আমার চোখে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন হলো এক বিস্তৃত ক্যানভাস, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত রঙিন। হলের জানালায় বসে দেখা ভোরের আলো, বন্ধুত্বে জড়ানো চায়ের কাপ, আর অকারণে শুরু হওয়া কানামাছি খেলা—সব মিলিয়ে এই সময়টা কেবল পাঠ্যবইয়ের অধ্যায় নয়, জীবনের এক বিস্ময়কর আবিষ্কার। কবি সুফিয়া কামাল হলের রাজকীয় প্রাঙ্গণ থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছে, তা কেবল আমার নয়; আমার মতো অনেকেরই আত্ম-আবিষ্কারের গল্প। জুঁহির চোখ দিয়েই দেখা এমন দিনগুলো থেকে তেমন একটি টুকরোই আজ সবাইকে শোনাবো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের জন্য আছে পাঁচটি হল। এদের মধ্যে যে হলটিকে সবচেয়ে 'রাজকীয়' বলা হয়, সেটিই হলো আমার আবাসস্থল। আমার আপন ঠিকানা—কবি সুফিয়া কামাল হল। প্রতিদিন যেখানে আমার সকাল শুরু হয় সূর্যের মিষ্টি আলো, আকাশে ভেসে চলা পাখিদের কিচিরমিচির, আর স্নিগ্ধ বাতাসের হালকা স্পর্শে। এই শহরের বাতাস যদিও দূষিত, কিন্তু এই ক্যাম্পাসজুড়ে যেন এক অদ্ভুত সতেজতা ছড়িয়ে থাকে। যেখানে প্রাণ জেগে ওঠে, দিন শুরু হয় জীবনের উচ্ছ্বাস নিয়ে। এখানে দিনের শুরুটাই হাতছানি দিয়ে ডেকে যায়—এক প্রাণোচ্ছল উপভোগ্য জীবনের জন্য।
আর সব শিক্ষার্থীর জীবনে বাঁধা ছকের মতো আমাকেও নতুন দিনের শুরুতেই ক্লাসে যেতে হয়, ঠিক সময়মতো। ক্লাসটা অবশ্য হল থেকে বেশ দূরে। সেই সুবাদেই অবশ্য বেশ কিছুক্ষণ সকালের স্নিগ্ধতা গায়ে মাখতে মাখতে ক্লাসের পথ ধরতে পারি। একদিকে ক্লাসরুমে শিক্ষকের আন্তরিক পাঠদান যেমন জ্ঞানের খোরাক মেটায়, তেমনি বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর চায়ের পেয়ালায় প্রাণ খুঁজে পায় মনের সজীবতাকে। আমাদের এই আড্ডাগুলি চলতে থাকে ক্লাসের ফাঁকে-ফাঁকেই। আবার কখনোবা ক্লাস শেষের অবসরে।
এরই মধ্যে একবার সেমিস্টার ফাইনাল শেষে বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানালাম আমার রাজকীয় হলে। মা যেমন বাড়িতে অতিথি আসার আগে যত্ন করে প্রস্তুতি নেন, আমিও ঠিক তেমন করেই আমার বন্ধুদের জন্য নিজের হলের গাছ থেকে আমড়াগুলো পেড়ে কেটে রাখলাম। বন্ধুরা এসে তো সেই আমড়া খেয়ে একেবারে প্রশংসায় পঞ্চমুখ! এমন প্রশংসায় একটু গর্ববোধ তো করতেই হবে—আমার হলের গাছের আমড়া বলে কথা!
এরই মধ্যে সবাই মিলে ঠিক করে ফেললাম, 'আজকেই চড়ুইভাতি করবো।' যেই ভাবা, সেই কাজ! শুরু হলো এলাহি আয়োজন! রান্নাঘরে হৈচৈ, হাসি, মশলা মাখাতে মাখাতে গপ্পো মারা! এরই মধ্যে খাবারও প্রস্তুত। নিজেদের তৈরি সেই খাবার যখন হল-মাঠের মাঝখানে, খোলা আকাশের নিচে বসে খেলাম, তখন মনে হলো—ভরপেট নয়, বরং ভরআনন্দে খাওয়া হলো।
সে এক চড়ুইভাতি-ই বটে! ঢাকায় বসে এমন খোলা আকাশের নিচে ঘাসের সবুজ চাদরে বসে খাওয়ার সুযোগ আর কোথাও মেলা ভার। এরই মধ্যে সকলেরই এক অভিযোগ খাবার নাকি বেশি খাওয়া হয়ে গিয়েছে। ভরপেটের গমগমে আবেশ কমাতে তাই ওদেরকে বাড়ি থেকে আনা আমার মায়ের হাতের আচার খেতে দিলাম। আহ্! সেই আচার আবার আরেক আনন্দের ভাণ্ডার হয়ে উঠলো। আচার খেয়ে বন্ধুরা যেমন করে মায়ের প্রশংসায় মাতোয়ারা হলো, তা শুনে আমার মন যেন কেমন এক শান্ত জলে ভেসে গেলো। মনে অদ্ভুত শান্তি পেলাম।
কার আইডিয়া ছিল মনে নেই, কিন্তু খাওয়া শেষে একটু বিশ্রামপর পরই শুরু হয়ে গেল কানামাছি খেলা। আমরা যেন আবার শিশু হয়ে গেলাম—হঠাৎ খোলা মাঠে শুরু হলো ছোটাছুটি, চিৎকার, হাসি, লুটোপুটি! মন হেসে উঠলো প্রাণখোলা এক আনন্দে। তখন আমরা সবাই চতুর্থ সেমিস্টারে মানে বেশ পরিণত হয়ে উঠেছি। অথচ সেই খেলায় ফিরে গিয়েছিলাম ছেলেবেলার স্কুলের মাঠে—যেখানে টিফিনের ঘণ্টা শোনার অপেক্ষা এখনো স্বপ্নের মত লাগে।
যদিও এরই মধ্যে থার্ড সেমিস্টারে একবার ডিপার্টমেন্টের সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে পায়ে ফ্রাকচার করে ফেলেছিলাম। পায়ের ব্যথার আশঙ্কা থাকায় সবাই বলছিল সাবধানে থাকতে, দৌড়ঝাঁপ কম করতে। কিন্তু মন তো আর সেই বাঁধা মানতে রাজি নয়—সে তো তখন ফিরেছে শৈশবে! স্মৃতিতে এসে ভর করেছে বাল্যবন্ধুদের সাথে স্কুল মাঠের কানামাছি খেলার দিনগুলো। ছেলেবেলায় আমার স্কুলে যাওয়ার মূল কারণ ক্লাস ছিলনা। ছিল—বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সেই টুকরো টুকরো মুহূর্তগুলো। আর সেই অনুভূতির পুনরাবৃত্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আবারও পেয়ে যাওয়ার তৃপ্তি যেন ছুঁয়ে গেল হৃদয়কে।
যাই হোক! আমাদের উৎসব কিন্তু এখানেই থামলো না। হলমাঠে, খোলা আকাশের নিচে, সবাই মিলে বসে পড়লাম জীবন-গল্পের পসরা সাজিয়ে। পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার পরিকল্পনা, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক গোলযোগ-সঙ্কট সবকিছু নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি নিজেদের জীবনের গল্পের থেকে কিছু আনন্দ কিছু দুঃখেরও ভাগাভাগিও শুরু হলো।
অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম যে, ধীরে ধীরে সবার জীবনই যেন একেকটা জীবন্ত সিনেমার মতো উঠে আসছে। পর্দায় চলা গল্প যেন তখন আমাদের মধ্যেই চলতে থাকলো। আমরা সবাই যেন একেকটি চরিত্র হয়ে উঠলাম। যে যার জায়গা থেকে আত্মপক্ষ সমর্থন করার পাশাপাশি যুক্তি -খন্ডন চললো। কেউ একটা যুক্তি দিলো, কেউ দিলো তার পাল্টা ব্যাখ্যা। সবগুলো হৃদয় একতালের লয়ে বেজে চলেছে! আমার মনে হলো—এর আগে কোনো সিনেমা আমাকে এতটা ছুঁয়েছে, এতটা হাসিয়েছে, এতটা জীবন্ত মনে করিয়েছ বলে মনে হয় না! পর্দার গল্প আর বাস্তবতা এক মুহূর্তে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।
তবে, সেই অনুভূতির ভাগাভাগিতে বন্ধুত্বের প্রয়োজনীয়তা আমাদের কাছে আরও স্পষ্ট হলো, পারস্পরিক বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য বুঝতে শিখলাম নতুন করে। বুঝলাম জীবনের আসল লেনদেন হলো তাই যা জীবনকে আরও উপভোগ্য করে তোলে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি মুহূর্ত-ই মূল্যবান। কিন্তু যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে—সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা কোনটা? তবে আমি বলব— নিজের অনুভূতিগুলোকে আবিষ্কার করে জীবনটাকে উপভোগ করতে শেখা। এইটাই তো বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অপার সম্ভাবনার মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।