জীবনজয়ীর ‘নাই নেট’ বিভাগের ডাকে সাড়া দিয়ে একদিন নেটহীন থাকলাম। তারাদের থেকেও বেশি আলোকবর্ষ দূরে সরে যাওয়ার এই যুগে বন্ধু-পরিজনদের একটু সময় দিলাম এবং সঙ্গ দিলাম বই আর কবিতাকে। সে অভিজ্ঞতাই আজ লিখব।
এই জুনের দুই তারিখ সকালে ঘুম থেকে উঠে স্বভাবগতভাবে ফোন হাতে নিলাম না। বরং বুকশেলফে সাজিয়ে রাখা অ্যারিস্টটলের ‘মেটাফিজিক্স’ হাতে তুলে নিলাম। বহুদিন ধরেই বইটি পড়ার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু অনলাইন ব্যস্ততার ভিড়ে মনোযোগী হয়ে বসা হচ্ছিল না।
অ্যারিস্টটল তাঁর এই বইয়ে এমন সব প্রশ্নের সামনে মানুষকে দাঁড় করিয়েছেন, যেগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা আমরা হাজার বছর ধরে করে আসছি। ‘অস্তিত্ব’ কী? কোনো কিছুকে আমরা কেন ‘বাস্তব’ বলি? পরিবর্তনের মধ্যেও কোনো বস্তুর পরিচয় কীভাবে অটুট থাকে? এই প্রশ্নগুলো পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল, আধুনিক যুগে আমরা তথ্যের কাছে যত দ্রুত পৌঁছাই, ততই হয়তো প্রশ্ন করতে ভুলে যাই। ইন্টারনেট আমাদের হাজারও উত্তর দিতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন করার অভ্যাসটা গড়ে তোলে না। অ্যারিস্টটলের সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে সেই প্রশ্নমুখর জগতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেলাম।
যদিও এই বইয়ের অনেক কিছুই আমি বুঝিনি, তবুও হতাশ হইনি। কারণ শুনেছি, অ্যারিস্টটলের অন্যতম যোগ্য উত্তরসূরি ইবনে সিনা নাকি বিয়াল্লিশ বার পড়েও এই বইয়ের মর্মার্থ বোঝেননি। পরে তিনি সৌভাগ্যক্রমে ইবনে রুশদের লেখা মেটাফিজিক্সের ধারাভাষ্যটি পান এবং সহজে বুঝতে পারেন। ইবনে রুশদ অ্যারিস্টটলের মেটাফিজিক্সের উপর এমনই এক ধারাভাষ্য লিখেছিলেন যে, তাঁকে ইতিহাস এখনও স্মরণ করে ‘অ্যারিস্টটলের ধারাভাষ্যকার’ হিসেবে। তো যে বই ইবনে সিনা বিয়াল্লিশ বার পড়েও বোঝেননি, তার নাড়িনক্ষত্র আমি প্রথম বসাতেই বুঝে ফেলব, তা তো অসম্ভব। তাই হতাশ হইনি।
দুপুরের দিকে বই থেকে কিছুটা বিরতি নিয়ে ফারসি কবিতার অনুবাদে মন দিলাম। ফারসি কবিতার প্রতি আমার আকর্ষণ অনেক দিনের। এই সাহিত্যধারার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর বহুস্তরীয় অর্থ। একই পঙ্ক্তি একদিকে প্রেমিক-প্রেমিকার কথোপকথন, অন্যদিকে আত্মা ও পরমের সম্পর্কের প্রতীক হতে পারে। গোলাপ, বুলবুল, মদ, সাকি কিংবা বসন্ত—এই পরিচিত চিত্রকল্পগুলো ফারসি কবিতায় গভীর আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক অর্থ বহন করে।
সেদিন একটি ছোট কবিতা অনুবাদ করছিলাম:
সুরার পেয়ালা তুলে আনন্দের রঙে ভরে এসো; শত্রুর বাঁধন ভেঙে গোপনে বিদ্রোহ করে এসো। শত্রু বলে— “থেমে থাকো, এগিয়েো না”, তার কথা নয়; আমার কথাটি শোনো— “জেগে ওঠো, দূরে সরে এসো।”
কবিতাটা ফারসি ভাষার মরমি কবি হাফিজ শিরাজি-র। হাফিজের কবিতায় নিষ্কলুষ আনন্দের দিকে আহ্বান ধ্বনিত হয়। চারিদিকে সবাই আমাদের নিরানন্দের মধ্যে আটকে রাখতে চাইবে। কিন্তু হাফিজ বলছেন, বিদ্রোহ করে নিরানন্দ থেকে সরে আসতে এবং অনন্ত আনন্দের সাগরে অবগাহন করতে।
বিকেলের দিকে দুজন বন্ধুর সঙ্গে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য তিস্তা নদীর পাড়। শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে আমরা গ্রামের পথ ধরে এগোতে লাগলাম। আমাদের সঙ্গ দিচ্ছিল ধানক্ষেত, কাঁচা রাস্তা আর দূরের গাছপালার সারি।
তিস্তার কাছে পৌঁছে মনে হলো, নদী সবসময় মানুষের চেয়ে বেশি ধৈর্যশীল। বর্ষায় যে নদী উন্মত্ত হয়ে ওঠে, এখন সে অনেক শান্ত। বিস্তৃত বালুচর, দূরে চিকচিক করা পানির রেখা আর পশ্চিম আকাশের কোমল আলো মিলিয়ে যে অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করেছিল, তা হাফিজের কবিতার মতোই মনোরম, অ্যারিস্টটলের মেটাফিজিক্সের মতোই ভ্রমাত্মক। নদীর পাড়ে বসে আমরা গল্প করলাম, নীরব থাকলাম, আবার গল্প করলাম। আশ্চর্যের বিষয়, কারও হাতে থাকা ফোনের প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছিল না।
সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিমে হেলে পড়ছিল। তিস্তার জলের ওপর শেষ বিকেলের আলো ভেঙে ভেঙে পড়ছিল। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, মানুষের জীবনে কিছু সময় থাকা দরকার যা কোনো নোটিফিকেশন, কোনো স্ক্রলিং বা কোনো অ্যালগরিদমের অধীনে নয়। যে সময় কেবল নিজের, বন্ধুদের, বইয়ের এবং প্রকৃতির।
রাতে বাড়ি ফিরে আবার কিছুক্ষণ পড়াশোনা করলাম। পরদিন সকালে ইন্টারনেট চালু করলে স্বাভাবিকভাবেই মেসেজ, নোটিফিকেশন এবং নানা আপডেটের ভিড় সামনে এসে হাজির হলো। কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টার অভিজ্ঞতা আমাকে একটি কথা নতুনকরে উপলব্ধি করিয়েছে—ইন্টারনেট আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ, কিন্তু জীবনের পুরোটা নয়। বইয়ের পাতা, একটি কবিতার পঙ্ক্তি, বন্ধুর সঙ্গে সাইক্লিং কিংবা নদীর পাড়ের নীরবতা—এসবেরও নিজস্ব এক জগৎ আছে। মাঝে মাঝে সেই জগতে ফিরে যাওয়া প্রয়োজন।