সময়টা ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাস। শরতের এক কোমল বিকেল। সূর্য তখন ক্লান্ত অথচ স্নিগ্ধ। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে শুকনো পাতার মৃদু দোলা। সেই বিকেলে আমি প্রথমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট পেরোলাম—যেখানে শুরু হলো আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম অধ্যায়। শহরের ব্যস্ততা, অপরিচিত অজস্র মুখ, আর ইট-পাথরের কোলাহলে দাঁড়িয়ে একটা অনিশ্চয়তা যেন ঘিরে ধরেছিল আমাকে। সবমিলিয়ে ভাবছিলাম—কেমন হবে এই ক্যাম্পাস? ছবির মতো পরিপাটি? নাকি বাস্তবতার মতো শুধুই জটিল? মন তখন দ্বিধাগ্রস্ত, অজানা আশঙ্কায় ভরা।
ক্লাস শুরু হলো, হলে উঠলাম। নতুন পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়াতে শুরুর দিকে খানিক মানসিক টানাপোড়েন তো ছিলই। প্রতিদিন যেন এক নতুন পরীক্ষা—নিজেকে খাপ খাওয়ানোর। কখনও একা লাগতো, আবার কখনও মনে হতো আমি ধীরে ধীরে এই জায়গার অংশ হয়ে যাচ্ছি।
অবাক কান্ড হলো দিনশেষে হিসাব মিলিয়ে দেখলাম ডিপার্টমেন্টের করিডর, হলের সিঁড়ি, ক্যান্টিনের উষ্ণ চা—সব জায়গাতেই আমার আবেগ জমছে। এরই মধ্যে ডিপার্টমেন্ট আর হলে অল্প সময়েই কিছু বন্ধু পেয়ে গেলাম। আমার স্কুল-কলেজ জীবন কেটেছে বয়েজে। তাই সহপাঠী মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে একটা অদৃশ্য সংকোচ ছিল। ধীরে ধীরে সেই সংকোচ অতিক্রম হলো। ওদের অনেকের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। ছেলে-মেয়ে মিলে গড়ে উঠলো এক প্রাণবন্ত বন্ধুত্বের সম্পর্ক।
আমার বন্ধুত্বের বলয়টা ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো। সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকলো আনন্দের ছায়াপথ। প্রথম কয়েকদিন ক্লাস শেষে একসাথে বেরিয়ে পড়তাম সবাই মিলে—কখনো টিএসসি, কখনো রমনা পার্ক, চারুকলা বা কার্জন হলের ঘাসে। যেন প্রতিদিন ক্যাম্পাসকে নতুন চোখে দেখা। শুধু দেখাই নয়, যেন ক্যাম্পাস হয়ে উঠেছে আমাদের গল্পের মঞ্চ আর এই মঞ্চের গলি ধরে আমাদোর হারিয়ে যেতে চাওয়া।
এরপর আমাদের পদচারণা ছড়িয়েছিল আরও দূর—লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, পানাম নগর। এক বিকেলে চলে যাই জাহাঙ্গীরনগরের প্রকৃতির মাঝে। গল্প-গান, হাসি, আড্ডা—সব মিলিয়ে দিনগুলো হয়ে উঠছিল অপূর্ব।
এভাবেই কখন যেন তৃতীয় বর্ষে পৌঁছে গেছি! কবে যে এতোটা সময় পেরিয়ে গেছে, তা বুঝতে পারিনি। পড়াশোনার ব্যস্ততা বেড়েছে—ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষা—সবই এসেছে রুটিনের ঘূর্ণিতে। তবে আমাদের আড্ডা কিন্তু থেমে থাকছেনা। বিকেলের দিকে টিএসসিতে বসে এখনো চলছে আমাদের প্রাণখোলা আলোচনা—রাজনীতি থেকে অর্থনীতি, জীবন থেকে জীবনদর্শন।
আমার কাছে বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনের একটা বিশেষ অনুভব ছিল—রাতের ক্যাম্পাস। ফ্লাডলাইটের মতো বাতিতে আলোকিত ক্যাম্পাস, হালকা ব্যাকগ্রাউন্ডে গিটারের টুংটাং- এর তালে তালে এখনো আমরা হেঁটে চলেছি। আবার কখনোবা মিনি পিকআপ ভাড়া করে মাওয়া—ইলিশ, গান, গল্প।
যদিও যত সময় গড়িয়েছে, আমার দূরবর্তী ঘোরাঘুরি কমেছে। তবু গান, গল্প, আড্ডার অভাব হয়নি। কখনো কখনো রাতভর ক্যাম্পাসের ঘাসে বসে গেয়ে উঠছি গান, অনুভব করছি এক নিঃশব্দ উল্লাস।
এই ক্যাম্পাস এখন আর শুধু আমার ঠিকানা নয়, আমার আত্মপরিচয়ের জায়গা হয়ে গিয়েছে। এখানে আমি শুধু একজন শিক্ষার্থী নই; আমি এক সময়ের অংশ, এক যাপনকালের গল্প। প্রতিটি দিন একটা অধ্যায়, প্রতিটি মুহূর্ত একটা কবিতা।