সাময়িকী

আমি সাবাতিনা: অতঃপর আমাদের কাহিনি চলতে থাকলো


  • নওশিন আঞ্জুম   |
  • প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ২৩:১৮
আমি সাবাতিনা: অতঃপর আমাদের কাহিনি চলতে থাকলো
ছবি: এআই

বাস্তব কাহিনি “সাবাতিনার কী হয়েছিল?” অবলম্বনে লিখিত গল্প। 

[এখানে পড়ুন: “সাবাতিনার কী হয়েছিল?]

সেদিন ভোরের ট্রেনে পার্বতীপুর রওয়ানা দেওয়ার সময় আমার মনের মধ্যে সুখের একটা অনুভূতি হচ্ছিল। রাতভর পাশের সিটে বসা তরুণটির আচার-আচরণ সত্যি বলতে আমাকে বিমোহিত করেছিল। ঠিক সময়ে ট্রেন রংপুর পৌঁছে গেল। মামাতো ভাইয়ের বিয়েতে মজা করলাম খুব করে।

বিয়ের হৈচৈয়ের ক্লান্তি নিয়ে ঢাকায় ফিরলাম কয়েক দিন পরে। এবার নৈমিত্তিক জীবনে ফেরা দরকার। সামনে পরীক্ষা। কিন্তু দেখি, আমার মাথার মধ্যে ঘুরছে একজন মানুষের চেহারা। কমলাপুর থেকে পার্বতীপুর, পার্বতীপুর স্টেশনে চায়ের দোকান, রংপুরে ট্রেনে আমাকে যত্ন করে তুলে দেওয়া—সব মনে পড়ছে। আজকালকার দিনে যা ভাবাও যায় না, আমাদের ক্ষেত্রে ঠিক তাই হয়েছিল। নাম, মোবাইল, ফেসবুক—কিছু বিনিময় হয়নি। উনি চাননি। আমিও আগ বাড়িয়ে দিতে যাইনি।

হ্যারি বেলাফন্টের ‘জ্যামাইকা ফেয়ারওয়েল’ গানটির কথা ঘুরে ঘুরে মনে আসছে। গানের মধ্যে এক প্রিয়দর্শিনী তরুণীকে ছেড়ে জ্যামাইকা থেকে বিদায় নেওয়ার মনোবেদনার কথা বলা হচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে, আমি যেন বেলাফন্টের গানের সেই বিদেশি নাবিক, যে কিনা জ্যামাইকাতে তার প্রিয়তমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

একদিন যায়, দুদিন যায়, আফসোস তাড়া করে বেড়ায়। যোগাযোগের একটা কোনো উপায় কেন জেনে রাখলাম না। একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করার কথা বলেছিলেন। সেখানে আমার বন্ধু আছে কয়েকজন। একবার ভাবি, ওদের কাছে খোঁজ নেবো? আবার ভাবি, না থাক! মানুষটার হয়তো মনেই নেই আমার কথা। সময় যেতে দিই। সময় অনেক কিছু মুছে দেয়।

এরপরে কেটে গেছে অনেক কয়টি মাস।

একদিন গুলশানের এক কফি শপের দোতলায় বসে আছি এক বন্ধুর অপেক্ষায়। ক্যাপুচিনো অর্ডার করে বসলাম ক্যাফের কাচের দেয়ালের পাশটায়। এখান থেকে সবুজ গোছানো পার্কটার অনেকখানি দেখা যায়। ভেতরের রাস্তাটা চক্রাকারে বয়ে চলেছে পুরো পার্কজুড়ে। মানুষ এখানে প্রাতঃভ্রমণে আসে। বিকেলে জমে আড্ডা। স্বচ্ছ কাচের এপাশ থেকে দেখছিলাম মানুষের আনন্দ আর বিকেলের শহর। মাঝে বন্ধুকে ফোন করছিলাম, কতদূর এল জানতে।

হঠাৎ আমার চোখ স্থির হয়ে গেল। এই তো! আমি তাকে দেখতে পেলাম। পার্কের ভেতর থেকে রাস্তার দিকে আসছেন। আমার বুকটা ধক্ করে উঠল। উঠে দাঁড়ালাম। কফি রইল পড়ে। এবার আমি তাকে হারাবো না। সিঁড়ি ভেঙে বের হলাম। রাস্তা পার হয়ে পার্কের পাশে ফূটপাতে পৌঁছালাম যত দ্রুত পারি। কিন্তু কোথায় তিনি? নেই। নেই বলে নেই। উবে গেছেন মানুষটা। আমার চিৎকার করে কাঁদতে মন চাইল। এদিক-ওদিক আরও কিছুক্ষণ হাঁটলাম। পাওয়া গেল না। তবে তিনি এই শহরে আছেন, এটুকু জেনে মনটা যেন একটু শান্তি পেল।

[এখানে পড়ুন: পার্বতীপুরের পরের গল্প] 

ফোনের রিং বাজল। বন্ধু এসেছে। হতাশ মন নিয়ে ক্যাফেতে ফিরে গেলাম। বিষণ্ণ মন নিয়ে কফিতে চুমুক দিলাম। বিস্বাদ লাগল।

মাস দুয়েক পরের কথা। সারারাত অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করে দুপুর পর্যন্ত ঘুমাচ্ছিলাম। ফোনে রিং বাজছে। ঘুম ঘুম চোখে কল রিসিভ করলাম।

“হ্যালো, ভালো আছেন? আপনার একটা জিনিস রয়ে গিয়েছিল আমার কাছে।”

“জি, কে বলছেন?”

“আমি জুয়েল বলছি। আপনার পায়েলটা ফেলে গিয়েছিলেন সেদিন।”

“সরি, সম্ভবত রং নম্বর। এই নামে আমার কাউকে চেনা নেই।”

“পার্বতীপুর যাওয়ার পথে আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমার। অনেক দিন আগে।”

থমকে গেলাম হঠাৎ। ঘুম ভেঙে উঠে বসলাম। ভেতরটা ধক্ করে উঠল।

“জি, জি, মনে পড়েছে। আপনি আমার নম্বর পেলেন কোথায়?”

“সে অনেক ঘটনা। বলব। আপনার পায়েলটা স্টেশনে ফেলে গিয়েছিলেন সেদিন। দয়া করে নিয়ে আমাকে উদ্ধার করবেন।”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “পায়েল ফেরত দেওয়ার জন্য আমাকে খুঁজে বের করলেন?”

“অনেক কষ্টে। অনেক মানুষের সহযোগিতায়। সে এক বিশাল কাহিনি। এখন বলুন, আপনার পায়েল আপনার কাছে পৌঁছাবে কেমন করে? কোথায় এলে সুবিধা হয় আপনার?”

“আপনার সুবিধা কোন দিকে?”

“ধানমন্ডির দিকে আসা হয় আপনার?”

“প্রায়ই যাওয়া হয়।”

“আসুন তাহলে একদিন লেকের কাছে।”

“ঠিক আছে। সময়-তারিখ জানিয়ে দেবেন।”

“ঠিক আছে।”

ফোনটা রেখে কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে বসে থাকলাম। খালি মনে হলো, আজকের দিনটা ভীষণ সুন্দর! একটা ফোনকলে এত আনন্দ হতে পারে, ভাবতে পারিনি।

এক জন্মদিনে আমার আবদার মেটাতে রূপার পায়েলটা বানিয়ে দিয়েছিলেন দাদু। প্রায়ই পায়ে পরে থাকতাম। খুব প্রিয় ছিল। দাদুর দেওয়া শেষ চিহ্ন। যাত্রাপথে কোথাও পায়েলটা হারিয়ে এসেছিলাম ভেবে অনেকদিন ভীষণ মন খারাপ ছিল। ভয়ে আম্মুকেও বলিনি। বকা খেতে হবে। হারানো পায়েলের উছিলায় কাঙ্ক্ষিত মানুষটার দেখা পাব, ভাবতেই পারিনি একদম!

ভীষণ আনন্দ নিয়ে পরিপাটি হয়ে দুই দিন পর গেলাম ধানমন্ডি লেকে। একটা নার্ভাসনেস আমাকে ঘিরে ধরেছিল। কেন, কে জানে?

তিনি আগেই পৌঁছেছিলেন। দূর থেকে দেখে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। সেই চেহারা। একটু ওজন বেড়েছিল কি?

আমার পায়েলটা খুব যত্ন করে প্যাকেট করে নিয়ে এসেছেন।

“আচ্ছা, আজকেও কি আপনার নাম জানা হবে না?” জিজ্ঞাসা করেন জুয়েল।

“আমার নাম সাবাতিনা।”

“সাবাতিনা, এই নিন আপনার জিনিস। আমি দায়িত্ব শেষ করি আগে।”

একটা বেঞ্চে বসে প্যাকেট খুলে পায়েলটা বের করি। ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখব। হঠাৎ মনে হলো, পায়ে পরে নিই।

পায়েল পরতে গিয়ে আমার মাথা মাটির দিকে নত হয়ে গেল। তবু আমি জুয়েলের চোখে মুগ্ধতা দেখতে পেলাম।

“নম্বর কী করে পেলেন?” নীরবতা ভাঙলাম আমি।

“সে এক লম্বা কাহিনি। হাঁটতে হাঁটতে বলি?” 

“চলুন।”

এরপর আমাদের কাহিনি আর শেষ হলো না।

চলতে থাকলো সেদিন, তারপর দিন, তারও পরদিন। 


ক্যাটাগরি: সাময়িকী

         

  রেটিং: ০

এই বিভাগের আরও পোস্ট

আমি সাবাতিনা: অতঃপর আমাদের কাহিনি চলতে থাকলো

আমি সাবাতিনা: অতঃপর আমাদের কাহিনি চলতে থাকলো

  • নওশিন আঞ্জুম |
  •  ১৪-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

শিউলিফুলেরা ও আমি

শিউলিফুলেরা ও আমি

  • দিলারা রহমান|
  •  ১২-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৪.১

পার্বতীপুরের পরের গল্প

পার্বতীপুরের পরের গল্প

  • আকমাল হোসাইন|
  •  ১১-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

অ্যারিস্টটলের কাছে আলেকজান্ডার কী শিখেছিলেন

অ্যারিস্টটলের কাছে আলেকজান্ডার কী শিখেছিলেন

  • ফারিয়া আক্তার জুঁহি|
  •  ০৬-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৩.৫

কে সেরাহ, সেরাহ

কে সেরাহ, সেরাহ

  • জাওয়াহ বিনতে মিজান স্বর্ণা|
  •  ০৪-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

 হুমায়ুন স্যারের হিমু নাকি অন্য কেউ

হুমায়ুন স্যারের হিমু নাকি অন্য কেউ

  • নাবিলা তাসনিম স্নেহা|
  •  ৩১-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।