আমি পড়াশুনা করছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। প্রথম সেমিস্টারে। এই আমার সংক্ষিপ্ত পরিচয়। কিন্তু এই পরিচয় করে নেওয়ার জন্য পিছনে রয়েছে আমার বহু দিনের পরিশ্রম আর লক্ষ্যের প্রতি নিবেদন। এখন পিছন ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির সুযোগ পাওয়ার চেষ্টার দিনগুলো ভাবলে মন আবেগে আপ্লুত হয়ে যায়। আমার মা-বাবা, শিক্ষকবৃন্দ এবং আমার শুভাকাঙ্ক্ষীরা – সবাইকে মনে পড়ে যাচ্ছে।
সত্যি বলতে কি এসএসসি লেভেল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আমার তেমন কোনো ধারণা ছিল না। এর জন্য যে এডমিশন টেস্টের পথ পাড়ি দিতে তাও জানতাম না। আমাদের কলেজ শিক্ষকেরা আমার মধ্যে এই স্বপ্নটা তৈরি করেছেন। তারা বলতেন ভালোমত চেষ্টা করলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়া সভব। স্যারদের অনুপ্রেরণায় আমি এক পর্যায়ে একাডেমিক পড়াশুনার পাশাপাশি এডমিশন টেস্টের বইপত্র দেখতে শুরু করি।
ভর্তি পরীক্ষার দিনগুলো ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। প্রতিদিন নিজেকে নতুন করে প্রস্তুত করেছি, ক্লান্তি উপেক্ষা করেছি, অনেক আনন্দ-উৎসব থেকে দূরে থেকেছি। কখনো হতাশা এসেছে। কখনো মনে হয়েছে পারব তো? কিন্তু বাবা-মায়ের উৎসাহ, শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা এবং আর আমার ইচ্ছাশক্তি আমাকে থামতে দেয়নি।
নির্দিষ্ট তারিখে পরীক্ষা দিলাম। অপেক্ষার প্রহর আমার কাছে কত দীর্ঘই না মনে হয়েছিল। অবশেষে রেজাল্ট পেলাম। আমি ৩২৩তম স্থান অর্জনে সক্ষম হয়েছি। সে মুহুর্তে আমার আনন্দের চেয়ে বাবা-মায়ের মুখের হাসিটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি দিয়েছিল। তাঁদের চোখের গর্ব আমার সব কষ্টকে সার্থক করে দিয়েছিল। আমার স্যারদের চেহারায় গর্বের হাসির কথাও আমাকে বলতে হবে।
আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বয়স হয়েছে মাস দেড়েক। ইতিমধ্যে আমি বই এবং বইয়ের বাইরে থেকে শিখতে শুরু করেছি। একটু একটু করে বুঝতে পারছি যে শুধু ভালো ফলাফল করা যথেষ্ট নয়; একজন ভালো মানুষ হওয়ারও গুরুত্ব আছে।
বিভিন্ন জেলার, ভিন্ন সংস্কৃতির এবং ভিন্ন চিন্তাধারার মানুষের সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে। সবার কাছ থেকে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং জীবনবোধ পাচ্ছি। নতুন বন্ধু হচ্ছে। সবাই হয়তো সেরা বন্ধু হবেনা এটাও বুঝতে পারছি। কিন্তু কিছু বন্ধু পাচ্ছি এটাই আসল কথা।
হলে সিট পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। আমি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা। এবং ঢাকাই আত্মীয় স্বজন বলতে কেউ নেই। সিট না পেলে কি হবে তা নিয়ে দুর্ভাবনা ছিল। কিন্ত মাসখানেকের মধ্যে আমি হলে সিট পেয়ে গিয়েছি। হলে র্যাগ হয়ে বলে শুনেছিলাম আগে। ভয় লাগতো শুনে। আমি ভুল শুনেছিলাম। আমার অভিজ্ঞতা উল্টো। আমি ঠিকঠাক মত খাওয়া-দাওয়া করছি কিনা, হলে দাদারা অনেক সময় সে খবরটাও নেন। কোনো সমস্যা হলে তাদের জানাতে বলেন। কখনো কখনো মনে হয় আমি একটা পরিবারের মধ্যে আছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার চলা সবে শুরু। বহু পথ হাঁটতে হবে আমাকে। এখনো আমি পরিবারের বাইরে একা-একা থাকা শিখছি। নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছি। আশা করছি আমি ঠিক পথ ধরে এগুতে পারবো।