সাময়িকী

শিউলিফুলেরা ও আমি


  • দিলারা রহমান  সিলেট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় |
  • প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৬, ২২:১১
শিউলিফুলেরা ও আমি
ছবি: এআই

শিউলি ফুলের প্রতি আমার এক রকম ঘোর লাগা ভালোবাসা রয়েছে। রাশি রাশি শিশিরমাখা শিউলি ফুল আর তার মৃদু সুবাস আমাকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার মতো প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করে, “আমি কখনো কাউকে দুঃখ দেব না!” এখনো প্রতি বছর শরৎ ঋতুর শেষে, হেমন্তের শুরুতে কংক্রিটের আকাশছোঁয়া অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ফাঁকে আমি খুঁজতে থাকি সেই প্রিয় সুগন্ধ, সেই রাশি রাশি কমলা বোঁটার মিশেলে সাদা শিউলি ফুলগুলোকে। কোথাও একটা গাছ আছে, এমন যদি খোঁজ পাই, ভোরের কুসুমরঙা আকাশকে সাক্ষী রেখে আমি সেখানে হাজির হই, যেন একান্ত বাধ্যগত কোনো ছাত্র তার শিক্ষকের কাছে উপস্থিত হয়েছে, কিছু দিকনির্দেশনার আশায়! বলতে দ্বিধা নেই, এই সাদা শিউলির রাশিকে আমি আমার শিক্ষক মানি।

কেউ হাসতে পারেন আমার কথায়, কিন্তু সত্যি আমি তাই জানি। সাদা শিউলির রাশিকে দেখে আমার নিজেকে নিয়ে অনুশোচনা হয়, গ্লানি হয়। আমি তবে কেন এত শুভ্র সুন্দর নই! চেহারা বা আকৃতিতে নয়, আমার ভিতরের আত্মিক অবয়ব কেন এত স্নিগ্ধ হতে পারে না! কেন আমি আমার মধ্যে কখনো কখনো লোভ, হিংসা বা বিদ্বেষ দেখতে পাই?

এই শিউলি ফুলে আমি আমার শৈশব, কৈশোর, তারুণ্যের শুরুর দিনগুলো দেখতে পাই। ছোটবেলায় ফ্রিল দেওয়া ফ্রকের কোঁচড় ভর্তি অপাপবিদ্ধ শিউলি ফুলেরা আমাকে একদিন বলেছিল, “চলো, আমরা আরও সুন্দর হই!” আমার এ ক্রীতদাসসম জীবনে সুন্দর হওয়া হয়নি ঠিকই, তবুও আমি সুকান্ত ভট্টাচার্যের মোরগের মতো ঘাড় উঁচু করে স্বপ্ন দেখি, আমরা নিশ্চয়ই একদিন শুদ্ধ হব।

একবার আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একটা উঁচু টিলার জংলা জায়গায় আমার দৃষ্টি আটকে যায়। আমি স্থির চোখে তৃষ্ণার্তের মতো তাকিয়ে থাকি। সেই টিলার ছোট্ট এক ছড়ায় টলমল করছে জল! গাছের পাতার ফাঁক গলে রোদের ছায়া ঝালর হয়ে পড়ে আছে স্ফটিকসম সেই জলে। কী যে অপার্থিব এক দৃশ্যপট! জলে খেলে চলেছে ডানকিনে মাছেরা! গাছের পাতায় উঁকি দিল কিছু একটা! ওটা কী! লাউডগা সাপ? লাউডগা সাপে আমার একটুও ভয় করে না! এটাই তো সঠিক! এ তো লাউডগারই বিচরণভূমি। এই জলজ হাওয়ার জংলা ছড়ায় আমি তো বরং অনুপ্রবেশকারী! এ স্থান লাউডগা সাপের, মিষ্টি রোদের আর ডানকিনে মাছের! কী সুন্দর মিলে মিশে থাকা, যূথবদ্ধ থাকা। কেউ কারও অবিরাম চলায় পথ আটকে নেই! আমি এখানে বেমানান। আমি এদের অবিরাম চলার পথে বাধ সাধা এক উটকো ঝামেলা।

খুব ইচ্ছে করছিল এই জলজ হাওয়ায় খানিকটা বসে আমি আমার প্রাত্যহিক গতানুগতিক ক্ষমতাসমৃদ্ধ পদ-পদবি, মানুষকে তাচ্ছিল্য করার রুটিন কাজ ভুলে শিশু হয়ে যাই। মাতৃদুগ্ধ পান করা, স্বর্গীয় গন্ধভরা মুখের আধো বোলের অবুঝ শিশু! টলমল জলে ডানকিনে মাছেদের খেলা দেখতে দেখতে সারল্যে ভরা দিনগুলোর জন্য আমার বুকের ভিতরে হু হু করে ওঠে। নিজেকে ভীষণ ব্যর্থ মানুষ মনে হয়। উপরে ওঠার বাসনায় আমার শিশু হওয়া হবে না আর! দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে পড়ি। কেননা ডানকিনেরা, লাউডগা সাপ আমাকে দেখে কিছুটা সন্দেহ করছে! ভাবছে আমি কোনো দখলদার! সে কারণে হয়তো হিংস্র হয়ে উঠছে। একটু যেন ফোঁস ফোঁস টের পাই! কেন আমি তাদের হিংস্র হতে দেব? কেন আমি নতুন কোনো দাবিদার হব, যেখানে আমার বাস নয়। থাকুক সবাই আনন্দে, যে যার মতো এই ধরণির বুকে! ধরণির কোল সবার! ঐ কোলে খেলা করতে, ঘুমিয়ে যেতে, কার না সাধ জাগে। সবারই তো সমান অধিকার।

সেদিন, ব্যালকনিতে বসে পড়ন্ত বিকেলে চা খাচ্ছি। খানিকটা বিস্কুটের গুঁড়ো পড়েছিল মেঝেতে। হঠাৎ দেখি রাজ্যের পিঁপড়ে বিস্কুটের গুঁড়োগুলো টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কোনো গুঁড়োতে পাঁচটা, কোনোটাতে দশটা! কোনোটায় দু-তিনটা। কোথা থেকে পেল এ খবর যে, এখানে তাদের জন্য অমৃতসম খাবার রয়েছে! কোন নেটওয়ার্ক তাদের! ফেসবুক, টুইটার? অদ্ভুত এ খবর আদান-প্রদানের নেটওয়ার্ক আমাকে ভাবিয়ে তোলে! কী শক্তিশালী সোশ্যাল ক্যাপিটাল এদের! শুধু তাই নয়, এরা যখন লাইন ধরে চলে, কী ডিসিপ্লিন মেইনটেন করে! কেউ কাউকে লাইনচ্যুত করার চেষ্টায় নেই। কারও আগে যাওয়ার ব্যস্ততা নেই। বিপরীত দিক থেকে আসা দলকে এরা সবাই থেমে থেমে ছুঁয়ে দেয়; একটা মিথস্ক্রিয়া হয়! নিজেকে ভীষণ তুচ্ছ, ক্ষুদ্র মনে হয়। বন্ধু কি প্রিয়জন কিংবা সহকর্মী, কারও জন্য আমার কোনো সৌজন্য নেই। অমৃতসম খাবারের সন্ধান পেলে তা আমি একাই সাবাড় করে দিই। ঘুণাক্ষরেও কাউকে জানাই না। দলবল নিয়ে মারামারি করতে রাজি আছি, গালিগালাজ করতে শতভাগ তৈরি আছি, কিন্তু খাবারের সন্ধান, ভালো কোনো কাজের খোঁজ, একসঙ্গে ভালো কিছু করার বোধ, আমাদের মানুষের অভিধানে আর নেই! আদিম যুগে গুহায় বসবাসকারী মানুষের ছিল, যা পাঠ্যে লেখা আছে, কিন্তু সভ্য আমাদের অভিধানে, পোস্টমডার্ন এই সময়ে, কবেই তা উবে গেছে! আমি কি পিঁপড়েদের ভালোবাসা, সৌজন্য, নেটওয়ার্কিং দেখে লজ্জা পাই? কী জানি, হয়তো অথবা হয়তো নয়।

মাঝে মাঝে ভাবি, এত বই পড়ে, ডিগ্রি অর্জন করে, সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে মোটামুটি ভালো থেকে কতটুকু পাওয়া হলো জীবনে? কূটচাল, শুধু নিজেকে নিয়ে চিন্তা করে স্বার্থপরতাকে আঁকড়ে ধরা, আরও, আরও বেশি চাওয়া, ক্ষমতার শিখরে চড়ার মোহে আমি কি আদতে বন্ধুহীন, স্বজনহীন, ক্ষমতালিপ্সু এক অন্য মানুষে পরিণত হইনি, যাকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে মান্য করা যায় না আর! চারদিকে এত ঘৃণা, এত বিভেদ, এসব করে আমাদের লাভ কতটুকু হলো! শক্তিশালী হতে গিয়ে আমি কি ক্রমশ খাদের কিনারে চলে যাইনি?

দিন শেষে নির্মল আকাশের সবটুকু নীল যদি দেখাই না হলো, এত বয়ান, মতাদর্শ, পদবি আমার জন্য তাহলে কী সম্ভার নিয়ে এলো! ভাবতে থাকি। বুকের ভিতরে হাহাকার টের পাই। শুভ্র শিউলি হওয়ার জন্য আমার মন কেমন করতে থাকে। সৌজন্যবোধ প্রকাশ করার জন্য আমি চারদিকে বন্ধু খুঁজি। কেউ কোথাও নেই! আমি বড় একা হয়ে পড়ি! দৃষ্টি ঝাপসা হতে থাকে চোখের জলে।


ক্যাটাগরি: সাময়িকী

         

  রেটিং: ৪.১

এই বিভাগের আরও পোস্ট

শিউলিফুলেরা ও আমি

শিউলিফুলেরা ও আমি

  • দিলারা রহমান|
  •  ১২-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৪.১

পার্বতীপুরের পরের গল্প

পার্বতীপুরের পরের গল্প

  • আকমাল হোসাইন|
  •  ১১-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

অ্যারিস্টটলের কাছে আলেকজান্ডার কী শিখেছিলেন

অ্যারিস্টটলের কাছে আলেকজান্ডার কী শিখেছিলেন

  • ফারিয়া আক্তার জুঁহি|
  •  ০৬-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৩.৫

কে সেরাহ, সেরাহ

কে সেরাহ, সেরাহ

  • জাওয়াহ বিনতে মিজান স্বর্ণা|
  •  ০৪-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

 হুমায়ুন স্যারের হিমু নাকি অন্য কেউ

হুমায়ুন স্যারের হিমু নাকি অন্য কেউ

  • নাবিলা তাসনিম স্নেহা|
  •  ৩১-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

কেন আপন লাগে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল

কেন আপন লাগে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল

  • মোঃ আরাফাত হোছাইন|
  •  ৩০-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।