইন্টারনেটের গতির ওপর নির্ভর করে না। সেগুলো তৈরি হয় আপন মানুষদের সঙ্গে কাটানো কিছু সময়, পুরোনো স্মৃতির কাছে ফিরে যাওয়া, একটি ভালো বইয়ের কয়েকটি পাতা কিংবা বৃষ্টিভেজা একটি নীরব বিকেল থেকে।
দিন শেষে আমার মনে হলো, আমি আসলে ইন্টারনেট থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করিনি। বরং এমন একটি জগতে ফিরে গিয়েছিলাম, যেটাকে ব্যস্ততার কারণে অনেক দিন ধরেই সময় দেওয়া হয়নি।
অনুলিখন: ইশরাত জাহান