বাস্তব কাহিনি “সাবাতিনার কী হয়েছিল?” অবলম্বনে লিখিত গল্প।
রাত বাজে ৩টা। ডিসেম্বরের শীতের মধ্যরাত। বাইরে কনকনে ঠান্ডা। একটু তন্দ্রায় চলে গিয়েছিলাম। স্টেশনে মানুষের চেঁচামেচির শব্দে তন্দ্রাভাবটা কাটতেই বুকটা ধক করে উঠল। আজ কি ট্রেন নির্ধারিত সময়ের আগেই পৌঁছে গেল?
চারদিক কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে বুঝলাম, গন্তব্যে পৌঁছাতে ট্রেনের দেরিই হবে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। মনে পড়ে গেল, গত বছর ঠিক এমনই এক শীতের নির্জন রাতের কথা! শেষ রাতে ফাঁকা পার্বতীপুর স্টেশনে ট্রেন পৌঁছে গিয়েছিল। একা আমি তখন কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না! নানান শঙ্কা আর অনিশ্চয়তায় মোড়ানো সেই ভোররাতে আমাকে সাহায্য করেছিল অপরিচিত এক যুবক। সারা রাত পাশাপাশি সিটে বসে এসেছি। সেভাবে কোনো আলাপ হয়নি। শেষের দিকে আমি পার্বতীপুর স্টেশন সম্পর্কে জানার জন্য নিজে থেকেই কথা বলি। পরের অংশটুকু তো পুরোটাই মন ভালো করে দেওয়ার। আমাকে নিরাপদে আরেকটি ট্রেনে উঠিয়ে দেওয়া পর্যন্ত সে আমার পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে ছিল স্টেশনে। এই পুরো সময়ে আমি তার কাছ থেকে কোনো অসঙ্গতিপূর্ণ কথা বা আচরণ পাইনি। তার সঙ্গে চায়ের স্টলে বসে কথা বলতে বলতে নির্জন স্টেশনে একা থাকার ভয় কেটে গিয়েছিল আমার।
(এখানে পড়ুন: আমি সাবাতিনা: অতঃপর আমাদের কাহিনি চলতে থাকলো)
সেদিন আমরা মোবাইল নম্বর বা ফেসবুকের ঠিকানা, কোনো কিছুই বিনিময় করিনি। সেও চায়নি। আমিও না। হলে কী হবে, আমার মনে ছেলেটি স্থায়ী একটা চিহ্ন রেখে গিয়েছে। আমার খালি মনে হয়, তার সঙ্গে আবার দেখা হলে আমার খুব ভালো লাগবে। নিজের অজান্তেই আমি তাকে এদিক-ওদিক খুঁজি ঢাকার রাস্তায়। সেদিনের পর পার্বতীপুর পার হয়েছি কয়েকবার। প্রত্যেকবার ট্রেনের জানালায় মাথা বের করে খুঁজেছি। এর কোনো মানে নেই, তবু। আমি শুধু জানি যে তার বাড়ি পার্বতীপুর। তাই বলে কি সে আমার অপেক্ষায় স্টেশনে এসে দাঁড়িয়ে থাকবে প্রতিদিন! তবু আমি তাকে খুঁজি মনে মনে। একদিন দেখা হয়ে যাবে, এই বিশ্বাসটা থেকেই আমি ছেলেটিকে খুঁজি।
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিধাতা মনে হয় আমার আকুতিকে একেবারে ফেলে দিতে পারেননি। এক পড়ন্ত বিকেলে আমি পেয়ে গেলাম তাকে।
পরীক্ষা আর পড়াশোনার ব্যস্ততায় কিছু দিন ঘাড় ফেরাতে পারিনি। তবে হৃদয়ের কোনো এক গহীনে সে যে চুপ মেরে বসে ছিল, তা কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই আমার।
সেদিন সারাদিন কোনো কাজ ছিল না। ভাবছিলাম কী করা যায়। হঠাৎ মনে পড়ল ক্যাম্পাসের পাশের বইয়ের স্টলটার কথা। ওখানে বইয়ের সঙ্গে চা-কফিও পাওয়া যায়। এক কাপ চা নিয়ে জমিয়ে একটা বই পড়া যাবে। এই ভেবে চলে গেলাম সেখানে। খুঁজে বের করলাম হুমায়ূন আহমেদের 'অপেক্ষা'। বইটা আমি আগেও পড়েছি। তবু আজ কেন যেন আবার পড়তে ইচ্ছে হলো।
অপেক্ষা বড় পীড়াদায়ক, তবু আমরা কখনো-কখনো অপেক্ষা করি, অনিশ্চিতের জন্য। মানবজীবনে অনিশ্চয়তাকে উপলক্ষ্য করে অপেক্ষার শেষ নেই। বই পড়তে পড়তে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। সেদিনের মতো বইখানা রেখে বেরিয়ে এলাম।
শাহবাগে জাদুঘরের সামনে রাস্তা ধরে হাঁটছি। হঠাৎ দেখি একটু দূরে একটা মানুষ। হেঁটে আমার দিকেই আসছে। আমার মন ও মাথা একসঙ্গে বার্তা দিল, এই তো সে! একেই তো আমি খুঁজছি আজ কত দিন হয়! বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠল। অপরিচিত! হ্যাঁ, সেই অপরিচিতই তো! মুখে তার আজও সেই ম্লান হাসি, চোখে সেই সরলতা। আমি সোজা এগিয়ে গেলাম।
“আপনি এখানে? চিনতে পারছেন আমাকে? পার্বতীপুর রেলস্টেশন?” এক নিঃশ্বাসে বলে ফেললাম!
থমকে দাঁড়াল সে। খানিক অপ্রস্তুত যেন। হয়তো কিছু একটা ভাবতে ভাবতে পথ চলছিল। তবে আমাকে চিনে নিতে অসুবিধা হলো না তার।
“আরে! আপনি! কেমন আছেন?”
“সেদিন তো আমার নাম বলা হয়নি আপনাকে। আমি সাবাতিনা। পার্বতীপুরের কথা মনে আছে আপনার? সেদিনের পর আর দেখা হয়নি!” অনর্গল এতগুলো কথা বলে ফেলায় নিজেই যেন লজ্জা পেলাম একটু।
সে হেসে বলল, “হ্যাঁ, সে কথা ভোলা যায়? কী ভয়টাই না পেয়েছিলেন আপনি! তবে আজ আপনাকে দেখে সাহসী মনে হচ্ছে।”
“কী যে বলেন! সেদিন আপনি না থাকলে কী যে হতো! আপনাকে ধন্যবাদ জানালেও কম হবে।”
“অনেক জানিয়েছেন, এবার থাক। অত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে না। তা, কোথায় যাচ্ছেন?”
“এই তো, পাঠক সমাবেশে বই পড়লাম কিছুক্ষণ। এখন হলে ফিরছি। আর আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।”
“ভাগ্য ভালো, আমি এই দিকে এসেছিলাম।”
“এদিকে কোনো কাজে এসেছেন? নাকি এদিকেই থাকেন?” আজ আমি সব কথা শুনব তার থেকে।
“ছোট একটা প্রাইভেট জব করি, বলেছিলাম বোধহয় আপনাকে। অফিসের কাজেই শাহবাগে এসেছিলাম।”
“বাহ! আপনার নামটা বলবেন না আজও?”
“কী যে বলেন! আমার নাম অর্ণব। অর্ণব চৌধুরী। চলুন, আপনাকে হল পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি। আমার এখন কোনো ব্যস্ততা নেই।”
আমার মন খুশিতে ভরে উঠল। উনি হল পর্যন্ত এলেন। তাড়া করে হাঁটিনি, তবু কত দ্রুত শেষ হয়ে গেল রাস্তা। এই পথ কেন যে শেষ হলো! সময়ের আর দোষ কী! অতটুকুন মাত্র দূরত্ব!
সেদিনের মতো বিদায় নিলাম আমরা। তবে এবার অর্ণব চৌধুরীর ফোন নম্বর নিয়েছি। আমার নম্বর গেছে তার মোবাইলে।
হলে ঢুকে আমার মন উতলা হলো। সময় যত বাড়ছে, মনের উসখুস বাড়ছে। দেখতে দেখতে রাত ১০টা। একবার তাহলে ফোন দিই! কিন্তু সে যদি কিছু মনে করে? ভালোভাবে যদি না নেয়, তাহলে? আগ্রহ যদি না দেখায়?
ধুর! এত আর ভাবা যাবে না। অনেক দিন ধরেই তো আমি অর্ণবের কথা ভেবে চলেছি। হৃদয়ের আকুতিকে এভাবে নষ্ট করা যায় নাকি! ফোনটা হাতে নিয়ে তার নম্বর ডায়াল করেই চোখ বন্ধ করে ফেললাম!
একবার বাজতেই ওপাশ থেকে, “হ্যালো।”
এত দ্রুত কল ধরল যে মনে হলো, যেন এই ফোনের অপেক্ষাতেই ছিল। আমি বললাম, “বাসায় পৌঁছেছেন? আমাকে চিনতে পেরেছেন?”
“আপনার গলা শুনেই বুঝেছি।”
“আপনি কি কারও ফোনের অপেক্ষায় ছিলেন নাকি?”
“যদি বলি ছিলাম, তাহলে কি আমার শাস্তি হবে?”
শুরু হলো আমাদের গুণগুণ আলাপ। এভাবেই দিন যাচ্ছে, সপ্তাহ যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে আমাদের দেখা হচ্ছে। কখনো কফিশপে, কখনো পার্কে।
আমাদের সমস্ত না-বলা কথা মনে হয় দুজন দুজনার জন্য জমিয়ে রেখেছিলাম। আমাদের মাঝে একটা অদ্ভুত গভীর বোঝাপড়া তৈরি হয়ে গেছে। এই কদিনেই মনে হতে লাগল, আমাদের পরিচয় যেন হাজার বছরের। সুখ, দুঃখ, স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন, অবলীলায় সবকিছুই একে অপরকে জানিয়ে দিচ্ছি। মনের এই রসায়ন আমি বুঝতে পারি না।
দিন যত যাচ্ছে, ততই যেন চাওয়া-পাওয়াগুলো এক হচ্ছে। কোনো এক স্বপ্নের ঘোর আমাদের দুজনকে যেন ঘিরে রেখেছে! এ কি শুধু কৃতজ্ঞতাবোধ, আন্তরিকতা থেকে উদ্ভূত এক বন্ধুত্ব? নাকি হৃদয়ের গভীর টান?
এক সন্ধ্যায় অনর্বকে ক্যাম্পাসে আসতে বললাম। ভিসি চত্বরের পথ ধরে পাশাপাশি হাঁটছি আমরা। গোধূলির রক্তিম আভা ততক্ষণে নীলাকাশকে ছেয়ে ফেলেছে। পাখিরা ফিরছে নীড়ে। ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্বলে উঠছে একে একে। হঠাৎ অর্ণব আমার সামনে দাঁড়িয়ে গেল। আমার চোখে চোখ রেখে বলল, “সাবাতিনা, তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও?”
তার চোখে আজও সেই পার্বতীপুর স্টেশনের সরলতা, কিন্তু এবার গভীরতা আরও বেশি। একটা সময় নিরাপত্তার আশায় যাকে আশ্রয় করেছিলাম, তার কাছে কি জীবনের সবকিছু বলতে পারি না? তাকে কি জীবনের সঙ্গী করতে পারি না?
প্রশ্নগুলো হৃদয়ে আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মতো। ভাবতে ভাবতেই গলা ধরে আসে আমার। ধরা গলায় তাকে বললাম, “আপনি বলতে চান না?”
মুখোমুখি দুজন, দুজনের চোখের দিকে তাকিয়ে। সব উত্তর যেন ওই চোখজোড়ায় লুকিয়ে। আমরা সেই চোখ দিয়েই অন্য চোখের রহস্য ভাঙছি! নিঃশব্দ, নিশ্চুপ চোখের ভাষা, যা সবকিছু একে একে বলে দিচ্ছে, বলিয়ে নিচ্ছে! এই নীরবতায়, চোখের গভীরতায়, শব্দের আর কোনো প্রয়োজন নেই!
(এখানে পড়ুন: সাবাতিনার গল্প: আবার দেখা)