নাই নেট

আবার একদিন নেটহীন থাকার চেষ্টা করব


  • সোহান চৌধুরী   সিলেট |
  • প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৬, ০১:০৮
আবার একদিন নেটহীন থাকার চেষ্টা করব
ছবি: এআই

আমি বলতে গেলে মোবাইল চালানোর ব্যাপারে অবসেশন লেভেলে চলে গেছি। প্রতিদিন গড়ে ৮-৯ ঘন্টা স্ক্রিনটাইম। মোবাইল ছাড়া এক ঘণ্টা থাকাটাও আমার জন্য অনেক কঠিন কাজ। আমার ভাই আমাকে পুরো একদিন ইন্টারনেটহীন থাকার অনুরোধ করেন। আমি চ্যালেন্জটা নিই। প্রথমে একটি বড় কাগজে ইংরেজিতে No phone day লিখে আমার রুমের ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় ঝুলিয়ে রাখি। ঘুমানোর সময় মোবাইলটা বন্ধ করে আম্মুর রুমে ওয়ারড্রোবে তালা দিয়ে রেখে আসি। এটা করেছি কারণ চোখের সামনে থাকলে আনমনে আবার ফোনটা হাতে নিয়ে নিতে পারি। তাহলে চ্যালেন্জটা সম্পূর্ণ করাটা সম্ভব হবে না। ফোন রেখে এসে ফ্রেশ হয়ে রাত ১২টার সময় ঘুমিয়ে পড়ি।

ঘুম থেকে উঠতে উঠতে সকাল ৯টা বেজে যায়। যথারীতি প্রাত্যহিক কাজকর্ম সেরে নাশতা করে আমার রুমে কয়েকটা বই নিয়ে বসি। টেবিলে কয়েকটা বই ছিল। নতুন কেনা। আমি খুব একটা বই পড়ি না। তবে এখন পড়ছি নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য। এই চ্যালেন্জটা না নিলে এসময়ে  ফোন নিয়েই বসতাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রিলস, ভিডিও, পডকাস্ট এগুলো দেখতাম। ফেসবুকে স্ক্রলিং করতাম। ইউটিউব চালাতাম। টিকটকে কন্টেন্ট দেখতাম। তাড়াতাড়ি সময় কেটে যেত। 

যা-ই হোক, বইগুলোর মধ্যে একটা বইয়ের নাম ছিল আধুনিক গরু রচনা সমগ্র। বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ব্যঙ্গাত্মকভাবে বিশ্লেষণমূলক লেখা। প্রথাগত লেখা নয়। পড়ে বেশ ভালো লাগল। একনাগাড়ে অনেকক্ষণ পড়ার পর আম্মু দুপুরের খাবারে ডাকলেন। খাবার খেয়ে গোসল করে একা একা শহরে হাঁটতে বের হলাম। হাঁটতে বের না হলে ঘরে বসে থাকলে ফোন চালানোর আকুলতা কাজ করবে। হয়তো নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে আবার ফোন নিয়ে বসে যাব! 

বাসা থেকে বের হয়ে প্রথমে হেঁটে হেঁটে ক্বীন ব্রিজের দিকে গেলাম। ব্রিজের এক পাশে কিছুলোক গানের আসর বসিয়েছেন। পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। অনেকক্ষণ মনোযোগ দিয়ে গান শুনলাম। একটু পর ওখান থেকে উঠে রেলস্টেশনের দিকে গেলাম। স্টেশন গিয়ে এক কাপ চায়ের অর্ডার দিলাম। কিছু পথশিশু ছিল সেখানে। তাদের বাচ্চাসুলভ দুষ্টমি দেখছিলাম আর আনমনে ছোটবেলার কথা মনে পড়ছিল। আমার বেশিরভাগ বন্ধু জীবিকার তাগিদে বিদেশে চলে গেছে। তখন থেকে আমি প্রায় একা হয়ে পড়ি। এসএসসির পর আমাকে মোবাইল কেনার পারমিশন দেওয়া হয়েছিল। তারপর থেকে স্মার্ট ফোনটিই আমার বন্ধু। প্রতিদিন নানা বিষয়ে ডকুমেন্টারি, মুভি, পডকাস্ট এগুলো দেখে দেখে দিনকাল যায়। সারাদিন ফোন নিয়ে বসে থেকে থেকে সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে ঠিক-বেঠিক নানা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বন্ধু-বান্ধবের সংখ্যা ভয়ংকরভাবে কমে গেছে। নিজের তৈরি অনলাইন জগতের অনলাইন কন্টেন্টের সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া যাকে বলে। 

যা-ই হোক, বিকেল ৪টা পর্যন্ত স্টেশনে বসেছিলাম। তারপর রিকশা নিয়ে শাহজালালের মাজারের দিকে গেলাম। শত শত লোকজন। ভিক্ষুকদের এক মহা মিলনমেলা হচ্ছে শাহজালালের মাজার। চুপচাপ লম্বা হয়ে লাইন ধরে ফ্লোরে শুয়ে থাকে। সারাদিন এভাবেই এরা বসে বসে, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়। মাজারে মানুষ শিরনি দিলে তা থেকে খায়। প্রান্তিক কিছু মুসলমান নারী-পুরুষকে দেখলাম মাজারের পাশে পুকুরের গজার মাছগুলোকে খাবার কিনে দিতে। গজার মাছকে খাবার দিলে নাকি মনের আশা পূর্ণ হয়। আরেকটি মহিলাকে দেখলাম মাজারের দানবাক্সে নিজের বাচ্চাকে চুমু খাওয়াচ্ছে। কিছু মানুষ কবুতরগুলোকে খাবার দিচ্ছে। আবার কেউ মাজারের সিঁড়িতে সালাম দিচ্ছে। মানে সিঁড়িতে হাত দিয়ে সেই হাত কপালে লাগাচ্ছে। এই বিশ্বাসটা সহজাত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রথা হিসেবে যুগে যুগে গড়ে উঠেছে। আমি শুধু দূর থেকে এসব লক্ষ্য করছি। কাউকে কোনো বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করিনি। মানুষের অগাধ ভক্তি দেখতে অন্য রকম অভিজ্ঞতা কাজ করে। আমি মানুষকে পর্যবেক্ষণ করতে পছন্দ করি।

মাজারে বেশ অদ্ভুত একটা গন্ধ পেলাম। কোনো একটা ফুলের গাছ থেকে তীব্র গন্ধ নাকে আসছে। এখানে অনেক কবর। মৃত মানুষেরা শুয়ে আছেন। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষকে এখানে এনে দাফন করা হয়। আমি একা একা কবরের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। কবরের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় শরীরের লোম খাড়া হয়ে যায়। ভয় লাগে। পকেটে হাত দিলাম মোবাইল বের করে ফ্লাশলাইট জ্বালানোর জন্য। হায় হায়! ফোন সাথে নেই। একটু পর মনে পড়ল আমি নাই নেটের চ্যালেন্জে আছি। তারপর একটু একটু করে ভয় মাড়িয়ে গোরস্তানের মাঝের পথ দিয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম। 

একটু দূরে সিলেট আলিয়া মাদ্রাসার মাঠে একটা সুন্দর মেলা বসেছে। ঝগঊ মেলা। সিলেটের বিভিন্ন এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য প্রদর্শন করার জন্য নিয়ে এসেছেন। আমি ভিতরে ঢুকে গেলাম। বেশ কিছু মজাদার পিঠার দোকান বসেছে। দেখতে বেশ লোভনীয়। কিন্তু দাম অনেক বেশি চাচ্ছিল। কয়েকটা মিষ্টি জাতীয় পিঠা খেলাম। একটু চক্কর দিয়ে বাসার দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। হঠাৎ রিকাবী বাজার পয়েন্টে চা স্টলে আমার এক স্কুল ফ্রেন্ডের সাথে দেখা হয়ে গেল। দুই বন্ধু একে অপরকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। ছোটবেলার অনেক পুরনো গল্প করলাম। একসাথে বসে আয়েশ করে চা খেলাম। বিভিন্ন বিষয়ে গল্প করতে করতে রাত প্রায় ৮টা বেজে গেল। ওকে রিকশায় তুলে দিয়ে ভাতালিয়া পয়েন্টের দিকে হাঁটতে লাগলাম। 

হাঁটতে বেশ ভালোই লাগছিল। পাশেই মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। এমনিতেই হাসপাতালের দিকে চলে গেলাম। সিলেটের নানাপ্রান্ত থেকে রোগ-ব্যাধি নিয়ে মানুষ এখানে আসে। বাচ্চারা চিৎকার করে কান্নাকাটি করছে। হাসপাতালের ফ্লোরে অসহায়ের মতো মানুষগুলো শুয়ে থাকে। যাদের একটু বেশি টাকা থাকে, তারা বিশেষ কায়দায় সিট পায়। হাসপাতালে আমি প্রায়ই আসি। আজকেও আসার কারণ হলো সময় কাটানো। নিজেকে বিজি রাখা। আমার ফোনটাকে মিস করছিলাম। বেশ কয়েকটা ছবি তোলার ইচ্ছে হচ্ছিল। অসুস্থ বাচ্চাদের ছবি। আম্মুকে দেখানোর জন্য। বাচ্চাগুলো আমার ছোট ভাতিজার মতো দেখতে। খুব কিউট কিন্তু অসুস্থ। কিন্তু ফোন কাছে না থাকায় ছবি তুলতে পারলাম না। একটু কষ্ট লাগল।

হাসপাতালে অসুস্থ মানুষদের দেখলে নিজের সুস্বাস্থ্য নিয়ে ভালো অনুভূতি তৈরি হয়। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিতে মন চায়। একধরনের পরিপূর্ণতার অনুভূতি কাজ করে। হাসপাতাল থেকে রাত ১০টার দিকে রুমে চলে আসি। আমাদের বাসা থেকে হাসপাতাল প্রায় ১০ মিনিটের দূরত্ব। সহজেই যাওয়া আসা যায়। হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আম্মুর সাথে ডিনার করতে বসে গল্প করেছি। ছোট বাচ্চাগুলোর কথা বললাম। সেটা শুনে আম্মু কষ্ট পেয়েছেন। আম্মুর সাথে, বোনের সাথে অনেকক্ষণ গল্প করলাম। সাধারণত প্রতিদিন এই সময়ে আমি ফোনে মুভি দেখি। দীর্ঘদিন ধরে এটাই রুটিন। এই সময়ে একই ঘরে থেকেও আম্মুর সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। আজকে এই চ্যালেঞ্জের কারণে বেশ কিছুক্ষণ আম্মুর সাথে কোয়ালিটি টাইম কাটালাম। তারপর রুমে চলে এসে আরেকটি বই নিয়ে পড়তে বসলাম। পড়তে পড়তে কখন ঘুম চলে এসেছিল বলতে পারব না। সকালে ঘুম ভাঙতে দেখি সাড়ে ৯টা বেজে গেছে। নিজের কাছে নিজের চ্যালেঞ্জটা সম্পূর্ণ করতে পেরেছি!! নিজের ওপর গর্ব হচ্ছে। 

নাই নেট সফল করার জন্য আমি দিনের প্রায় পুরোটা সময় বাসার বাইরে ঘুরাঘুরি করেছি। কিছু না করে চুপচাপ বাসায় বসে থাকলে কাজটা এত সহজে করতে পারতাম না। মোবাইল চালানোর ব্যাপারে আমার বড় রকমের আসক্তি আছে। এই চ্যালেঞ্জটা সফল করতে পারব বলে আমি শুরুতে আশাবাদী ছিলাম না। সারাদিন বাসায় বসে থাকলে হয়তে পারতাম না। তাই পুরোটা সময় বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়িয়েছি। মাঝেমধ্যে বেশ কয়েকবার মোবাইলের রিংটোন শোনার অনুভূতি হয়েছে। আনমনে পকেটেও হাত দিয়েছি। কিন্তু পকেটে ফোন ছিল না! এটা হয়তো একধরনের ফোবিয়া হবে। ফোন ছাড়া দীর্ঘক্ষণ থাকলে অশান্তি কাজ করে। পুরোটা সময় বাইরে বাইরে কাটানোর কারণে আকুতিটা নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু তারপরও একধরনের অসহায়বোধও জেগেছিল। মনে হচ্ছিল এখন যদি আমার এক্সিডেন্ট হয় বা কিছু একটা হয় তাহলে বাসায় খবর দেব কীভাবে। নাম্বার তো মুখস্থ না। 

তারপরও এই নাই নেট সফল করতে পেরে আমি নিজের প্রতি আরেকটু আত্মবিশ্বাসী হয়েছি। এর জন্য আমার বড় ভাই ইমরান চৌধুরীকে এবং জীবনজয়ীর এরকম একটা ইউনিক উদ্যোগের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমি এভাবে আবার একদিন নেটহীন থাকার চেষ্টা করব। যাতে মোবাইল ফোনের আসক্তি থেকে বের হতে পারি। কাজটা সহজ হবে বলে মনে হচ্ছে না। তবে এই আজকের দিনটা আমাকে আত্মবিশ্বাস দেবে। অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।


ক্যাটাগরি: নাই নেট

         

  রেটিং: ৪

এই বিভাগের আরও পোস্ট

বই পড়ে অন্য এক জগতে হারিয়ে গিয়েছিলাম

বই পড়ে অন্য এক জগতে হারিয়ে গিয়েছিলাম

  • ফারিহা আনজুম নোশিন|
  •  ০৫-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: নাই নেট

ইন্টারনেট ছাড়া এক শান্তিপূর্ণ দিন

ইন্টারনেট ছাড়া এক শান্তিপূর্ণ দিন

  • আবু সায়েম |
  •  ২৫-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: নাই নেট

আমি যেন এক নতুন জগতে পা রাখতে যাচ্ছি

আমি যেন এক নতুন জগতে পা রাখতে যাচ্ছি

  • পূজা প্রামানিক|
  •  ২৩-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: নাই নেট

একদিন নেটবিহীন:  রান্না, ছবি আঁকা আর দূরদেশের স্ত্রী

একদিন নেটবিহীন: রান্না, ছবি আঁকা আর দূরদেশের স্ত্রী

  • রাফি আন্ নূর|
  •  ১০-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: নাই নেট

 আষাঢ়ের এক নেটহীন দিন

আষাঢ়ের এক নেটহীন দিন

  • স্বর্না আক্তার লিজা|
  •  ০৪-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: নাই নেট

পুরোপুরি উশুল হওয়া একটা দিন

পুরোপুরি উশুল হওয়া একটা দিন

  • সামিয়া ইফফাত|
  •  ২৮-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: নাই নেট

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।