ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল লাইব্রেরি আমার জীবনে এক বিশেষ স্থান ছিল। লাইব্রেরির প্রতিটি দিন ছিল একটি নতুন অভিজ্ঞতা ও একটি নতুন গল্প। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই লাইব্রেরি ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। প্রতিদিনের ক্লাস শেষে আমি লাইব্রেরি যেতাম। মনে হতো যেন এই জায়গাটি আমার জন্য একান্ত নিরিবিলি একটি আশ্রয় ছিল।
লাইব্রেরিতে প্রবেশ করলেই যে জিনিসটি আমার প্রথমে চোখে পড়ত, তা ছিল এর শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিবেশ। নীরবতাকে যেন সব শিক্ষার্থী একসঙ্গে মেনে নিয়েছিল। লাইব্রেরি জুড়ে ছিল সারি সারি কাঠের টেবিল-চেয়ার এবং বিশাল বিশাল আলমারিতে সাজানো বই। পড়ার জন্য এটি ছিল এক সুন্দর পরিবেশ। জানালার পাশের একটি টেবিল ছিল আমার পছন্দের জায়গা। বাইরে সবুজ গাছপালা আর পাখির কিচিরমিচির শুনতে শুনতে বইয়ের মধ্যে কখন যে ডুবে যেতাম, টেরই পেতাম না।
বৃষ্টির দিনে লাইব্রেরির পরিবেশ হয়ে উঠত আরও মনোমুগ্ধকর। জানালার কাঁচে টুপটাপ বৃষ্টির ফোঁটা আর তার সঙ্গে বইয়ের পাতা উল্টানোর শব্দ আমাকে এক অন্য জগতে নিয়ে যেত। মনে হতো, এই নীরবতার মাঝেই লুকিয়ে ছিল অসংখ্য স্বপ্ন।
লাইব্রেরি কেবল পড়াশোনার জায়গা ছিল না, এটি ছিল আমাদের বন্ধুত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় করার স্থান। আমাদের একটি ছোট দল ছিল। সবাই মিলে লাইব্রেরিতে খুব সকালে যেতাম। তারপর লাইন ধরে লাইব্রেরিতে প্রবেশ করতাম নিজেদের পছন্দের জায়গায় বসার জন্য। আমরা একই সঙ্গে বসার চেষ্টা করতাম। এতে পড়ায় মনোযোগ ভালো ধরে রাখা সম্ভব হতো। আমাদের মধ্যে কেউ সিরিয়াসলি পড়াশোনা করত, আবার কেউবা সাময়িক বিরতিতে চুপচাপ বসে বইয়ের মাঝে হারিয়ে যেত।
এখানে পড়ুন: ফিরে দেখা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
অনেকক্ষণ পড়ার পর যখন আর পড়তে ইচ্ছা করত না, তখন আমরা লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে কোথাও ফাঁকা জায়গায় গিয়ে বসতাম। সবাই নানা বিষয়ে আলোচনা করত। কারও রাজনীতি নিয়ে তর্ক, কারও সাহিত্য নিয়ে ভাবনা, আবার কেউ মজার গল্প করত। এই আড্ডাগুলোই ছিল আমাদের জীবনের ছোট্ট আনন্দ।
লাইব্রেরি থেকে দুপুরে বেরিয়ে আমরা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় খেতে যেতাম। পরমাণু ইনস্টিটিউট, চারুকলা, সূর্যসেন ক্যাফেটেরিয়া ও আইইআর-এর ক্যান্টিন এর মধ্যে অন্যতম ছিল। খুব সাধারণ খাবার হলেও, বন্ধুরা একসঙ্গে থাকলে সবকিছুই বিশেষ হয়ে উঠত। মাঝে মাঝে আমাদের কারও টাকা কম থাকলে, তখন সবাই মিলেমিশে খরচ সামলে নিতাম। এক প্লেট খাবার ভাগ করে খাওয়ার মুহূর্তগুলো আমাকে আনন্দিত করত। বিশেষত, পরীক্ষার আগে দল বেঁধে লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করার পর সবাই মিলে রাতের দিকে ক্যান্টিনে গিয়ে খাবার খাওয়ার সময়টা বেশি আনন্দের ছিল। পড়ার চাপের মধ্যেও এই ছোট্ট সময়গুলো আমাদের ক্লান্তি দূর করে দিত।
পরীক্ষার আগে লাইব্রেরির পরিবেশ হয়ে উঠত সম্পূর্ণ আলাদা। প্রতিটি টেবিল পূর্ণ থাকত শিক্ষার্থীদের ভিড়ে। আমরা সবাই নিজেদের সেরা প্রস্তুতি নেওয়ার চেষ্টা করতাম। দলবেঁধে পড়ার মধ্যে একটি আলাদা উত্তেজনা কাজ করত। কেউ কোনো বিষয় বুঝতে না পারলে সেটি অন্য কেউ বুঝিয়ে দিত।
পরীক্ষার দিনগুলোতে একসঙ্গে বসে চা-কফি খাওয়ার আনন্দ ছিল অন্যরকম। কখনো কখনো একধরনের চাপ এসে ভর করত পরীক্ষার আগে, কিন্তু বন্ধুরা পাশে থাকলে সবকিছু সহজ হয়ে যেত।
রেজাল্টের দিনগুলো সবচেয়ে বেশি আবেগপূর্ণ ছিল। লাইব্রেরিতে বসেই আমরা অনেক সময় রেজাল্টের জন্য অপেক্ষা করতাম। কেউ কেউ খুব নার্ভাস হয়ে পড়ত, কেউবা মজা করে অন্যদের উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা করত। যখন রেজাল্ট প্রকাশ হতো, আমরা একে একে ফোন থেকে রেজাল্ট দেখতাম। যার ভালো রেজাল্ট হতো, সে সবার মাঝে আনন্দ ভাগ করে নিত। আবার কেউ যদি হতাশ হয়ে পড়ত, তখন বাকিরা তাকে সান্ত্বনা দিত।
একবার, আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু তার কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় খুব মন খারাপ করেছিল। আমরা সবাই মিলে তাকে নিয়ে চায়ের দোকানে গিয়েছিলাম। মজার গল্প আর আড্ডা দিয়ে তার মন ভালো করার চেষ্টা করেছিলাম। সেই মুহূর্তে বুঝেছিলাম, বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ আর দুঃখ ভাগ করাই জীবনের বড় এক সম্পদ।
লাইব্রেরির বাইরে বিকেলের চায়ের আড্ডা ছিল প্রতিদিনের রুটিন। ক্লাস আর পড়াশোনার চাপ ভুলে আমরা সেখানে বসে থাকতাম। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ক্যাম্পাসের সবুজ মাঠ আর পুরোনো ভবনগুলোর দিকে তাকিয়ে ভবিষ্যৎ স্বপ্ন নিয়ে কথা বলতাম।
বিকেলের আলো যখন গাছের পাতা দিয়ে ছায়া তৈরি করত, তখন মনে হতো সময় যেন থমকে গেছে। সেই মুহূর্তগুলো আমাদের জীবনের ছোটখাটো আনন্দগুলোকে আরও সুন্দর করে তুলত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি কেবল একটি জায়গা ছিল না, এটি ছিল আমাদের জীবনের একটি অধ্যায়। এখানে কাটানো প্রতিটি দিন আমাকে নতুন কিছু শেখাত। এটি কেবল বই পড়ার জায়গা ছিল না, এটি ছিল আমাদের স্বপ্ন বুননের স্থান।
তখনও লাইব্রেরির সামনে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা চলত। একসঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো আমাদের হৃদয়কে আনন্দে ভরিয়ে দিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি আমার জীবনের একটি অমূল্য অংশ ছিল, যা আমাকে শিখিয়েছিল কীভাবে জীবনকে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে স্বপ্ন দেখতে হয় এবং কীভাবে সেই স্বপ্নের পথে এগিয়ে যেতে হয়।
এই স্মৃতিগুলো চিরকাল আমার মনে থাকবে, যেমনটি থাকবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি, তার প্রতিটি করিডোর, প্রতিটি বই আর প্রতিটি মুহূর্ত।
এখানে পড়ুন: ক্যাম্পাসের গান