জীবনজয়ীর ‘নাই নেট’ আহ্বানে যোগ দেব। পুরো চব্বিশ ঘণ্টা নেটের বাইরে থাকব! খুব সাহস করে এপ্রিলের শেষ দিন আর এমবি কিনলাম না। ভাবলাম, মে মাসের শুরুটা ডিভাইস ছাড়া শুরু করে একটা নতুন অভিজ্ঞতা নেওয়া যাক। কিন্তু ভাবা যতটা সহজ, করে ফেলাটা তত সহজ নয়। পহেলা মে সকালে উঠেই হাত নিশপিশ করছিল সকালের খবরটা দেখার জন্য। কিন্তু নিজের কাছে নেওয়া শপথের কাছে হেরে যাওয়া চলে না। ফেলে রাখলাম স্মার্টফোন। নিয়ে বসলাম শরৎচন্দ্রের রচনাসমগ্রের নীল মলাটের বই। বেশ কিছুটা সময় পড়লাম।
আমি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সেমিস্টারের ছাত্রী। থাকি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের
ভেতরে। দুপুর হতেই ক্ষুধা পেয়ে
গেল। শরৎবাবুকে রেখে চলে গেলাম
জাবির বটতলায়। খেতে। একা একা নিজেকে
খাওয়ানো বেশ কঠিন ব্যাপার।
ঢাকায় নতুন এসেছি। এখনো
তেমন বন্ধু-বান্ধব হয়নি। দেখা না পেয়ে
কেউ যে আমার খোঁজ
করছে, তেমনও নয়। সে যাই হোক। ইন্টারনেট
না থাকায়, আমার যে একটা আমি
আছে তা যেন একটু
একটু বুঝতে পারছিলাম।
বিকেলে
একা একা হাঁটলাম জাহাঙ্গীরনগরের
দীর্ঘ, ভেজা লাল ইটের
রাস্তায়। ফোন ব্যবহার করে
একটি ছবিও তুললাম না,
যদিও ইন্টারনেট ছাড়া মোবাইলে কথা
বলা বা ছবি তোলায়
‘নাই নেট’-এর কোনো
বাধা নেই।
লেকের
পানির দিকে তাকিয়ে থাকতে
থাকতে মনটা শান্ত হয়ে
এলো। সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। ফিরলাম
আপন ঠিকানায়। দেখি, ঘর ফাঁকা। আলো
জ্বালালাম। এবার কী করব,
বুঝতে পারছিলাম না। আজ আমার
নেট ছাড়া দিন চলছে!
এক
আপুকে পেয়ে ছাদে গেলাম।
আসলে একা একা একটু
ভয় ভয় করছিলো। আপুর
তেমন কোনো ব্যস্ততা ছিল
না। গল্প করতে চলে
এলেন আমার সঙ্গে। রাতের
চাঁদ, তারা আর আকাশ
এত সুন্দর হতে পারে, তা
আগে মনে হয় লক্ষ্য
করিনি। লক্ষ্য করলেও ভুলে গিয়েছিলাম। আজ
কী যে সুন্দর লাগছিল
তাদের!
আপুর
সঙ্গে গল্প করতে করতে
তাঁর জীবনের অনেক ঘটনা জানা
হয়ে গেল। মানুষের মনে
এত কথা, কত কথা!
শোনার কেউ নেই। হাতে
ফোন থাকলে হয়তো এত মনোযোগ
দিয়ে শুনতাম না। রিলসের জগতে
ডুবে থাকতাম।
ছাদ
থেকে নামলাম। আপুকে বিদায় জানিয়ে আবার রুমে ফিরে
এলাম।
রাত
বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উশখুশও বাড়তে থাকল। মনে হলো, একটা
চারকোণা যন্ত্রে বুঝি আমার আত্মাটা
আটকে আছে। ভাগ্য ভালো,
ডাটা রাখিনি। ডাটা থাকলে অনলাইন
হয়েই যেতাম বোধহয়। নিজের মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ নিতে বেশ বেগ
পেতে হলো। কিন্তু শেষ
পর্যন্ত ডিভাইসকে জিততে দিলাম না। আমি জিতলাম।
ঘুমিয়ে পড়লাম। অনলাইনে যাওয়ার তাড়না থেকে মুক্তি পেলাম।
অবশেষে নতুন মাসের প্রথম দিনে ঘুমের সঙ্গে সঙ্গে আমার ব্রতও পূর্ণ হওয়ার পথে চলল। ‘নাই নেট’ ছিল এক বিশাল অভিজ্ঞতা। এই উদ্যোগ আমাকে নিজের মস্তিষ্কের পরিচালক হওয়ার বার্তা দিয়ে গেল।