কেন আপন লাগে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল


  • মোঃ আরাফাত হোছাইন  চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ |
  • প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০০:৩৩
কেন আপন লাগে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল
ছবি: এআই

বড় স্ক্রিনের আলো তখন নিভে গেছে। জার্সি গায়ে পতাকা হাতে একদল সমর্থক একটানা বাজিয়ে যাচ্ছে ভুভুজেলা। কেউবা নিচ্ছে আনন্দ মিছিলের প্রস্তুতি। দৃশ্যটি দেখে মনে হতে পারে এটি রিও ডিজেনেরিও কিংবা বুয়েরোস আইরেসের রাস্তা। কিন্তু বাস্তবে এটি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা।

 মানচিত্রের প্রায় উল্টো দিকের হাজার মাইল দূরের ব্রাজিল আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের উপচে পড়া আবেগ ও সমর্থন যেন এক রহস্য! এই বিপুল আবেগের পেছনে খোঁজা হয় কিছু প্রচলিত কারণ।

কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের প্রেক্ষিত বিবেচনা করলে মনে হয় প্রচলিত সব কারণ এর চাইতে অপ্রচলিত কিছু বিষয় ও ইতিহাস আরো প্রভাবশালী। যেখানে মানুষ ইতিহাস, সংস্কৃতি, সংগ্রাম ও প্রতীকের মাধ্যমে ভৌগোলিক দূরত্ব অতিক্রম করে কাল্পনিক এক সম্পর্ক নির্মাণ করেছে।


ক্যাম্পাসের বুকে এক টুকরো ফুটবল স্বর্গ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বকাপ উন্মাদনা


জোগো বনিতো কিংবা ঈশ্বরের হাত

১৮৯৪ সালের চার্লস মিলার নামের এক রেল কর্মকর্তার ছেলে বৃটেনের পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে ব্রাজিলে ফেরত আসে।  লাগেজ করে নিয়ে আসেন দুটো ফুটবল।  এভাবেই লাতিন দেশটিতে পরিচয় ঘটে ফুটবলের।  তবে খেলাটির নাম এখানে ফুটবল নয়। ব্রাজিলের লোকজন একে ভালোবেসে বলে 'জোগো বনিতো' বা 'দ্যা বিউটিফুল গেম'।  দাস প্রথার সময় কাজের জন্য লক্ষ লক্ষ আফ্রিকানকে ব্রাজিলে আনা হয়।

সেই দাসরা সঙ্গে নিয়ে আসে নিজস্ব সংগীত, নৃত্য ও ছন্দ।  ফুটবলেও শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ তথা ড্রিবলিং হয়ে ওঠে নাচের মুদ্রার মতো। ১৯৯৮ থেকে ১৯৭০ সালে ব্রাজিলের এমন খেলা দেখে বিদেশে সাংবাদিকরা এর নাম দিল 'সাম্বা ফুটবল'। যেখানে বল পায়ে নাচে। ৫০০ বছরের দাস প্রথার ইতিহাসকে সাথে নিয়ে দুঃখ-দারিদ্রে জীর্ণ লোকদের কাছে ফুটবল হয়ে ওঠে কস্টের নিদান।

তাইতো জাগতিক দুঃখবোধ আর জোগোব বনিতোর আনন্দ- এই মিশ্র অনুভূতি নিয়ে ব্রাজিল। যাকে পর্তুগিজ ভাষায় বলে 'সাউদাদ'। মহাভারতে কর্ণ বলেছিল "জয় নয়, অভীষ্ট চেয়েছি"। তেমনি ব্রাজিলে ফুটবল কেবল জয় বা গোলের সংখ্যা নয়, ফুটবল এখানে সংস্কৃতি, আত্মরক্ষা ও আত্মপ্রতিষ্ঠার হাতিয়ার।

ষোড়শ শতকে ইউরোপীয় নানা দেশ থেকে মানুষ আর্জেন্টিনায় আসা শুরু করে। কারণ ছিল বিস্তীর্ণ উর্বর চাষযোগ্য জমি, চারনভূমি আর উদার অভিবাসন নীতি। ব্রিটিশের হাত ধরে এখানেও ফুটবল আসে।  তবে গোড়ার দিকে ব্রিটিশ সাহেবরা এখেলা নিজেরাই খেলতে। স্থানীয়দের যুক্ত করত না।  কিন্তু বাচ্চাদের জগত ছিল ভিন্ন।  ব্রিটিশ ও আর্জেন্টাইন বাচ্চারা একত্রে বাড়ির উঠোনে বা গলিতে ফুটবল খেলতো।

গলির ছোট আয়তনে লম্বা পাস খেলা যেতোনা। তাই ছোট পাস, স্পেস বের করা ও কৌশলী দৌড় শুরু থেকেই আর্জেন্টিনার ফুটবলে ঢুকে গেল। ভিন্ন দেশ ও গ্রাম থেকে শহরে আসা বহুসংস্কৃতির মানুষের ঐক্য ও সাধারণ পরিচয়ের বাহন হয়ে উঠল ফুটবল। আর্জেন্টিনার লিভারপ্লেট বা বোকা জুনিয়র্স ক্লাবগুলো হয়ে উঠলো বংশানুক্রমে সমর্থনের ক্ষেত্র। ১৯৮৬ র ম্যারাডোনা যেভাবে বল পায়ে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতিশোধ নিলেন, সেটাই বলে দেয় আর্জেন্টিনা ফুটবল খেলে ইতিহাস, জেদ ও আবেগ দিয়ে। যেখানে ফুটবলাররা যোদ্ধা।


দুয়ারে বিশ্বকাপ: পথে-প্রান্তরে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল


কিছু প্রচলিত কারণ ও অন্যান্য

বাংলাদেশের ব্রাজিল আর্জেন্টিনার প্রতি বিপুল সমর্থন তৈরি হয় ৮০ ও ৯০ এর দশকে। এর পিছনে দাঁড় করানো হয় কিছু প্রচলিত যুক্তি। ১৯৮০ সালের পর টেলিভিশনের পর্দায় প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফুটবল দেখার সুযোগ ঘটে। বাংলাদেশে সে সময় আন্তর্জাতিক ফুটবল দেখার প্রধান উপলক্ষ্য ছিল ফিফা বিশ্বকাপ। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা চমৎকার ফুটবল শৈলী ও সাফল্যও মানুষকে আকৃষ্ট করে।

পাশাপাশি পেলে, ম্যারাডোনা হয়ে উঠে ফুটবল গ্রেট বা আইকন। পরবর্তীতে রোনালদো, নেইমার, মেসি নতুন প্রজন্মের কাছে আরো জনপ্রিয় হয়। ব্রাজিলের ছন্দময় ফুটবল আর আর্জেন্টিনার লড়াকু মনোভাব মানুষের মন জয় করে নেয়। চার দশক ধরে এই দুদেশের সমর্থন পারিবারিক ঐতিহ্যের রূপ নেয়। বিশ্বকাপের ইতিহাস, প্রচারযন্ত্র, কিংবদন্তী ফুটবলার ও পারিবারিক ঐতিহ্য- ব্রাজিল আর্জেন্টিনা সমর্থনের যেনো সম্মিলিত কারণ। তবে এই প্রচলিত কারণ ও যুক্তির কিছু ধূসর এলাকা রয়েছে।  যেমন ৮০ ও ৯০ এর দশকে ইউরোপের দলগুলোও ভালো ফুটবল খেলত।

১৯৭৪, ১৯৮২, ১৯৯০- এই আসলগুলো শিরোপাও তাদের ঘরে। কারণ একই সময়ে ইউরোপেও মিশেল প্লাতিনি, বাস্তান, মালদিনি, ম্যাথুয়াসদের মতো অসাধারণ আইকন ছিলেন। তবু তাদের প্রতি এদেশের মানুষের গণআবেগ তৈরি হয়নি। অনেকে দাবি করেন, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার উপনিবেশিক ইতিহাস দুঃখ-দারিদ্র্যের গল্প বাংলার মানুষের আবেগ গঠন করেছে। এটিও একটি মোটাদাগের আলাপ।

কারণ সাধারণ মানুষ ব্রাজিল আর্জেন্টিনার রাজনৈতিক সামাজিক ইতিহাস বই পড়ে শেখেনি। তাদের দীর্ঘ উপনিবেশিক শাসন সম্পর্কেও গভীর ধারণা রাখেনা। তাহলে কি সচেতন ও আনুষ্ঠানিক ইতিহাস পাঠের পাশাপাশি ইতিহাসকে বুঝবার অন্য কোন অবচেতন বা দূরবর্তী জনবোঝাপড়া আছে!  বাংলাদেশের মানুষ কি শুধু ফুটবল দক্ষতার কারণে ব্রাজিল আর্জেন্টিনা  সমর্থন করে, নাকি লাতিন ইতিহাস, সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক প্রতীকের সাথে একটি অবচেতন সংযোগও অনুভব করে।

আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল তর্কযুদ্ধ: সিলেটের দলদলি চা বাগানে

 'কল্পিত সংহতি'র সন্ধানে

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন দাবি করেন যে, জাতি হলো একটি 'কল্পিত রাজনৈতিক সম্প্রদায়'। অর্থাৎ একটি জাতির অধিকাংশ মানুষ কখনো একে অপরের সঙ্গে দেখা না করলেও নিজেদের একই জাতির সদস্য হিসেবে অনুভব করে। এই 'সফট আইডেন্টিটি' বা 'কাল্পনিক সংহতি'র দরুন দুই প্রান্তের মানুষ একে অপরকে ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও কিছু প্রতীক ও আবেগময়তার ভিত্তিতে নিজের কাছাকাছি বোধ করে।  ফুটবলও এক ধরনের কল্পিত বৈশ্বিক সম্প্রদায় তৈরি করে। যেখানে মানুষ নিজের দেশের বাইরের একটি দলকেও পরিচরের অংশ ভাবে।

বলা হয়, যেলোক ইতিহাস জানে না সে যেন আজকেই জন্মালো। বাংলাদেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সমর্থনকে কেবল ক্রীড়াপ্রীতি হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয় বরং এটি আন্ত:জাতিক কল্পিত সংহতির প্রকাশ। উপনিবেশিক অতীত থেকে উঠে আসা দেশ দুটি যেন বাংলাদেশ সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। দারিদ্র ও সংগ্রামী গল্প বনাম ফুটবলকে জীবনর অংশ বানানো- এই এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের যোগসূত্র।

বাংলার মানুষের অবচেতন আবেগ তাই মিশে যায় ছোট পাস কিংবা ব্রাজিলের ডিবলিং এ। হালের নেইমার যেন গলির ধারের দুরন্ত বালক, মেসি হয়ে ওঠে পদ্মা পাড়ের সেই ছেলেটি। বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহাসিকভাবে সংগ্রাম, আবেগ ও বিজয়ের গল্পের সঙ্গে সহজে সংযোগ অনুভব করে। ল্যাটিন দেশ দুটির সাথে তেমনি আমাদের দূরবর্তী অনুভূতির সম্পর্ক। ইউরোপ ও উপনিবেশিক বাস্তবতা দুপ্রান্তকে মিলিয়ে দেয় এক পাটাতনে। এখানে রাজনৈতিক টানাপোড়ন, না পাওয়ার আর্তি ছাপিয়ে এক ফালি আলো হয়ে আসে ফুটবল। কেউ কারো ইতিহাস জানে না কিন্তু অবচেতনভাবে ইতিহাস, দ্রোহ আর আবেগের এই স্রোত আটলান্টিক পেরিয়ে মিশে যায় বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত।

জীর্ণ বস্তিতে বেড়ে ওঠা পেলে, নেইমারের অপ্রাপ্তির কান্না, কিংবা ম্যারাডোনার বিপ্লবী ক্ষ্যাপাটে দৌড়, মেসির হার না মানা প্রচেষ্টার আন্ডারডগ গল্পগুলো আমাদের আলোড়িত করে। ইতিহাসের নানা অজানা, অদেখা বিষয়ের একটি সূত্র আছে, যে সূত্র ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা কে নিয়ে আসে বাংলার কাছাকাছি।  বৈশ্বিক দক্ষিনের অভিন্ন অভিজ্ঞতার প্রতীকের মাধ্যমে যে সূত্র গড়ে তুলে যৌথ স্মৃতি, যৌথ স্বপ্ন।

মানুষ জন্মায় প্রকৃতির নিয়মে কিন্তু মানুষ হয়ে ওঠে গল্প স্মৃতি ও প্রতীকের মাধ্যমে। তাই মানুষ গল্পপ্রিয়, পছন্দ করে আন্ডারডগ স্টোরি। খোঁজে না পারা, অদম্য প্রচেষ্টা, ঘাত প্রতিঘাত ও শেষপর্যন্ত বিজয়ের হাসি। এর সবটাই আছে ফুটবলে, আরও আছে ব্রাজিল আর্জেন্টিনার মহাকাব্যে। একটা সুন্দর গল্প দিয়ে মানুষকে শাসন করা যায়। লাতিন দেশদুটোর ইতিহাস, ফুটবল সংস্কৃতি ও জনমনস্তত্ত্বেরও গল্প আছে। যে গল্পে, কাব্যে বাংলার মানুষের সাথে অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়েছে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা। আর ফুটবলের ইতিহাস তো ভূগোলবন্দী না হওয়ার ইতিহাস।


ক্যাটাগরি: সাময়িকী

         

  রেটিং: ৩

এই বিভাগের আরও পোস্ট

নারীর হাত ধরে খাদ্যের বিবর্তন

নারীর হাত ধরে খাদ্যের বিবর্তন

  • জীবনজয়ী ডেস্ক |
  •  ৩০-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

০

ফুল তরু লতা ও আমার জীবন

ফুল তরু লতা ও আমার জীবন

  • খালেদ হাসান শান্ত |
  •  ২৫-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৫

সাবাতিনা, তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও?

সাবাতিনা, তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও?

  • সুমাইয়া রহমান তুলি|
  •  ২১-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৪

বিশ্বের প্রথম নারী সরকারপ্রধানদের পথচলা

বিশ্বের প্রথম নারী সরকারপ্রধানদের পথচলা

  • জীবনজয়ী ডেস্ক|
  •  ১৫-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৫

আমার সেরা তিনটি দিন

আমার সেরা তিনটি দিন

  • ইসমাইল সাব্বির|
  •  ১২-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৫

আমার মেয়েবেলা

আমার মেয়েবেলা

  • মৌমিতা সেন |
  •  ০৯-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

০

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।