স্ট্যানলি অ্যান ডানহাম। বেশির ভাগ মানুষ তাকে চেনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মা হিসেবে। কিন্তু এটি তার আংশিক পরিচয়। স্ট্যানলি ডানহাম ছিলেন একাধারে নৃবিজ্ঞানী, গবেষক ও উন্নয়নকর্মী। বিয়ে, বিয়ে ভেঙে যাওয়া, একা-মা হিসেবে সন্তান প্রতিপালন—জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নিজের শিক্ষা ও পেশাগত জীবনকে এগিয়ে নিয়েছেন। নারীর সক্ষমতা ও অধ্যবসায়ের এক অনন্য উদাহরণ তিনি।
১৯৪২ সালের ২৯ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস অঙ্গরাজ্যের উইচিটা শহরে এক মধ্যবিত্ত শ্বেতাঙ্গ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন স্ট্যানলি অ্যান ডানহাম। তার বাবা ছেলে প্রত্যাশা করেছিলেন। সে কারণেই মেয়ের নাম রাখা হয় ছেলেদের প্রচলিত নাম অনুসারে—‘স্ট্যানলি’। শৈশব ও কৈশোরে এই নাম নিয়ে তাকে কম বিড়ম্বনায় পড়তে হয়নি।
স্ট্যানলির ছোটবেলা কেটেছে পরিবারের সঙ্গে এক অঙ্গরাজ্য থেকে আরেক অঙ্গরাজ্যে ঘুরে। কানসাস, ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস, ওকলাহোমা এবং পরে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্য। নতুন বন্ধু, নতুন স্কুল ও নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় তাকে ভিন্ন সমাজ ও সংস্কৃতিকে জানা ও বোঝার প্রতি আগ্রহী করে তোলে। এই অভিজ্ঞতাই নৃবিজ্ঞানের প্রতি তার আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়।
কিশোরী বয়সেই সমাজে মেয়েদের জন্য বাঁধাধরা নিয়মকে প্রশ্ন করতে শেখেন স্ট্যানলি। ১৯৬০ সালে ওয়াশিংটনের মার্সার আইল্যান্ড হাই স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াইয়ে ভর্তি হন। রুশ ভাষার একটি ক্লাসে পরিচয় হয় বারাক ওবামা সিনিয়র নামের এক কেনীয় শিক্ষার্থীর সঙ্গে। দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। কিছুদিনের মধ্যেই তারা বিয়ে করেন। ১৯৬১ সালে এই দম্পতির ঘরে জন্ম নেয় বারাক ওবামা, যিনি পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪তম প্রেসিডেন্ট হন।
স্ট্যানলির বিয়ে এবং সন্তান শ্বেতাঙ্গ-অধ্যুষিত আমেরিকান সমাজের অনেককে বিস্মিত করেছিল। ষাটের দশকের শুরুতে একজন আফ্রিকানকে বিয়ে করা ছিল সাহসী এবং অপ্রচলিত সিদ্ধান্ত। সামাজিক রীতিনীতির চেয়ে নিজের বিশ্বাসকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি।
বারাক ওবামার জন্মের পরও স্ট্যানলি পড়াশোনা চালিয়ে যান। এদিকে ওবামা সিনিয়র উচ্চশিক্ষার জন্য হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। দূরত্ব ও অন্যান্য কারণে সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৪ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।
স্ট্যানলি ডানহাম হাওয়াইতে বাবা-মার কাছে ফিরে যান। বয়সে তরুণী, বিয়ে-বিচ্ছিন্ন, সঙ্গে মিশ্র বর্ণের সন্তান। অনেকে হয়তো ভেঙে চৌচির হয়ে যেত। কিন্তু স্ট্যানলি ছিলেন ভিন্ন রসায়নের মানুষ। শিশু ওবামা রইলেন নানা-নানীর জিম্মায়। তিনি আবার শুরু করলেন লেখাপড়া। হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃবিজ্ঞানে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেন স্ট্যানলি। এখানেই প্রেম ইন্দোনেশিয়ার ছাত্র লোলো সোয়েতোরোর সঙ্গে। এই ধারাবাহিকতায় তাদের বিয়ে হয় ১৯৬৫ সালে।
একপর্যায়ে স্বামীসহ গেলেন ইন্দোনেশিয়া। সঙ্গে আছে বারাক। সেখানে দ্বিতীয় সন্তান মায়ার জন্ম দেন। নতুন দেশ, নতুন ভাষা ও নতুন সংস্কৃতিতে মেয়ে মায়ার জন্ম হয়। স্বামী-সন্তান-সংসারের চাপে পড়ালেখাকে বিদায় জানাননি স্ট্যানলি ডানহাম। ইন্দোনেশিয়ায় বসে মাস্টার্স করতে থাকেন তিনি। এই পড়ালেখাকে তিনি পিএইচডি পর্যন্ত টেনে নিয়েছিলেন।
১৯৮০ সালে আবারও বিবাহবিচ্ছেদ। ততদিনে ইন্দোনেশিয়ার প্রতি তার অনুরাগ গভীর হয়েছে। বিচ্ছেদের পরও ইন্দোনেশিয়ার মানুষের জীবনযাপন, গ্রামীণ অর্থনীতি ও নারীর ভূমিকা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যেতে থাকেন।
১৯৯২ সালে স্ট্যানলি ডানহাম নৃবিজ্ঞানে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের গবেষণা তার গবেষণাকর্মকে সমৃদ্ধ করে। তার গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইন্দোনেশিয়ার গ্রামীণ অর্থনীতি, কারুশিল্প এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাপন।
নৃবিজ্ঞানের গবেষক হিসেবে দীর্ঘ সময় ইন্দোনেশিয়ার গ্রামাঞ্চল ছিল তার কর্মক্ষেত্র। সে সময় দেশটির সমাজ ছিল বেশ পুরুষকেন্দ্রিক। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে নারীর উপস্থিতিও ছিল সীমিত। সামাজিক বাস্তবতা, নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ এবং সাংস্কৃতিক পার্থক্যের মধ্যেও তিনি নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন খাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন স্ট্যানলি ডানহাম। তিনি ফোর্ড ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, বিশেষ করে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল, উন্নয়ন কেবল কাগুজে পরিকল্পনার বিষয় নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের হাতে সুযোগ ও প্রয়োজনীয় সম্পদ তুলে দেওয়া। দরিদ্র মানুষ অলস নয়; তাদের অভাব মূলত পুঁজি ও সুযোগের।
পিএইচডি সম্পন্ন করার পর তিনি নিউইয়র্কভিত্তিক উইমেন্স ওয়ার্ল্ড ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হন। সেখানে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আর্থিক সেবার সুযোগ সম্প্রসারণে কাজ করেন। প্রতিষ্ঠানটি এখনও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইক্রোফাইন্যান্স নেটওয়ার্ক হিসেবে পরিচিত।
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে স্ট্যানলি ডানহামের ক্যানসার ধরা পড়ে। অসুস্থতার সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯৯৫ সালের ৭ নভেম্বর, মাত্র ৫২ বছর বয়সে হাওয়াইয়ে তার মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর পরও তার অবদান স্মরণ করা হয়। ইন্দোনেশিয়ায় তার গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কাজ বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। একই সঙ্গে ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াইয়ে তার স্মরণে ফেলোশিপ কর্মসূচিও চালু করা হয়েছে।
স্ট্যানলি অ্যান ডানহাম প্রমাণ করে গেছেন, ব্যক্তিগত সংকট একজন নারীর শিক্ষাগত ও পেশাগত অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারে না। নীরব সংগ্রাম, অধ্যবসায় এবং মানুষের কল্যাণে নিবেদিত কর্মের মাধ্যমে সাধারণ পরিবারের একজন মেয়েও অসাধারণ হয়ে উঠতে পারেন।