নেটবিহীন দিন কাটাতে পারব, কখনো ভাবতেই পারিনি। এ রকম একটা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য প্রথমেই জীবনজয়ীকে ধন্যবাদ। জীবনজয়ীর পক্ষ থেকে পাওয়া প্রস্তাবটিকে প্রথমে অদ্ভুত, পরে চমকপ্রদ মনে হয়েছে। শর্তমতো আমি ৪ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখ সন্ধ্যা ৭টা থেকে পরদিন সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, স্মার্ট টিভিসহ সব রকমের ইন্টারনেট ব্যবহার থেকে বিরত থাকি।
নেটওয়ার্ক বন্ধ করে ফোনটা রেখে দেওয়ার পর থেকেই মনের ভেতরে একটা অস্বস্তি ও শূন্যতা কাজ করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফোনটা হাতে নিতে, ফেসবুকে প্রবেশ করতে বারবার ইচ্ছে হচ্ছিল। বারবার মনে হচ্ছিল, কত কিছু ঘটে যাচ্ছে, অথচ আমি তা মিস করছি।
প্রথম কয়েক ঘণ্টা চরম অস্বস্তিতে কাটে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল, শর্ত ভেঙে ফোনটা নিয়ে অন্তত একবার চেক করে দেখি, কে কে মেসেজ দিল, কে কী রকম পোস্ট করল, নিউজ পোর্টালগুলোতে কী কী নিউজ এল। কত কিছু ঘটে যাচ্ছে, সেগুলো আমি জানতে পারছি না! রাত ১০টার পর এই ইচ্ছা আরও বেড়ে যাচ্ছিল। ঘুমাতে যাওয়ার আগে ফোনে কয়েক ঘণ্টা কেটে যায়, যার কারণে ঘুমাতে দেরি হয়। কিন্তু গত সন্ধ্যা থেকে ফোনের বাইরে থাকায় তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে গেলাম।
এখানে পড়ুন: শরৎবাবুকে রেখে চলে গেলাম জাবির বটতলায়
ঘুম থেকে জেগেও উঠি তাড়াতাড়ি। অস্বস্তিটা তখনো জারি ছিল। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফোন দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া চেক করার অভ্যাস। কিন্তু আজ এই অভ্যাসের ব্যত্যয় ঘটল। ফোন হাতে নিয়ে নেট চালু করে সবকিছু দেখার তীব্র ইচ্ছা হচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর পড়তে বসলেও দেখলাম, ফোনটা দরকার। কয়েকটা আরবি শব্দের অর্থ খুঁজতে ফোনটার দরকার ছিল, কিন্তু তা আর হলো না। পরে অভিধান থেকে শব্দগুলো খুঁজে নিই। এর জন্য কিছুটা বেশি সময় লেগে যায়। সকালের দিকে একটু অস্বস্তি লাগলেও পরে ধীরে ধীরে ভালো লাগতে শুরু করে। কারণ, আজ সকালে ফোনটা হাতে না নেওয়ায় বই পড়তে বেশি সময় দিই; নতুন কয়েকটা বিষয় শিখে নিই।
আমি নিশ্চিত জানতাম, অনেক বন্ধু আমাকে একাধিকবার মেসেজ ও কল দিয়েছে, কিন্তু উত্তর দেওয়া হয়নি। দুজন আবার হলের রুমে এসে খোঁজ নিয়ে গেল, কোনো সমস্যা হয়েছে কি না! আবার একটা শঙ্কাও কাজ করছিল, বাড়ি থেকে কেউ ফোন করল কি না। ফোন রিসিভ না করলে বাড়ির সবাই টেনশনে পড়ে। এ জন্যই বেশি চিন্তা হচ্ছিল। যা-ই হোক, আমার সময় গড়াতে থাকে নেট ছাড়াই।
বিকেলের দিকে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে আড্ডা দিই। তাই তখন তেমন কিছু মনে হয়নি। কিন্তু সন্ধ্যা নাগাদ আবার অস্বস্তি লাগতে থাকে। বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলাম, কখন চব্বিশ ঘণ্টা পূর্ণ হবে, তা দেখার জন্য। অবশেষে সাতটা বাজল। আমি ঢুকলাম ইন্টারনেটে, পাক্কা চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে।
এখানে পড়ুন: নেটহীন একদিন: বই, কবিতা আর তিস্তার পাড়
নেট ছাড়া নিয়ে পরে আমি একাধিকবার ভেবেছি। নেট ছাড়া অনেকটা সময় পর্যন্ত আমার যে অস্বস্তি কাজ করেছিল, অনেক কিছু মিস করার যে ভয় হচ্ছিল, সেগুলো আসলে আমার অভ্যাসের ফল। আবার এটাও ঠিক যে একটা পর্যায়ে নেট ছাড়া থাকাটা প্রশান্তিতে রূপ নেয়। বই পড়া, নিজের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল, যেটা আজকালকার ইন্টারনেট জমানায় আর হয় না।
শেষমেশ, এটি আমার জন্য একটা রিফ্রেশিং ব্রেক ছিল, যা আমাকে নিজের জীবনের অন্য দিকগুলোতে মনোযোগ দেওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ইন্টারনেট ছাড়া থাকা অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং, এমনকি আমার কাছে অসম্ভবও মনে হচ্ছে।
পুনরায় ধন্যবাদ জীবনজয়ীকে, এ রকম একটা অভিজ্ঞতার স্বাদ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।
এখানে পড়ুন: অনেক দিন পর চিঠি লিখতে বসে গেলাম