গল্পটা গোড়া থেকে বলি।
আমার ছোটবেলার বন্ধু সোহান হঠাৎ একদিন ফোন করে বলল, পুরো একদিন ইন্টারনেট ছাড়া থাকতে হবে।
আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, ‘অসম্ভব!’
সোহান নাছোড়বান্দা। বলল, ‘এটা তোর চ্যালেঞ্জ।’
কেন এই চ্যালেঞ্জ? কী লাভ? কী ক্ষতি? এসবের কিছুই বলল না। আমিও কথাটা একসময় ভুলে গেলাম।
কিছুদিন পর আবার ফোন করল সোহান। এবার জানাল, শুধু নেটবিহীন থাকলেই হবে না, অভিজ্ঞতাটাও লিখতে হবে একটি বাংলা ওয়েবসাইটে। আমি বরাবরই পাঠক। লেখা আমার কাছে কঠিন কাজ। ফলে নিজের অভিজ্ঞতা লিখতে হবে শুনে খুব একটা উৎসাহ পাওয়ার কথা নয়। তবু শেষ পর্যন্ত জীবনজয়ীর ‘নাই নেট’-এ অংশ নিতে রাজি হয়ে গেলাম।
দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার, ২৯ মে।
আগের রাতে ঘুমিয়েছিলাম রাত একটায়। যথারীতি মোবাইল ফোনটা পাশেই ছিল। সকাল নয়টায় ঘুম ভাঙল। অভ্যাসবশত চোখ খোলার পরই হাত চলে গেল মোবাইলের দিকে। ফোন হাতে নিয়েই হঠাৎ মনে পড়ল—আজ আমার নেট-উপোস!
প্রথমেই মনে হলো, এসব তো একেবারে ছেলেমানুষি। ইন্টারনেট আমাদের জীবনকে কত সহজ করেছে। অকারণে একদিন নেটওয়ার্কের বাইরে থেকে নিজের ও অন্যের অসুবিধা করার কী দরকার? অনেকেই হয়তো আমার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করবে। আমাকে না পেলে চিন্তাও করতে পারে।
কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলাম, দেখি না কতক্ষণ পারি। খুব জরুরি কিছু হলে না হয় অনলাইন হব।
মনে আর মগজে এতসব হিসাব-নিকাশ হয়ে গেল কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই। সময় দেখে ফোনটা রেখে দিলাম।
তারপর গেলাম রান্নাঘরে।
চায়ের পানি বসিয়ে ফ্রেশ হয়ে চা বানালাম। সাধারণত সকালে চা খেতে খেতেই সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করি। আজ সেটা সম্ভব নয়। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বুঝলাম, চায়ের সঙ্গে যেন কিছু একটা নেই।
মনে হলো, এমন বিশ্রী চা কোনোদিন খাইনি।
এক চামচ চিনি বাড়ালাম। ফল হলো উল্টো। চা বিস্বাদ থেকে একেবারে খাওয়ার অযোগ্য হয়ে গেল। অথচ আমি রোজই চা বানাই। কী জানি কেন, সেদিনের চা আমাকে ভীষণ হতাশ করল।
নিন্দুকেরা অবশ্য বলতে পারেন, চায়ের সঙ্গে ‘টা’—অর্থাৎ ইন্টারনেট—ছিল না বলেই চা বিস্বাদ লেগেছিল।
মনে মনে হাসলাম।
তারপর ওয়াশিং মেশিনে কাপড় দিয়ে নাস্তা বানাতে গেলাম। মনে হলো, আজ একটু স্পেশাল কিছুই বানানো যাক।
বলে রাখা ভালো, আমি ঢাকায় একাই থাকি। আমার বাবা-মা বাড়িতে আর স্ত্রী থাকেন আমেরিকায়। ফলে রান্নাবান্না থেকে শুরু করে ঘরের সব কাজই আমাকে নিজেকেই করতে হয়।
বহুকাল সকাল সকাল নাস্তা করা হয় না। সেদিন তাই রান্নাঘরে গিয়ে সবজিপাতি কাটলাম। ব্রেড, ভেজিটেবল আর ডিম দিয়ে বানালাম একটা অমলেট। বলতে গেলে প্রকাণ্ড সাইজের অমলেট।
খেতে বসে আবার মনে পড়ল মোবাইলের কথা।
মনে হলো, সত্যিই এসব চ্যালেঞ্জ একরকম ছেলেমানুষি।
এর মধ্যেই হঠাৎ ফোনে রিংটোন বেজে উঠল।
ছুটে গেলাম বেডরুমে। দেখি, সোহানের ফোন।
হতভাগা আমার নাকাল হওয়ার গল্প শুনতেই ফোন করেছে!
তখন অলরেডি ১১টা বাজে। ওকে বললাম, ‘আমি কিন্তু ইতোমধ্যে ১০ ঘণ্টা নেটবিহীন কাটিয়ে দিয়েছি।’
তারপর শুরু হলো আমাদের আড্ডা।
সেসব গল্প শুনলে আপনাদের মনে হতে পারে, যথার্থই আমরা বেকার। কিন্তু কী আর করা! গল্পে গল্পে আরও এক ঘণ্টা কেটে গেল।
এবার মনে হলো, রান্নাঘরে যাওয়া উচিত।
ওয়াশিং মেশিনের ধোয়া কাপড় বারান্দায় মেলে দিয়ে আবার ঢুকলাম রান্নাঘরে। অন্যদিন এই সময়টায় আমি হয়তো বিছানায় গড়াগড়ি করি। অথচ সেদিন দুপুর দুটোর মধ্যেই রান্নাবান্না, খাওয়া—সব শেষ।
আমি সাধারণত হালকা মসলায় রান্না করি। কিন্তু সেদিনের মেনু ছিল একটু মসলাদার—খিচুড়ি, বেগুন ভাজা আর মুরগির মাংস।
বেশ রসিয়ে খেতে খেতে ভাবতে লাগলাম, নেটবিহীন বাকি সময়টা কীভাবে কাটানো যায়।
খাওয়া শেষ করে খাটের তলা থেকে টেনে বের করলাম পুরোনো একটা ক্যানভাস। একটা অসমাপ্ত ছবি পড়ে ছিল। সেটাই শেষ করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
আমি শখ করে ছবি আঁকি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা একেবারেই নেই। তবে আমার আগ্রহ দেখে চারুকলার এক বন্ধু বেশ কিছুদিন আমাকে ছবি আঁকা শিখিয়েছিল। বিদ্যা ওই পর্যন্তই।
ছবি আঁকতে আঁকতে কখন যে সন্ধ্যা ছয়টা বেজে গেল, টেরই পেলাম না।
তবে ছবির কাজ শেষ হলেও আমার কোমরের কাজ যেন শেষ হয়ে গেল! সন্ধ্যার মধ্যে কোমর বেজে গেল বারোটা। শুনতে হাস্যকর হলেও এখন বেশিক্ষণ একভাবে বসে থাকলে হাড়গোড় বিদ্রোহ করে বসে।
ছবি আঁকতে আঁকতেই দুই বন্ধুকে ফোন করে ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করেছিলাম। ছবি শেষ করে রেডি হয়ে মেট্রো ধরে সোজা চলে গেলাম টিএসসি।
ততক্ষণে নেটবিহীন থাকার কথা আমি একরকম ভুলেই গেছি।
কিন্তু সমস্যা হলো অন্য জায়গায়।
এই সময়টায় আমি আমার বিদেশবাসিনী স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলি। তার সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ইন্টারনেট। আর আগের রাতে তাকে নেটবিহীন থাকার চ্যালেঞ্জের কথাও কিছু বলে রাখিনি।
হঠাৎ চিন্তা হতে লাগল।
বেচারি আমাকে দীর্ঘক্ষণ অফলাইনে দেখে না জানি কত চিন্তায় আছে!
মনে হলো, বড্ড বোকামি হয়ে গেছে। কিন্তু এতক্ষণ এসে এখন আর চ্যালেঞ্জ থেকে বের হওয়াও যায় না। ফলে অগত্যা স্ত্রীর প্রীতি আর ভীতি—দুটোকেই সাময়িকভাবে উপেক্ষা করতে হলো।
বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি শেষ করে যখন বাসায় ফিরলাম, তখন রাত ১১টা।
ফ্রেশ হয়ে খাওয়াদাওয়া করতে করতে রাত সাড়ে ১২টা বেজে গেল। তারপর বিছানা গোছাতে গোছাতে আর ঘুমের প্রস্তুতি নিতে নিতে একটা বেজে গেল।
ঘড়িতে একটা বাজতেই প্রথম কাজ হিসেবে নেট অন করলাম।
তারপর ঢুকলাম হোয়াটসঅ্যাপে।
দেখলাম, আমার স্ত্রীর বেশ কিছু মেসেজ।
দেখলাম, পরিস্থিতি খুবই গুরুতর।
সে কথা আজ আর না-ই বলি।
যেভাবেই হোক, একটা দিন নেটবিহীন কেটে গেল। ইন্টারনেট ছাড়া ২৪ ঘণ্টা যে একেবারে অসম্ভব, তা নয়। বরং দিনের বেশির ভাগ সময়ই অন্যভাবে কাটিয়ে দেওয়া যায়—চা বানিয়ে, রান্না করে, বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিয়ে, ছবি এঁকে কিংবা ঘুরতে বেরিয়ে।
তবে আমার মতো যাদের প্রেয়সী হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকেন, তাদের বলব—এই চ্যালেঞ্জ একাধিকবার না নেওয়াই ভালো!