বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটা আমাদের শেষই হয়ে গেল অবশেষে। হল ছেড়ে চলে যাব কয়েক দিন পরে। কয়েক বন্ধু মিলে বাসা নেওয়া হয়েছে একটা। কয়েক দিন ধরে হল থেকে আমার জিনিসপত্র নেওয়ার কাজ করছি একটু একটু করে। চলতি বছরের জুলাই মাস তখন। বৃষ্টি-বাদলা চলছে সমানতালে।
একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাবলাম, যাই, নতুন বাসায় কিছু জিনিস রেখে আসি। এই ভাবনা করে ব্যাগে কিছু এটা-ওটা ভরে নিচে নামলাম। কিন্তু একি অবস্থা! বাইরে যাওয়ার উপায় কিছু নেই। কী ভীষণ বৃষ্টি! আমাদের হলের একতলা প্রায় ডুবে যাওয়ার অবস্থা। কী আর করা! অগত্যা রুমে ফিরে এলাম। এসে দেখি, বিদ্যুৎ উধাও হয়ে গিয়েছে। তার মানে হচ্ছে, ইন্টারনেট নেই। বিরক্তির এক শেষ লাগছিল। বাসা গুছাতে যাব, হলো না। ইন্টারনেটে থাকব, তাও হচ্ছে না!
বাইরে টানা বৃষ্টি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ বৃষ্টি দেখলাম। পরে আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না। নিচে নেমে গিয়ে রুমমেটদের সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজলাম। অনেক দিন পর কোনো চিন্তা ছাড়াই শুধু বৃষ্টি উপভোগ করলাম। ঠিক তখনই আমার এক রুমমেট এসে বলল, "দাঁড়ান আপু, একটা ছবি তুলি।" বৃষ্টিতে ভেজা সেই ছবিগুলো হয়তো এই হলজীবনের শেষ দিকের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি হয়ে থাকবে।
রুমে ফিরে চা বানালাম। একটু পর আরেকজন আবার কফি বানাল। বাইরে ঝুম বৃষ্টি, হাতে গরম কফির মগ, আর রুমমেটরা মিলে গল্প, এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে!
দুপুরে খাওয়ার জন্য ক্যান্টিনে গেলাম। গিয়ে দেখি বিশাল লাইন। সবার একই অবস্থা। কেউ বাইরে যেতে পারেনি, কেউ রান্না করতে পারেনি। অনেকক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে শেষে খাবার পেলাম। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সবার সঙ্গে গল্পও হয়ে গেল।
বিকেলের দিকে আর কোনো উপায় না দেখে আমার এক রুমমেট বৃষ্টির মধ্যেই বের হলো। মোমবাতি, ম্যাচ আর দরকারি কিছু জিনিস কিনে আনতে হবে। ভিজে একদম একাকার হয়ে ফিরল, কিন্তু হাতে সব প্রয়োজনীয় জিনিস ছিল।
সন্ধ্যা নামার পরও বিদ্যুৎ এল না, পুরো হল অন্ধকার। আমাদের হলের সামনেই আজিমপুর কবরস্থান। স্বাভাবিক সময়েও জায়গাটা একটু গম্ভীর লাগে, আর সেদিনের অন্ধকারে তো কথাই নেই। এক ফাঁকে শুরু হয়ে গেল ভূতের গল্প। একজন একটা গল্প বলছে, আরেকজন তার চেয়েও ভয়ংকর একটা গল্প শোনাচ্ছে। বাইরে বৃষ্টির শব্দ, ভেতরে মোমবাতির আলো, পরিবেশটা যেন গল্পগুলোর জন্যই তৈরি হয়েছিল। ভয় পেয়েছি কি না জানি না, তবে গল্প শুনে আর হাসতে হাসতে সময়টা খুব ভালো কেটেছে।
মোবাইল ব্যবহার করার তেমন সুযোগ ছিল না। ইন্টারনেট নেই, চার্জও বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তাই সবাই মিলে শুধু গল্প করেছি, হাসাহাসি করেছি। মনে হচ্ছিল, অনেক দিন পর আমরা সত্যিই একে অপরের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছি।
রাতের দিকে খবর এল, ব্যাকআপ জেনারেটর আনা হয়েছে। প্রায় ১২ ঘণ্টার বেশি সময় পর আবার বিদ্যুৎ ফিরে এল। হলের আলো জ্বলে উঠতেই সবাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সাধারণ একটা জিনিস, বিদ্যুৎ যে এত আনন্দ দিতে পারে, সেটা সেদিন আবার বুঝলাম।
এর কয়েক দিন পর এই হল ছেড়ে চলে আসি। তাই দিনটার কথা হয়তো আরও বেশি করে মনে আছে। সেদিন কোনো পরিকল্পনা ছিল না, কোথাও ঘুরতে যাইনি, তবুও দিনটা অসাধারণ ছিল। একদিকে বৃষ্টি, অন্যদিকে বিদ্যুৎ নেই, ইন্টারনেট নেই, পানি নেই, সব মিলিয়ে অনেক ঝামেলা ছিল। কিন্তু সেই ঝামেলার মাঝেও ছিল গরম চা-কফি, রুমমেটদের সঙ্গে আড্ডা, বৃষ্টিতে ভেজা, ভূতের গল্প আর একসঙ্গে সবকিছু সামলে নেওয়ার আনন্দও ছিল ভরপুর।
হলজীবনের শেষ দিনগুলোর সুন্দর স্মৃতিগুলোর তালিকা করলে, এই বৃষ্টির দিনটা নিঃসন্দেহে অনেক ওপরে থাকবে।