আমি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক। যাদবপুর আমার প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয়। প্রাণপ্রিয় হয়ে ওঠার পিছনে রয়েছে এখানকার বৈচিত্র্য, সাংস্কৃতিক পরিবেশ, একাডেমিক সুযোগ এবং সহপাঠী, সিনিয়র-জুনিয়র, প্রফেসরদের বন্ধু সুলভ আচরণ ও ভালোবাসা।
মুর্শিদাবাদ জেলার একটি গ্রামের কৃষক পরিবার থেকে অনেক স্বপ্ন নিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পণ করি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয় নিয়ে এমএ পড়তে। কত আবেগ নিয়ে এসেছিলাম। এসে দেখি বড় বিপদ! যে ইংরেজি বিষয়টাকে দীর্ঘদিন ভয় পেয়েছি এড়িয়ে এসেছি সেই ভাষাতেই পড়াশোনা করতে হবে! তবে বাংলা মাধ্যমে একেবারেই যে লেখাপড়া করা যাবে না এমনটা নয়। ৯০ শতাংশের ওপর ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়া করে ইংরেজি মাধ্যমে। যাই হোক, শুরুর দিকে ক্লাসে প্রফেসররা যেভাবে পড়াতেন সবই মাথার ওপর দিয়ে যেত, কারণ ভাষাটা ইংরেজি। এমনও হয়েছে এক ঘণ্টা ক্লাস শেষে টপিকের নামটা বুঝেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে, টপিকের গভীরে যেতেই পারিনি। কিন্তু, আমাকে তো পারতেই হবে। ভালো নম্বর পেতেই হবে। আর তাই ইংরেজি ভাষাকে শিখতে হবে, বুঝে গিয়েছিলাম। এত তাড়াতাড়ি তো সম্ভব নয় এটাও বুঝলাম। কাজেই প্রফেসরের নিকট সমস্যার কথা জানালে উনারা আমিসহ বেশ কয়েক জনকে আলাদা করে বাড়তি ক্লাস নিয়ে টপিক বোঝাতেন।
ভাষাগত সমস্যা এখন পিএইচডি পর্যায়ে অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। এর পিছনে রয়েছে প্রফেসরদের ‘ইংরেজি শেখো, ইংরেজি শেখো’ বার্তা।
তবে পিএইচডিতে এসে ইংরেজি ভাষাগত সমস্যা না থাকলেও রয়েছে মানসিক চাপ। কীভাবে গবেষণাকে গুণগতভাবে উন্নত করা যায় তার তাড়না, যা রীতিমতো কোনো কোনো রাতকে নিদ্রাহীন করে তোলে। আবার আধুনিক উন্নত মানের গবেষণার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত তহবিলের। কিন্তু সরকার কর্তৃক সীমিত পরিমাণ আর্থিক সহযোগিতা আমার জন্য গুণগতমান বজায় রেখে গবেষণা চালিয়ে যাওয়া সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনে পড়ে গেল সেই প্রথম দিকের আর্থিক চাপের কথা, যখন যাদবপুরে প্রথম এসেছিলাম। হোস্টেলের মাসিক বিল পরিশোধ করতে বাবাকে কত কিছুই না করতে হয়েছে তা আর নাইবা লিখি। একাধিক ছোট ছোট সমস্যার সম্মুখীন এখনো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে হতে হয় যেগুলোর সমাধান কোনো না কোনোভাবে হয়ে যায়।
যাদবপুর আমায় অনেক কিছু শিখিয়েছে ও অনেক কিছু দিয়েছে। এমএ ক্লাসের পাঠ্যক্রম ও গবেষণা প্রকল্প আমাকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি এবং বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর কার্যকলাপ সম্পর্কে একটি গভীর বোঝাপড়া দিয়েছে। প্রতিনিয়ত হতে থাকা বিভাগের সেমিনার এবং ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ আমাকে একাডেমিক পরিবেশে যুক্ত থাকতে সাহায্য করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং গ্রন্থাগারের ব্যবহার আমাকে আমার পাঠ্যক্রমের বাইরেও অনেক কিছু শিখিয়েছে। আমি বিতর্ক এবং মডেল ইউনাইটেড নেশনস (এমইউএন)-এ অংশগ্রহণ শুরু করি, যা আমার কূটনীতিবিষয়ক চিন্তাভাবনা এবং আত্মপ্রকাশের দক্ষতাকে আরও উন্নত করে। এই সময়েই আমি গবেষণার প্রতি গভীর আগ্রহ অনুভব করি এবং পিএইচডি করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করি।
প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন ছাত্র হিসেবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে যে একাডেমিক এবং ব্যক্তিগত উন্নয়নের সুযোগ দিয়েছে, তা অসাধারণ। সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জের মিশ্রণে আমি আমার জীবনকে সমৃদ্ধ করতে পেরেছি। এখানকার প্রতিটি মুহূর্ত আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে উচ্চতায় পৌঁছানো যায়।