নাই নেট

নেট ছাড়া দিনে মনে এলো রবিনসন ক্রুসো


  • নুশরাত জাহান তনিমা  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় |
  • প্রকাশ : ২৬ মে ২০২৬, ২২:৫৫
নেট ছাড়া দিনে মনে এলো রবিনসন ক্রুসো
ছবি: লেখক

একবিংশ শতাব্দীর কোলাহলে জন্ম আমার। যাকে এখন বলে জেন–জি । প্রতিদিনের সকাল শুরু হয় ফোন হাতে, দিনের সমাপ্তিও ঘটে স্ক্রিনের আলোয়। নেট ছাড়া জীবন কল্পনা করাই কঠিন। অথচ আমি বেছে নিলাম এক দিনের নীরবতা—নেটহীন ২৪ ঘণ্টা। জীবনজয়ীর আহবানে। 

মাঝেমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ডিঅ্যাকটিভ করে নিজের জন্য সময় বের করি। ভেবেছিলাম, এটাই যথেষ্ট। কিন্তু এবার বুঝলাম, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে থাকলেই চলে না, ইন্টারনেট আসলে জীবনের অনেক খুঁটিনাটির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে। এই অভিজ্ঞতা নতুনভাবে আমার চোখ খুলে দিয়েছে।

১২ই সেপ্টেম্বর রাত ১২টায় ইন্টারনেট থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলাম। ঘুমের আগে অভ্যাস ছিল দীর্ঘক্ষণ ফোন স্ক্রল করা। কিন্তু সেই অভ্যাস ভাঙল সেদিন। মনে পড়ল শৈশব। আম্মুর কণ্ঠে গল্প শুনে ঘুমিয়ে পড়ার স্মৃতি। সেই অভাব পূরণ করলাম বই হাতে নিয়ে। 

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়ারি’, যেখানে সমাজের ভাঙন, মানুষের টানাপোড়েন আর কঠিন বাস্তবতার নির্মম ছবি। শব্দেরা আমায় জড়িয়ে ধরল, টেনে নিল অন্য জগতে। রাত একটা নাগাদ চোখ বন্ধ হলো গল্পের ঘোরে। 

সকালে ঘুম ভাঙল সাতটায়। স্বভাব ছিল ফোন হাতে নেওয়া, খবর পড়া। সেদিন হাত শূন্য। হঠাৎ মনে পড়ল কাগজের সংবাদপত্রকে। বাবা সব সময়ই বাসায় দুটি পত্রিকা আনিয়ে রাখেন। পাতায় পাতায় খবর পড়তে গিয়ে মনে হলো, এই শব্দেইতো সত্যিকারের বাস্তবতা। নেটের ভেতর নয়, কালি আর কাগজের মধ্যে লুকিয়ে থাকে জীবনের চলমান গল্প।

আরও আনন্দের ব্যাপার হলো, সেদিন ছিল শুক্রবার। ফলে পরিবারের সব সদস্য ঘরে ছিল। সকালের নাশতার টেবিলে বসেই বাবার সঙ্গে লম্বা আড্ডায় মেতে উঠলাম। ডাকসু নির্বাচনের খুঁটিনাটি নিয়ে গল্প চলল ঘণ্টাখানেক। প্রশ্নে-উত্তরে ভরে উঠল সকালটা। বাবার চোখে আমি আবার সেই ছোট্ট মেয়ে হয়ে উঠলাম, যাকে তিনি প্রশ্ন করেন, শোনেন মনোযোগ দিয়ে।

এরপর ছাদে গেলাম। গাছে পানি দিলাম। টবভর্তি সবুজ ভিজে ওঠে আমার হাতের স্পর্শে। মনে হলো, তারাও যেন আমার সঙ্গে নিঃশব্দে কথা বলছে।

দশটার দিকে রান্নাঘরে ঢুকলাম। ঘরে একটি ছোটখাটো দাওয়াত ছিল, তাই সবাই ব্যস্ত। আমি রান্না করতে ভালোবাসি, তাই বিশেষ কিছু পদ রান্না করলাম। দুপুরে অতিথিরা এলেন। তারা অবাক হয়ে তাকালেন, কারণ, আমি নেট ছাড়াই আছি! আশ্চর্যজনকভাবে তারাও ফোন নামিয়ে রাখলেন। যেন সবাই ফিরে গেলাম আগেকার দিনে, যখন মানুষ কেবল মানুষের সঙ্গে সময় কাটাত। 

বিকেল নেমে এল। অন্য কোথাও যেতে পারতাম, গেলাম না। আজকের দিনটা নিজের আর পরিবারের জন্যই। রান্নাঘরে ঢুকে নাশতা বানালাম। সবাই মিলে খেলাম, হাসলাম, আনন্দে ভরে উঠল ঘর।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। নিজের ঘরে এসে মনে পড়ল, অষ্টম শ্রেণিতে ‘আনন্দপাঠ’ বইয়ে ‘রবিনসন ক্রুসো’ গল্পের একটা চিত্র এঁকেছিলাম। সেটি ছিল জাহাজডুবির দৃশ্য। তখন থেকেই আঁকার প্রতি টান। তাই আবার সেই ছবি নতুন করে আঁকলাম। 

রাত আটটার দিকে আবার বই হাতে নিলাম। পড়তে পড়তে ‘খোয়ারি’ শেষ হলো রাত দশটার মধ্যে। বইয়ের প্রতিটি শব্দ হৃদয়ে ধাক্কা দিল। মনে হলো, আমি শুধু পড়িনি, বরং নিজের ভেতরের প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হয়েছি। 

রাতের খাবার শেষে পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডা হলো। তারপর হঠাৎ মনে হলো, এই অভিজ্ঞতা যদি হারিয়ে যায়, তবে অন্যরাও জানবে না নেটহীন জীবনের স্বাদ। তাই টেবিলে বসলাম। কলম ধরলাম। লিখতে শুরু করলাম। 

আজকের এই অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, ইন্টারনেট খুব দরকারি, কিন্তু এর বাইরে থাকা ও নিজেকে সময় দেওয়া, পরিবারের সঙ্গে থাকা, রান্না করা, আঁকা, প্রকৃতির সঙ্গে মেশা—এসবও অনেক মূল্যবান। ইন্টারনেটের বাইরে সময় কাটানো আমাকে নতুন স্মৃতি, আনন্দ আর উপলব্ধি দিয়েছে।

আমি আবারও এমন অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করতে চাই। ভাবি মানুষের সে দিনগুলোর কথা যখন জীবন ইন্টারনেটে বাঁধা পড়ে যেতো না। আমি তার খুব ছোট অংশই দেখেছি। কিন্তু আজ আমি বুঝেছি, প্রযুক্তি যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, কখনো কখনো তার বাইরে থাকা আমাদের জীবনের ছোট ছোট আনন্দ, মন ও আত্মার শান্তি দেয়। 

২৪ ঘণ্টা ইন্টারনেট ছাড়া থেকে আমি যা যা করেছি—রান্না, আঁকা, বই পড়া, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো সবকিছু মিলিয়ে এক অদ্ভুত আনন্দের দিন। আমি সত্যিই অবাক, আমি এত কিছু এক দিনে করেছি। এই অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে যে জীবনের জয় মানে সব সময় স্ক্রিনের আলো নয়। মানুষের মুখের হাসি, পরিবারের সঙ্গে সময়, প্রকৃতি, নিজের ভেতরের শান্তি—এগুলোই আসল সম্পদ।



ক্যাটাগরি: নাই নেট

         

  রেটিং: ৪.৬

এই বিভাগের আরও পোস্ট

আমার জন্য একটা রিফ্রেশিং ব্রেক ছিল

আমার জন্য একটা রিফ্রেশিং ব্রেক ছিল

  • ইয়াসিন আলী|
  •  ১৫-১০-২০২৬
ক্যাটাগরি: নাই নেট

০

নেট ছাড়া দিব্যি একটি দিন

নেট ছাড়া দিব্যি একটি দিন

  • তাসমিয়া মেহেরিন |
  •  ০৫-১০-২০২৬
ক্যাটাগরি: নাই নেট

৫

চাঁদের আলোয় প্রকৃতির নীরবতাকে উপভোগ করলাম

চাঁদের আলোয় প্রকৃতির নীরবতাকে উপভোগ করলাম

  • অঞ্জন সরকার|
  •  ১৮-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: নাই নেট

০

বই পড়ে অন্য এক জগতে হারিয়ে গিয়েছিলাম

বই পড়ে অন্য এক জগতে হারিয়ে গিয়েছিলাম

  • ফারিহা আনজুম নোশিন|
  •  ০৫-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: নাই নেট

৫

ইন্টারনেট ছাড়া এক শান্তিপূর্ণ দিন

ইন্টারনেট ছাড়া এক শান্তিপূর্ণ দিন

  • আবু সায়েম |
  •  ২৫-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: নাই নেট

৪

আমি যেন এক নতুন জগতে পা রাখতে যাচ্ছি

আমি যেন এক নতুন জগতে পা রাখতে যাচ্ছি

  • পূজা প্রামানিক|
  •  ২৩-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: নাই নেট

৫