ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২৬ অবলম্বনে জীবনজয়ীতে গত ২৯ জুন ও ৪ জুলাই দুটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। আজ প্রকাশিত হচ্ছে তৃতীয় পর্ব।
একুশ শতকের পৃথিবীতে কিশোর–কিশোরীদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২৬-এ আলোচিত একটি আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা যায়, অধিকাংশ কিশোর–কিশোরী নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্রে একজন কিশোর–কিশোরী টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউব মিলিয়ে দিনে গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় ব্যয় করে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন তাদের যোগাযোগ, বিনোদন ও আত্মপ্রকাশের অন্যতম মাধ্যম।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার ও জীবনতৃপ্তির সম্পর্ক নিয়ে অধিকাংশ গবেষণা হয়েছে ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার কিশোর–কিশোরীদের ওপর। তবে ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২৬-এ আলোচিত গবেষণাটি তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত। ২০২২ সালের
প্রোগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট (পিআইএসএ) জরিপের তথ্য ব্যবহার করে বিশ্বের ৪৭টি দেশের প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার ১৫–১৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার ও জীবনতৃপ্তির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, বিভিন্ন অঞ্চলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের মাত্রা ভিন্ন হলেও একটি বিষয় প্রায় সব জায়গাতেই লক্ষণীয়। মেয়েদের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের মাত্রা ও জীবনতৃপ্তির মধ্যে নেতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ যারা তুলনামূলক কম সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে জীবনতৃপ্তির মাত্রা সাধারণত বেশি।
পশ্চিম ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও আরও কয়েকটি অঞ্চলে এই প্রবণতা বিশেষভাবে স্পষ্ট। এশিয়াতেও একই ধরনের সম্পর্ক দেখা গেছে, যদিও তা তুলনামূলকভাবে কিছুটা দুর্বল। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দিনে এক ঘণ্টার কম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী মেয়েদের মধ্যে গড় জীবনতৃপ্তির মাত্রা সবচেয়ে বেশি।
ছেলেদের ক্ষেত্রে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। তাদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার ও জীবনতৃপ্তির সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে দুর্বল। অনেক ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহারকারী ও কম ব্যবহারকারী ছেলেদের জীবনতৃপ্তির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায় না। তবে পশ্চিম ইউরোপ ও ইংরেজিভাষী কয়েকটি দেশে ছেলেদের মধ্যেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বেশি ব্যবহার ও কম জীবনতৃপ্তির মধ্যে কিছু সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
গবেষণাটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একেবারেই ব্যবহার না করা এবং অত্যন্ত বেশি ব্যবহার—উভয় ক্ষেত্রেই কিছু কিশোর–কিশোরী জীবনতৃপ্তির চরম অবস্থানগুলোতে, অর্থাৎ খুব বেশি বা খুব কম জীবনতৃপ্তির স্তরে অবস্থান করে। অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের অভিজ্ঞতা সবার জন্য এক রকম নয়।
গবেষকেরা মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার ও জীবনতৃপ্তির মধ্যে সম্পর্ক থাকলেও এটি সরাসরি কারণ–ফল সম্পর্ক প্রমাণ করে না। পারিবারিক পরিবেশ, বন্ধুত্ব, অর্থনৈতিক অবস্থা, বিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত মানসিক বৈশিষ্ট্যের মতো বিষয়ও জীবনতৃপ্তিকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবু গবেষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার কম জীবনতৃপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই কিশোর–কিশোরীদের সুস্থ বিকাশের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং বাস্তব জীবনের সামাজিক সম্পর্ক, খেলাধুলা, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড ও পারিবারিক যোগাযোগকে উৎসাহিত করা জরুরি।