জীবনজয়ীর এক সদস্য ফেলে আসা ক্যাম্পাসজীবন সম্পর্কে জানতে চাইলেন। কেমন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের জীবন? কীভাবে কেটেছে? কাদের সঙ্গে কেটেছে? এখনকার ক্যাম্পাসজীবনের সঙ্গে তিন দশক আগের ক্যাম্পাসজীবনের কি কোনো পার্থক্য ছিল? এই প্রশ্নগুলো যেন এক দমকা হাওয়ার মতো আমাকে ত্রিশ বছর আগের ফেলে আসা সেই দিনগুলোতে নিয়ে গেল! মনে পড়ে গেল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘হঠাৎ দেখা’ কবিতার সেই লাইনটি, ‘আমাদের গেছে যে দিন একেবারেই কি গেছে, কিছুই কি নেই বাকি।’
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্মৃতি মানুষের জীবনের অন্যতম সুন্দর অধ্যায়। অনেকের জীবনের সুন্দরতম অধ্যায়ও বটে। আমার জীবনের সোনালি দিনগুলোও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণেই কেটেছে। মনে পড়ে সেই ১৯৯৪ সালের কথা। মফস্বল শহর থেকে রাজধানীতে পা রাখা সদ্য তরুণ আমি। বড় ভাইদের সহযোগিতা আর নতুন নতুন বন্ধু তৈরির মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল আমার ক্যাম্পাসজীবন।
এরপর দিন কাটতে লাগল নানা নতুনত্ব আর নতুন নতুন ধারণা নিয়ে। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, সকালে মধুর ক্যান্টিনে চেয়ার দখল করে নাশতা করা, বিকেলে টিএসসিতে যাওয়া। পড়ন্ত বিকেলে হাকিম চত্বরে আড্ডা। এভাবেই চলত আমাদের জীবন।
এখানে পড়ুন: ফিরে দেখা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
প্রথম বর্ষেই যুক্ত হয়েছিলাম ছাত্ররাজনীতিতে। নিয়মিত অংশ নিতাম মিছিল, অপরাজেয় বাংলায় সভা-সমাবেশে। কখনো কখনো যাওয়া হতো নেতৃবৃন্দের বাসায়।
আমাদের সময়ে হলে-হলে সংগীত সন্ধ্যা হতো। বন্ধুরা দল বেঁধে যোগ দিতাম সেসব অনুষ্ঠানে।
দেখতে দেখতে কখন যে প্রথম বছরটা কেটে গিয়েছিল, বুঝতেই পারিনি। আমি ছিলাম খানিকটা পাখির মতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলেও ক্যাম্পাসজীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও বুয়েটের হোস্টেলে।
তবে এটাও ঠিক যে, এত কিছুর মধ্যেও আমার পড়াশোনা বাদ যায়নি একটুও। পড়ালেখার ক্ষেত্রে আমাদের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের স্যার-ম্যাডামদের সহযোগিতা ভুলবার মতো নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি মানেই ছিল বিশাল এক অভিজ্ঞতা। সেখানে ক্যাটালগ ব্যবহার, রেফারেন্স শাখা, জেরক্স শাখা, কত রকমের অভিজ্ঞতা!
এখানে পড়ুন: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়: অনেক শিখিয়েছে অনেক দিয়েছে
ক্যাম্পাসে বছর যেতে না যেতেই অনেকের মতো আমার মনেও বিসিএস ক্যাডার হওয়ার ইচ্ছা দেখা দিল। তখন কোটা পদ্ধতি ছিল না। মেধাবীদের বড় একটি আশ্রয়স্থল ছিল বিসিএস। পরে কোটা পদ্ধতি চালু হলে মেধাবীরা এর কারণে বঞ্চিত হতে লাগলেন। অনেকেই এমন পরিস্থিতিতে বিদেশে পাড়ি দিলেন। দেশপ্রেম আর দেশের উন্নয়নে অবদান রাখার ইচ্ছা থেকে অনেকেই তখন যেকোনো পরিস্থিতিতে দেশে থাকার কথা ভাবতেন। নিজের দেশকে প্রাধান্য দিতেন। আমিও এই দলেই যোগ দিলাম। কতটুকু পেরেছি, কতটুকু পারিনি, জানি না।
এখন মাঝেমধ্যে নিজের মনেই প্রশ্ন জাগে, জীবনে কতটুকু সফল হলাম, কিংবা কতটুকুই বা ব্যর্থ হলাম? কিন্তু ক্যাম্পাসজীবন আমাকে মনে করিয়ে দেয়, জীবনটাকে অতিবাহিত করাই প্রধান। সামনে যে সমস্যাই আসুক না কেন, তাকে যথাসাধ্য জয় করে এগিয়ে যাওয়াই জীবনের বাস্তবতা।
এখানে পড়ুন: আমাদের নন-স্টপ আড্ডার বিশ্ববিদ্যালয়