সাময়িকী

সাবাতিনার গল্প: আবার দেখা


  • ইশরাত জাহান   |
  • প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৬, ০১:০৫
সাবাতিনার গল্প: আবার দেখা
ছবি: এআই

মূলকাহিনী সংক্ষেপে

রাতের ট্রেনে ঢাকা থেকে পার্বতীপুর যাচ্ছিল সাবাতিনা। পার্বতীপুর থেকে লোকাল ট্রেনে যাবে রংপুর। পাশের সিটে বসেছিল সভ্য-ভদ্র এক তরুণ। প্রায় ভোরে ট্রেন পৌঁছে যায় পার্বতীপুর। ফাঁকা স্টেশনে সাবাতিনার অভয় হয়ে ওঠে সে। স্টেশনের চায়ের দোকানে বসে দুজনে চা খায়। নানা বিষয়ে কথা বলে। রংপুরের ট্রেন প্ল্যাটফর্মে এলে ছেলেটি সাবাতিনাকে যত্ন করে বসার ব্যবস্থা করে দেয়। ট্রেন ছেড়ে দেয়। ছেলেটি প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ে। কাহিনী এটুকুই (পুরো লেখা এখানে)। তরুণটির পুরো সময়ের আচরণ সাবাতিনাকে মুগ্ধ করে। কোনো অশালীনতা বা সুযোগ নেওয়া দূরের কথা; ছেলেটি তার নামও জানতে চায়নি। মোবাইল নম্বরও চায়নি। সে চায় এই কাহিনী সবাই জানুক (অডিও এখানে)।

সাবাতিনার লেখা এই বাস্তব কাহিনীর ভিত্তিতে পাঠকের কাছে গল্প আহ্বান করেছে জীবনজয়ী। সাবাতিনার লেখা যেখানে শেষ, সেখান থেকে লেখকের গল্পের শুরু হবে। আজ প্রকাশ করা হচ্ছে প্রথম গল্প।

সাবাতিনার গল্প: আবার দেখা 

"পার্বতীপুর" এই নামটা শুনলেই আমার মনে একটা আবছা আলোয় ঢাকা সন্ধ্যা ঘুরে বেড়ায়। একটা অচেনা স্টেশন, ধুলোভরা বাতাস, আর একটা না বলা গল্প। ঢাকা থেকে আমার পাশের সিটে বসা ছেলেটি। নিজ-গুণে সে আমার ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছিল সেদিন।

তারপর কেটে গেল এক বছর। কোথায় পাব তারে? নাম-মোবাইল কিছু বিনিময় হয়নি। একটা ইউনিভার্সিটির নাম বলেছিল। কিন্তু সেখানে পড়ালেখা শেষ হয়েছিল ততদিনে। তার মানে সে ক্যাম্পাসে গিয়ে লাভ নেই কোনো।

ঢাকায় তখন রমজান শুরুর ঠিক আগের সময়। বাতাসে একটু হিম। চারপাশে উৎসবের রঙ লাগতে শুরু হয়েছে। রোজায় আমার মিডটার্ম পরীক্ষা। তাই ভাবলাম ঈদের শপিংটা আগেভাগে একটু একটু করে সেরে ফেলি।

একদিন শনিবার দুপুরের পর আমি আর আমার বান্ধবী হেমা শপিংয়ে বেরিয়েছিলাম। সাতাশ নম্বরের ওদিকে। বিকেলে হয়ে গেলে হেমা চলে গেল মামার বাসায়। আমি একা। আরও কিছু কেনাকাটা বাকি। 

আধা ঘণ্টা পরে শপিংমলের বাইরে দাঁড়িয়ে মোবাইলে উবার খুঁজছি, কিছুতেই পাচ্ছি না। তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো সেই কণ্ঠ—

—কেমন আছেন?

আমি ফিরে তাকালাম।

—আপনি!

তার চোখে ক্লান্তি, কিন্তু হাসিটা সেই আগের মতোই। মিষ্টি আর স্থির।

—আপনি এখানে?

—হ্যাঁ, আমি তো ঢাকাতেই থাকি। ছোটখাটো একটা চাকরি করছি।

একটু থেমে আবার বলল,

—এক কাপ কফি খাবেন?

আমি কিছু না ভেবেই মাথা নেড়ে দিলাম।

কফিশপে ঢোকার আগে হাঁটতে হাঁটতে পরিচিত হলাম আরও একটু।

সে বলল,

—গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর মনমতো চাকরির জন্য চেষ্টা করছি। হচ্ছে কই?

আমি হেসে বললাম,

—আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে; বলেছিলাম আপনাকে। এখন মাস্টার্সে উঠে গেছি।

আমাদের কথোপকথনে এক ধরনের স্বাভাবিকতা ছিল—যেমন হয় দুজনের ভেতর পুরোনো বন্ধনের মতো কিছু থাকলে।

কফিশপ কফির গন্ধে ম ম। চেয়ারগুলো সব ভর্তি। জানালার পাশে বসে আমরা গল্পে ডুবে গেলাম।

নিশাত জানালো তার জীবনের কঠিন সময়ের কথা—

—বলেছিলাম তো, মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান আমি। বাবা পড়াশোনার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। তাই চেয়েছিলাম নিজে কিছু করি। শেষমেশ কিছু হচ্ছে না দেখে, পার্ট-টাইম ডেলিভারির কাজ নিই। প্রথমে সব ঠিকঠাকই ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে পারি, আমি এক গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়েছি। বাক্সবন্দি পার্সেলগুলো কোনো সাধারণ জিনিস ছিল না—সাধারণ পার্সেলের মোড়কে লুকিয়ে নেশার জিনিস ডেলিভারি হতো। বুঝতে পেরেই আমি জবটা ছেড়ে দিতে চাই। কিন্তু এত সহজ না ব্যাপারটা। ওরা বুঝতে পেরেছে যে আমি ধান্দাটা ধরে ফেলেছি।

—কী বলেন এসব?

—ঠিকই বলছি। ওরা আমাকে চোখে চোখে রাখে।

আমি শুনে ভয়ে কেঁপে উঠি।

—আমি চুপচাপ আছি। যতটা সম্ভব কাজ এড়াচ্ছি। তবে নিষ্ঠুর ব্যাপার কী জানো?

—কী?

—টাকা ছাড়া চলি কেমন করে। বাড়ি থেকে আমার টাকা আনার উপায় নেই। আমার এতদিনে পুরো সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার কথা।

আমি একসাথে ভীত ও মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম তার কথা; দেখছিলাম, তার চোখের ভাষা। কিন্তু মনে আশঙ্কা কাজ করছিল—আসলেই কি ও এখন নিরাপদ?

কথা পাচ্ছি না খুঁজে।

—ভালো খবর অবশ্য একটা আছে। একটা মোটামুটি স্কলারশিপ পেয়েছি। পরশু অস্ট্রেলিয়ায় যাচ্ছি।

সে বলল হঠাৎ।

আমার মনে আলো জ্বলে উঠল। আনন্দের আলো। শান্তির আলো। কেন কে জানে?

আর কিছুক্ষণ এটা-ওটা কথা বলে উঠলাম আমরা। এবার অবশ্য মোবাইল, ফেসবুক কিছু বাকি রইল না।

বিদায় নেওয়ার সময় আমি বললাম,

—জীবনটা এবার তোমার মতো করে শুরু হোক, নিশাত।

সে হেসে বলল,

—তোমার জন্যও একই কামনা—সাবাতিনা।

উবারের ভাবনা বাদ দিয়ে রিকশা নিয়েছিলাম হলে ফেরার। নিশাতই ঠিক করে দিয়েছিল। আমার গা-মাথাজুড়ে তখন গোধূলি আলোর মাখামাখি। আমার মনটা একেকবার একেকরকম লাগছিল।

আমাদের কোনো ছবি নেই, কোনো কনভারসেশন হিস্ট্রি নেই। থাকার মধ্যে আছে এক রাতের ট্রেন, একটা স্টেশন। আর আছে কফি শপের জানালাটা। এ আর এমন কী! তবু আমার মনের ভেতরে কী একটা অনুভূতি রিনরিন করছে। নিজেকে বোঝালাম সে দূরে চলে যাবে, তাতে আমার কী? তবে মনে হচ্ছে সে আমার মনে থেকে যাবে।

তিন মাস পর...

আমি লাইব্রেরিতে বসে রিসার্চ পেপার লিখছি। মোবাইল চেক করতে গিয়ে দেখি একটা ই-মেইল এসেছে!

Subject: Coffee again?

মেইল খুলে দেখি শুধু দুটো লাইন—

"তুমি বলেছিলে, জীবনের শুরু হোক আমার মতো করে—আমি চাই সেই শুরুতে তুমি পাশে থাকো। দেশে ফিরছি দু'সপ্তাহের জন্য এই শুক্রবার।"

অনেক ক্ষণ ই-মেইলের দিকে তাকিয়ে ছিলাম...

হয়তো আমাদের আবার দেখা হবে।

হয়তো অন্য একটা গল্প শুরু হবে।

জীবন তো এমনই—কখনো ট্রেনের জানালায়, কখনো কফির কাপে, আবার কখনো এক ই-মেইলে এসে দাঁড়ায় কোনো নতুন শুরু নিয়ে।



ক্যাটাগরি: সাময়িকী

         

  রেটিং: ৩.৬

এই বিভাগের আরও পোস্ট

ফুল তরু লতা ও আমার জীবন

ফুল তরু লতা ও আমার জীবন

  • খালেদ হাসান শান্ত |
  •  ২৫-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৫

সাবাতিনা, তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও?

সাবাতিনা, তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও?

  • সুমাইয়া রহমান তুলি|
  •  ২১-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৪

বিশ্বের প্রথম নারী সরকারপ্রধানদের পথচলা

বিশ্বের প্রথম নারী সরকারপ্রধানদের পথচলা

  • জীবনজয়ী ডেস্ক|
  •  ১৫-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৫

আমার সেরা তিনটি দিন

আমার সেরা তিনটি দিন

  • ইসমাইল সাব্বির|
  •  ১২-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৫

আমার মেয়েবেলা

আমার মেয়েবেলা

  • মৌমিতা সেন |
  •  ০৯-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

০

পুরুষশাসিত চীনে যেভাবে হলো এক নারীর উত্থান

পুরুষশাসিত চীনে যেভাবে হলো এক নারীর উত্থান

  • জীবনজয়ী ডেস্ক |
  •  ০৪-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৩.৭