কারেন এল. ক্রেমার (Karen L. Kramer) নামে একজ়ন নৃতত্ত্ববিদ তার "হাউ ওম্যান শেপড্ হিউম্যান ইভোলুশন থ্রু ফুড প্রোসেসিং/ How Women Shaped Human Evolution Through Food Processing” শীর্ষক লেখায় মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসের যে পুরুষতান্ত্রিক চরিত্র, তাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। তিনি বলছেন যে শুধু পুরুষই নয়, মানবজাতির বিবর্তনের যে রুপ আমরা আজ দেখি তাতে নারীরও সরব উপস্থিতি রয়েছে। ক্রেমার দাবি করছেন যে, মানুষের খাদ্যাভাস এবং খাবার প্রক্রিয়াকরনের যে বিবর্তন তা মূলত নারীর হাতেই পোষ মেনেছে।
কেমন ছিল সেই বিবর্তন বা পরিবর্তনের ধারা? ক্রেমার এই অংশের নাম দিয়েছেন, 'খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরনের এক সংক্ষিপ্ত ইতিহাস'। আজ জীবনজয়ীর পাঠকদের জন্য সে অংশটুকু থাকলো-
নারীর হাত ধরে খাদ্যের বিবর্তন:
নানান দেশের সমাজ-সংস্কৃতি ভেদে খাদ্যাভ্যাস ভিন্ন ধাচের হলেও, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ একটি সাধারণ বিষয়। কিছু কিছু ফল আর শাক-সবজি ছাড়া, বিশ্বের প্রায় সব ঐতিহ্যবাহী খাবারই কোনো না কোনোভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। আর তা তৈরি হয় ভাঙা, পেষা, থেঁতলানো, খোসা ছাড়ানো, রস বের করা, আগুনে পোড়ানো, ধোঁয়ায় শুকানোর—এক দীর্ঘ যাত্রায়, একটানা প্রস্তুতির মাধ্যমে। যার প্রতিটি ধাপে থাকে নারীর হাতের ছোঁয়া। এছাড়া হাতে খোলা ছাড়ানো, পালক তোলা, আঁশ ছাড়ানো, কাঁটা বা হাড় ছাড়ানো, মাংস কাটা, সেদ্ধ করা, ভাজা বা ভিন্ন ভিন্ন উপায়েও নারীরা খাবার রান্না করে থাকে।
খাদ্য শুধু ক্ষুধা মেটায় না, খাদ্য প্রস্তুত হয় প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য। খাদ্যবস্তু নানান কায়দায় প্রক্রিয়াজাত করার এটাও একটা বড় কারন ছিল। যখন মৌসুম বদলায়, যখন প্রিয় ফল ফুরিয়ে যায়; যখন সংঘাত হয়, যখন জনসংখ্যা বেড়ে ওঠে, যখন খাদ্যের উৎস সীমিত হয়ে পড়ে তখন নারীরা খাবারকে রক্ষা করে মানুষকে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে।
এভাবে নানান অভিনব পন্থায় খাদ্য প্রক্রিয়াজাত করার ফলে আমাদের খাদ্যতালিকা বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় হয়েছে, যা আমাদের বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে সাহায্য করে। গত ৩ মিলিয়ন বছরের বিবর্তনে, খাদ্যকে নানান কায়দায় ভেঙ্গে বা প্রক্রিয়াজাত করে মূল রুপ থেকে পরিবর্তন করে খাওয়ার উপযোগী করা হয়েছে। আর এজন্য যে ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয়েছে, তার পুরোটাই প্রায় হয়েছে নারীর হাত ধরে। তারা শুধু রান্নাই করেন না, তারা গড়ে তুলেছেন খাদ্যতালিকার বৈচিত্র্য, তারা গড়েছেন টিকে থাকার কৌশল।
খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ মানব অভিযোজনের একটি অংশ হিসেবে বহু প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত।
মানুষের খাদ্যতালিকার অনেক খাবারই প্রক্রিয়াজাত না করলে হয় হজম হয় না অথবা বিষাক্ত হয়। যেমন-কাসাভা (যাকে ম্যানিওক বা ইউকাও বলা হয়) এমন এক খাবার যা দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ক্যারিবিয়ান এবং আফ্রিকার একটি প্রধান খাদ্য। এটি কাঁচা অবস্থায় খেলে তাতে সাইনাইডের মত একটি বিষাক্ত উপাদান থাকে। এছাড়াও অন্যান্য সাধারণ শাক-সবজি (বেগুন, আলু), শস্য (কিডনি বিন, ক্যাস্টর, লিমা, কোকো), বাদাম (তিক্ত বাদাম, পাম বাদাম) এবং বীজ-ও (সাইকাস বীজ, চাল) অনেক সময় হয় মারাত্মক বিষাক্ত। কখনোবা হয়ে থাকে অতি তেতো স্বাদের। কিন্তু একবার সেগুলোকে গুঁড়ো করে, ভিজিয়ে নিয়ে পেষা হলে এর থেকে তেঁতো নির্যাস বের হয়ে যায়। এরপর গাঁজানো বা রান্না করা হলে সেগুলো অত্যন্ত সুস্বাদু ও আহারযোগ্য হয়ে ওঠে। কমন কিছু খাদ্যদ্রব্য, যেমন-গম, বার্লি, ওটস এবং ভুট্টাও সাধারণত হজমের পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া খাওয়া হয় না।
খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাবারের আয়ু বাড়ায়। শিকারি, সংগ্রাহক, কৃষিজীবী—সবাই জানত যে, এ খাবার শুধু আজকের জন্য নয়, খাবারকে রাখতে হয় আগামীকালের জন্য। যে দায়িত্ব বর্তেছিল নারীর কাঁধে। একটা সময় থাকে, যখন মাঠে ফসল ফলে না। বাতাসে থাকে না ধানের গন্ধ, মাটির বুক থাকে শূন্য। তখন মানুষ তাকিয়ে থাকত সেই খাবারের দিকে, যা নারীরা আগুনে শুকিয়ে রেখেছে, লবণে মেখে রেখেছে, ধোঁয়ায় ধুয়ে রেখেছে।
যদি মানুষ খাদ্য সংরক্ষণে দক্ষতা অর্জন না করত, তাহলে পৃথিবীর বেশিরভাগ অংশই মানুষের বসবাসের অযোগ্য হত। যারা উচ্চ অক্ষাংশ বা উঁচু পাহাড়ে, উত্তরের হিমে বাস করেন, কিংবা রেফ্রিজারেশনের মতো আশীর্বাদ যাদের আছে, তারা ঠান্ডায় রেখে কিছু সময়ের জন্য খাবার সংরক্ষণ করতে পারে। আর যেখানে সে সুযোগ নেই, সেখানে আগুন, লবণ, আর ধোঁয়াই হয়ে ওঠে রক্ষাকবচ। এভাবে নারীরা খাবারকে রক্ষা করেন ইঁদুরের আর পোকামাকড়ের গ্রাস থেকে। তারা খাবার রাখেন সুরক্ষিত কোণে, ঝুড়ির ভেতরে, মাটির হাঁড়িতে, তাদের হাতে তৈরি পাত্রে। এই সংরক্ষণই যুগে যুগে মানুষকে বসতি গড়তে দিয়েছে বিপরীত জলবায়ুতে, অপ্রস্তুত ঋতুতে, অচেনা ভূখণ্ডে।
খাদ্য নরম করা এবং ভেঙে ফেলার অভ্যাসের এক বিবর্তনীয় ঐতিহ্য মানবদেহে তার ছাপ রেখে গেছে। এই প্রক্রিয়ায় বদলে গেছে আমাদের শরীর। মোটা দাঁতের জায়গায় এসেছে সূক্ষ্ম এনামেলের ছোট ছোট দাত, শক্ত চোয়ালের বদলে এসেছে নরম মুখ। আর যেহেতু আমাদের মাথা চিবানোর জন্য তৈরি একটি শক্ত চোয়ালের সিস্টেমকে কম ব্যবহার করত, তাই মস্তিষ্ক প্রসারিত হওয়ার জন্য জায়গা তৈরি হয়েছিল।
আবার, আংশিকভাবে হজম করা খাদ্য গ্রহণের ফলে একটি বড় এবং ব্যয়বহুল পরিপাকতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তাও কমে যায়, যেটা এখন আমাদের তুলনামূলকভাবে ছোট অন্ত্র দেখে বোঝা যায়। অন্যদিকে আংশিকভাবে হজম করা খাবার খাওয়ার ফলে চিবানোর জন্য যে সময় ব্যয় হত, তাও বেঁচে যায়। শিম্পাঞ্জিরা তাদের দিনের প্রায় অর্ধেক সময় অত্যন্ত আঁশযুক্ত ফল চিবানোর জন্য ব্যয় করে, যা তাদের খাদ্য গ্রহনেরই একটি বড় অংশ। সেখানে বর্তমানে মানুষেরা চিবানোর জন্য অনেক কম সময় ব্যয় করে—দিনের প্রায় ৫ শতাংশ, বা প্রায় ৩৫ মিনিট। শিল্পজাত পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াকৃত এবং অত্যন্ত পরিশোধিত খাবারে আঁশের পরিমাণ কম বা একেবারেই না থাকায় এই সময় আরও নাটকীয়ভাবে কমে যেতে থাকে।
মানুষ তার অস্তিত্বের বেশিরভাগ সময় শিকারি এবং সংগ্রহকারী হিসেবে জীবনযাপন করেছে। বর্তমানে খুব কম সংখ্যক সমাজই খাদ্য সংগ্রহের উপর নির্ভরশীল। তবে এখনো এই বিশেষ অংশের মানুষেরা কীভাবে বিভিন্ন পরিবেশে নিজেদের মানিয়ে নেয় তা অধ্যয়ন করে বিবর্তনীয় নৃতত্ত্ববিদরা বুঝতে পারেন যে আমাদের প্রজাতি কীভাবে এত বিস্তৃত এবং সফল হয়েছে।
ক্রেমার তার গবেষণার কাজে দক্ষিণ আমেরিকার পুমে অঞ্চলে অনেকদিন ধরে থেকেছে। সেখানকার বাসিন্দারা এখনো শিকারের উপর নির্ভরশীল। এখনো সেখানের বিভিন্ন গোত্রের নারীরা প্রতিদিন গড়ে তিন ঘণ্টা ব্যয় করেন খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে।
এখনো বেশিরভাগ সমাজেই নারী ও শিশুরা জল এবং জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে, যা খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য অপরিহার্য। নারীরা পুরুষদের ও নিজেদের কাজে ব্যবহৃত অনেক সরঞ্জাম তৈরি এমনকি মেরামতও করেন। উদাহরণস্বরূপ, পুমের নারীরা প্রতিদিন প্রায় ২ ঘণ্টা তাল গাছের তন্তু ছাড়ানো, ভার বহনের ঝুড়ি এবং বসার জন্য মাদুর বোনা, খোঁড়ার লাঠি ধারালো করা এবং লাউয়ের খোসা থেকে পাত্র তৈরি করার কাজে ব্যয় করেন। কালাহারি মরুভূমির কুং নারীরা প্রতিদিন প্রায় এক ঘণ্টা ব্যয় করেন সরঞ্জাম তৈরি ও মেরামতের জন্য। সবমিলিয়ে সব জায়গাতেই একটি ব্যাপার লক্ষণীয় যে, পুরুষেরা শিকার করলেও সেই শিকারকে খাবারে রূপ দেন নারীরাই।
খাবারকে বাঁচিয়ে রাখা মানে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা। আর এই বাঁচিয়ে রাখার শিল্প—এ এক নীরব, অথচ মহৎ গল্প। এই গল্পের মূল গল্পকার আমাদের নারীরা।