বিশ্ববিদ্যালয় জীবন নানান গল্প আর ঘটনার সমারোহ। সেখানে শুধু ক্লাস, পরীক্ষা আর সিজিপিএর হিসাব-নিকাশ থাকে না। কিছু গোধূলী বিকেল থাকে, কিছু ঠিক-যেন-চিরচেনা পথ থাকে, কিছু মানুষ থাকে, কিছু ঘটনা থাকে, যা সময়ের কাঁটা ঘুরে যত দূরেই যাক না কেন, স্মৃতির অ্যালবামে সব সময় জ্বলজ্বল করতে থাকে। ছাত্রজীবনের তেমনই এক মজার স্মৃতি আজও মনে পড়লে নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে।
বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থীদের কথা জানি না। তবে কলা, মানবিক, সামাজিক বিজ্ঞান কিংবা ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ছাত্রজীবনের কোনো না কোনো বিকেল নিশ্চয়ই কেটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কুয়েত মৈত্রী হল ও শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের সামনে। নিউমার্কেট পেরিয়ে যে পথটি সেখানে গিয়ে মিশেছে, সেটি ছিল আমাদের কাছে শুধু একটি রাস্তা নয়, ছিল আড্ডার রাজ্য, বন্ধুত্বের ঠিকানা আর তরুণ বয়সের অফুরন্ত গল্পের মঞ্চ।
প্রথম দিকে জায়গাটা ঠিকমতো চিনতাম না। তাই বান্ধবীরা বলত, ‘বিডিআর তিন নম্বর গেটের সামনে চলে এসো।’ সেই নির্দেশনা অনুসরণ করেই প্রথম যাতায়াত শুরু। বিকেল হলে কখনো একা, কখনো বন্ধুদের নিয়ে হাজির হয়ে যেতাম। আমাদের আড্ডার কোনো নির্দিষ্ট সিলেবাস ছিল না। এক মুহূর্তে আলোচনা চলছে দেশের রাজনীতি নিয়ে, পরের মুহূর্তে অর্থনীতি, তারপর ধর্ম, সাহিত্য, ক্রিকেট, সিনেমা কিংবা নাটক নিয়ে বিশ্লেষণ। এমন কোনো বিষয় ছিল না, যা আমাদের আড্ডার আদালতে বিচার পায়নি। পৃথিবীর যত জটিল সমস্যার সমাধান, যেন আমরা প্রতিদিনই দিয়ে ফেলতাম। তফাত শুধু এই যে কেউ সেটা বাস্তবায়ন করতে আসত না।
বেশ কয়েক বছর আগের কথা। তখন আমি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। বেশ হালকা-পাতলা স্বাস্থ্য। বিকেলের আড্ডায় আমার নিয়মিত পোশাক ছিল একটি সাধারণ গোল গলার টি-শার্ট। বন্ধুদের সার্কেলে সাজগোজ করে যাওয়ার মতো চিন্তা মাথায় আসত না।
এখানে পড়ুন: ফিরে দেখা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
আমাদের বান্ধবীদের একটা সুন্দর অভ্যাস ছিল। আমরা গেলেই তারা ছোটখাটো আপ্যায়নের ব্যবস্থা করত। কখনো হল থেকে রান্না করে আনত চিকেন খিচুড়ি, কখনো পোলাও, কখনো নুডলস। আবার কখনো সেমাই। আয়োজন ছোট হোক বা বড়, আন্তরিকতার ঘাটতি কখনো ছিল না। বেশির ভাগ সময় হলের সামনে একটু উঁচু ফুটপাতটা হয়ে উঠত আমাদের অস্থায়ী ডাইনিং টেবিল।
একদিন সন্ধ্যায় বাইরে না বসে আমরা সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের ক্যানটিনে ঢুকে পড়লাম। ছোট্ট ক্যানটিন। সেখানে নুডলস, সিঙ্গারা, চা আর সন্ধ্যার হালকা নাশতার পাশাপাশি সীমিত পরিসরে রাতের খাবারও মিলত। আমি কয়েকজন বান্ধবীর সঙ্গে একটি টেবিল দখল করে বসেছি। অল্পক্ষণ পর ধোঁয়া ওঠা নাশতা এসে গেল। কিন্তু বিপত্তি একটাই, টেবিলে সস নেই!
আমি তাই অত্যন্ত দায়িত্বশীল নাগরিকের মতো পাশের একটি টেবিল থেকে একটি সসের বোতল নিয়ে এসে আমাদের টেবিলে রাখলাম।
ব্যস, ঠিক তখনই ঘটল ইতিহাস। পাশের টেবিলে বসা চশমা পরা, হালকা-পাতলা এক মেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে উঠল, ‘মামা, সস দেন!’
এখানে পড়ুন: স্কুলদিনের রঙিন স্মৃতি
এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, পুরো ক্যানটিনটা থেমে গেছে। আমার হাতে সসের বোতল, মুখে নির্বাক বিস্ময়। আমাদের টেবিলে বসা বান্ধবীরা আর নিজেদের সামলাতে পারল না। এমন হাসি শুরু হলো যে মনে হচ্ছিল, ক্যানটিনের ছাদও কেঁপে উঠবে।
আমি নিজের দিকে তাকালাম।
তারপর মেয়েটার দিকে তাকালাম।
আবার নিজের টি-শার্টের দিকে তাকালাম। মনে মনে ভাবলাম সে সাজগোজ করে আছি তাতে নতুন যে কেউ প্রথম দেখায় আমাকে প্লেটে সস ঢালার জন্যই ডাকবে।
আমার বন্ধু-বান্ধবীদের অট্টহাসির চোটে বেচারি মেয়েটি ব্যাপারটা বুঝতে পারল।
কিছুক্ষণ ইতস্তত করে লাজুক গলায় বলল, ‘সরি...’
আমি হেসে বললাম, ‘ঠিক আছে। সস তো মানুষেরই কাজে লাগে!
এখানে পড়ুন: আমাদের নন-স্টপ আড্ডার বিশ্ববিদ্যালয়