চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাপক অগ্রগতি, এবং নেটওয়ার্কিংয়ের অবাধ স্বাধীনতায় আজকের দিনে ইন্টারনেটবিহীন একটা দিন কল্পনা করা যায় না। এমন এক সময়ে, ২০২৫ সালের ৬ জানুয়ারি সকাল থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত, একটানা চব্বিশ ঘণ্টা, আমি কীভাবে ইন্টারনেটবিহীন সময় অতিবাহিত করেছি তা শেয়ার করছি এখানে। জীবনজয়ীর আহবানে সাড়া দিয়ে আমি নেট ছাড়া চব্বিশ ঘন্টা কাটাই।
আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী। সঙ্গত কারণেই আমার ইন্টারনেটের প্রয়োজন হয়। পড়াশোনা, অনলাইন পেপার, শিক্ষামূলক ভিডিও কিংবা বন্ধুদের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের বিকল্প নেই। তখন আমি গ্রামের বাড়িতে; রাজশাহীর তানোরে। নাই নেটের চব্বিশ ঘণ্টা আমার কেটেছে গ্রামীণ বাস্তবতায়। উল্লেখ্য, আমার গ্রামের বাড়ির দিকে অনেক মানুষ আছে যাদের সময় কাটাতে ইন্টারনেট লাগে না।
ছোটবেলা থেকে কৃষির সাথে আমার আত্মীয়তা। সে কারণে আমি ভেবেছিলাম ইন্টারনেট বিনে থাকার দিন আমাদের এলাকার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি একটু বোঝার চেষ্টা করব। তাই খুব সকালে ঘুম থেকে উঠলাম। উঠেই ইন্টারনেট চালু করা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সেদিন নিজেকে বিরত রাখলাম। ফ্রেশ হয়ে হালকা নাশতা সেরে বাড়ির পাশে আলু ক্ষেতে চলে গেলাম। আমাদের এই অঞ্চলে প্রচুর আলু চাষ হয়। কয়েক বছর আগেও রবি মৌসুমে আলুসহ অন্যান্য চাষাবাদ করা হতো। বর্তমানে যতদূর চোখ যায় শুধুই আলুক্ষেত। ঘন কুয়াশার মধ্যে কেবল পূব আকাশ লাল করে সূর্য স্বমহিমায় আকাশ ভেদ করে উঠতে চলেছে। চারিদিকে নীরবতার মধ্যে আলুচাষিরা চল্লিশ দিন বয়সী আলু গাছের ড্রেসিং করতে ব্যস্ত।
কয়জন আলুচাষির সাথে কথা হলো, জানতে চাইলাম আলুচাষের লাভ-ক্ষতি। সবার ইতিবাচক মন্তব্য দেখে মনে হলো চাষিরা আলুতে লাভবান হচ্ছেন। এজন্য অন্যান্য আবাদে অনীহা। তবে সারসহ কীটনাশকের অতিরিক্ত দাম এবং সময়মতো সেগুলো না পাওয়া বড় সমস্যা। এতে আলু চাষে খরচ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ইন্টারনেট থেকে দূরে থাকার চেষ্টায় আলুচাষিদের সাথে ভালোই সময় কাটালাম।
আলুক্ষেত থেকে ফিরে সকালের খাবার খেয়ে আবার বাড়ি থেকে বেরুলাম। বসলাম টং দোকানে। চা-টা বিক্রি হয়। কিশোর এবং বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেশি। বয়স্করা নিজেদের মতো গালগল্পে মগ্ন। কিশোররা স্মার্টফোনে ব্যস্ত। আমাদের ছোটবেলায় স্মার্টফোন এত সহজলভ্য ছিল না। আমরা ব্যাডমিন্টন, ক্রিকেটসহ নানান খেলা খেলতাম। কিশোরদের সাথে কথা বললাম। তাদের পড়াশোনার খোঁজখবর নিলাম। একদিন ইন্টারনেট বাদ দিলে মোগলাই পরোটা খাওয়ানোর প্রস্তাব দিলাম। সবাই সমস্বরে প্রত্যাখ্যান করল। ইন্টারনেটের বিনিময়ে মোগলাই অগ্রাহ্য হলো। জানাল ইন্টারনেট ছাড়া তারা কোনোভাবেই থাকতে পারবে না।
টং দোকান থেকে ফিরে কিছু বাড়ির কাজ করলাম। কাজ শেষে শেষের কবিতা নিয়ে বসলাম। সময় এগিয়ে চলছে আর আমি অমিত-কেতকী-লাবণ্যের প্রণয়োপাখ্যানের মধ্য দিয়ে চলেছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইন্টারনেট ছাড়া সারা জীবন কাটিয়েছেন—হঠাৎ কথাটা মনে এলো। একবার মনে হলো ইন্টারনেট যুগে জন্মালে রবীন্দ্রনাথ মোটেও রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠতেন না। বেলা গড়িয়েছে। শেষের কবিতা শেষ করা গেল না। উঠে পড়লাম। স্নান, দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সারলাম। সময় কাটাতে হবে আমাকে। ঘণ্টাখানেক একটা ঘুম দিলাম খাওয়া শেষে। অবাক ব্যাপার, নেটে ঢোকার খুব একটা টান অনুভব করছি না।
বিকালে এক কিলোমিটার দূরে গ্রামের বাজারে গেলাম। বাড়ি এসেছি অনেক দিন পর। পুরনো বন্ধু এবং গুরুজনদের সাথে দেখা হলে ভালো লাগবে। বাজারে এর-ওর সাথে দেখা। সন্ধ্যা নামার মুহূর্তে আমার একজন প্রিয় শিক্ষকের সাথে দেখা হলো। স্যার এখন প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। স্যারের সাথে একটি চা স্টলে বসলাম। বিভিন্ন বিষয়ে কথা বললাম। স্যার নিজের জীবনের কঠোর অধ্যবসায়ের কথা শোনালেন। মাধ্যমিক স্কুল শিক্ষকের বেতন-বঞ্চনাসহ কিছু অস্বস্তির কথা বললেন।
স্যারের সাথে আলাপ শেষ করে স্কুলবন্ধুদের সাথে আড্ডা শুরু করি। স্কুলে কীভাবে সময় কাটিয়েছিলাম, কীভাবে দুষ্টুমি করেছিলাম তার পুনরাবৃত্তি করছিলাম আমরা সবাই। এ যেন অতীতে ফিরে যাওয়ার এক অবোধ চেষ্টা। গল্প করতে করতে অনেকটা সময় পার হয়ে গেল। বাড়িমুখী হলাম। বাড়ি ফিরে রাতের খাবার খেয়ে আরেকবার শেষের কবিতায় ডুব। এবার শেষ করলাম। এর মধ্যে ঘুম এসে গেছে। ঘুমিয়ে গেলাম।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ইন্টারনেট চালু করলাম। এটাই ছিল প্রথম কাজ। আমি পেরেছি। ইন্টারনেট ছাড়া চব্বিশ ঘণ্টা পাড়ি দিতে। এটাও ঠিক যে নেট ফিরে পেয়ে প্রাণ ফিরে পাওয়ার অনুভূতি হয়েছিল। উপলব্ধি করলাম একটু চেষ্টা করলে ইন্টারনেট থেকে দূরে থাকা সম্ভব। কে না জানে যে ইন্টারনেট ব্যবহার না করার কোনো তাৎপর্য নেই। ইন্টারনেটের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু কিছু সময় দূরে থাকতে পারার অর্থ হচ্ছে আমি ইন্টারনেটের বশীভূত হয়ে যাইনি।