মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, সিদ্ধান্ত সবসময় যুক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে না। দৃষ্টিভঙ্গিও সবসময় নিরপেক্ষ থাকে না। অজান্তেই সামাজিক প্রভাব, প্রচলিত বিশ্বাস, পূর্বধারণা এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আমাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। তাই দুইজন ভিন্ন ব্যক্তি একই ঘটনা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন।
এই অদৃশ্য প্রভাব বলয়ের অন্যতম রূপ হলো সামাজিক পক্ষপাত; ইংরেজিতে বলে সোশ্যাল বায়াস। এটি এমন এক মানসিক প্রবণতা, যেখানে আমরা কোনো ব্যক্তি অথবা গোষ্ঠীর সম্পর্কে পুরোপুরি না জেনেই পূর্বধারণা অথবা প্রচলিত বিশ্বাস কিংবা সামাজিক প্রভাবের ভিত্তিতে মতামত প্রদান করি। সামাজিক পক্ষপাত জ্ঞানগত পক্ষপাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সামাজিক পক্ষপাত আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে এবং সেটা আমাদের অজান্তেই করে। কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষায়, রাজনীতি, স্বাস্থ্যসেবাসহ সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই পক্ষপাত অবিচার, বৈষম্য ও বিভাজনের জন্ম দেয়। তাই এর থেকে মুক্ত হওয়া একটি উন্নত ও মানবিক সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত।
সামাজিক পক্ষপাতের অদৃশ্য ফাঁদ এড়ানোর প্রথম শর্ত হলো নিজের ভেতরের পক্ষপাতকে চিহ্নিত করা। আমরা অনেক সময় নিজের ভেতরের অচেতন পক্ষপাতকে বুঝতে পারি না; আমাদের সেটা স্বীকার করতে হবে। আমরা বুঝতে পারি না যে, কোনো একজন ব্যক্তিকে আমরা তাঁর সামাজিক অবস্থানের কারণে ভিন্ন চোখে দেখছি। আমাদের চিন্তাভাবনাকে প্রশ্ন করতে হবে—কেন আমি এমন ভাবছি? আমার এই ধারণার পেছনে কী সত্যিই নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য আছে? নাকি শুধুই প্রচলিত বিশ্বাসের ফল? আমাদের আত্মবিশ্লেষণ ও আত্মসমালোচনার অভ্যাস সামাজিক পক্ষপাত কমানোর একটি কার্যকর উপায় হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গুজব, কুতথ্য অথবা কারও একপাক্ষিক বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে আমাদের মতামত গড়া উচিত নয়। এতে পক্ষপাত আরও শক্তিশালী হয়। নির্ভরযোগ্য তথ্য, মতামত এবং বাস্তব প্রমাণ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস আমাদের বিচারকে আরও বস্তুনিষ্ঠ করে তোলে। সেই সঙ্গে একজন ব্যক্তির আচরণ দিয়ে পুরো সম্প্রদায়কে মূল্যায়ন করার প্রবণতা থেকে বিরত থাকতে হবে।
তৃতীয়ত, বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। ভিন্ন সংস্কৃতি, ধর্ম ও ভাষার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ দৃষ্টিভঙ্গিকে বিস্তৃত ও উন্নত করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রত্যেক মানুষকে ব্যক্তি হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে, কোনো গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে নয়। মানুষের পরিচয় তার কর্ম, চরিত্র, সততা ও মানবিক মূল্যবোধে; জন্মগত অথবা গোষ্ঠীগত পরিচয়ে নয়।
সামাজিক পক্ষপাতের ফাঁদ এড়ানোর জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্রসহ সব জায়গায় সহনশীলতা, সহমর্মিতা এবং বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করার চর্চা করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, আমাদের চিন্তা, ভাষা ও আচরণে সচেতন পরিবর্তন সামাজিক পক্ষপাতের ফাঁদ এড়িয়ে চলতে সাহায্য করবে এবং সমাজকে ন্যায়ভিত্তিক, সহনশীল ও মানবিক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।