বিবিধ

ডিসইনফরমেশন তথা কুতথ্য কী?


  • জাওয়াহ বিনতে মিজান স্বর্ণা  |
  • প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৬, ০০:০৩
ডিসইনফরমেশন তথা কুতথ্য কী?
ছবি: এআই

বর্তমান যুগ তথ্যের যুগ। ইন্টারনেটের কল্যাণে এখন মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্তের খবর অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। আমাদের হাতে থাকা স্মার্টফোনের মাধ্যমেই আমরা যেকোনো বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে পারি। কিন্তু প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে একটি বড় সংকটও আমাদের সামনে দাঁড়িয়েছে, আর তা হলো ‘ডিসইনফরমেশন’ (কুতথ্য)।

কুতথ্য কী এবং কেন এটি বিপজ্জনক?

সহজ কথায়, ভুল তথ্য সাধারণত দুই ধরনের হয়। একটি হলো ‘মিসইনফরমেশন’ (Misinformation), যা মানুষ অনেক সময় না বুঝে বা ভুলবশত ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু ‘ডিসইনফরমেশন’ বা কুতথ্য হলো পুরোপুরি ভিন্ন একটি বিষয়। এটি হলো কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো মিথ্যা তথ্য, যার মূল লক্ষ্য হলো মানুষকে বিভ্রান্ত করা, কোনো বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা কিংবা সমাজে অস্থিরতা ও ক্ষতি সৃষ্টি করা।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় আমরা দেখেছি, কীভাবে কিছু ভুল তথ্য ও কুপ্রচার জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলেছিল এবং সরকারি নীতিমালা বাস্তবায়নকে কঠিন করে তুলেছিল। ডিসইনফরমেশনের কোনো একক বা সর্বজনীন সংজ্ঞা নেই, কারণ এটি রাজনীতি, জনস্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা সশস্ত্র সংঘাতের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে।

মানবাধিকার ও বাক্স্বাধীনতা

কুতথ্য মোকাবিলা করতে গিয়ে অনেক রাষ্ট্র কঠোর আইন বা বিধিনিষেধ প্রণয়ন করে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, কুতথ্য দমনের নামে সাধারণ মানুষের বাক্স্বাধীনতা বা তথ্য পাওয়ার অধিকার খর্ব করা ঠিক নয়। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, রাজনৈতিক সমালোচনা কিংবা তথ্যের কোনো ভিন্ন ব্যাখ্যা—এসবই বাক্স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত।

গবেষকদের মতে, যদি কুতথ্য রোধের নামে অতিরিক্ত সেন্সরশিপ বা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়, তবে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। এটি মানুষের মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনাস্থা তৈরি করে এবং সমাজকে আরও বিভক্ত করে ফেলে। তাই যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণের সময় সতর্ক থাকা প্রয়োজন, যেন তা শুধু ক্ষতিকর প্রচারকে রোধ করে, কিন্তু ন্যায়সংগত আলোচনা বা সমালোচনার পথ বন্ধ না করে।

কুতথ্য মোকাবিলায় সমন্বিত কৌশল

একটি সুস্থ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত কেবল প্রতিক্রিয়াশীল না হয়ে সক্রিয় ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা। উদাহরণস্বরূপ, কানাডা সরকার এ ক্ষেত্রে একটি কার্যকর কাঠামোর ওপর গুরুত্ব দেয়, যা মূলত দুটি পর্যায়ে কাজ করে।

প্রতিরোধ পর্যায়: দীর্ঘমেয়াদে কুতথ্য রুখতে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো নাগরিক সচেতনতা। ডিজিটাল সাক্ষরতা বা ‘ডিজিটাল লিটারেসি’র মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে শেখানো প্রয়োজন যে, ইন্টারনেটে পাওয়া প্রতিটি তথ্যই সত্য নয়। এ ছাড়া সরকার যখন নীতি বা যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখে এবং নিয়মিত জনগণের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তখন গুজবের সুযোগ কমে যায়। একে বলা হয় ‘প্রি-বাঙ্কিং’, অর্থাৎ কোনো মিথ্যা প্রচার শুরু হওয়ার আগেই সত্য তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এ ক্ষেত্রে সরকার সরাসরি কাজ করার পাশাপাশি স্থানীয় কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ এবং বিশ্বাসযোগ্য বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় বার্তা প্রচার করতে পারে।

প্রতিক্রিয়া পর্যায়: যখন কোনো কুতথ্য ভাইরাল হয়ে যায়, তখন চুপ করে থাকা উচিত নয়। বরং দ্রুত এবং ধারাবাহিকভাবে সঠিক তথ্য তুলে ধরতে হবে। নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য বারবার প্রচার করলে মিথ্যা আখ্যানের প্রভাব কমে আসে। এ ছাড়া নিশ্চিতভাবে মিথ্যা তথ্যগুলোর ক্ষেত্রে ‘ডিবাঙ্কিং’ বা তথ্য-প্রমাণসহ সেই মিথ্যাকে ধরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। তবে এই কাজ করার সময় পেশাদার যোগাযোগ দলের পরামর্শ নেওয়া জরুরি, যাতে সরকারি প্রতিক্রিয়াটি আইনসম্মত ও কার্যকর হয়।

কুতথ্য মোকাবিলায় কেবল কঠোর আইন যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়বদ্ধতা। টেক কোম্পানিগুলোকে তাদের প্ল্যাটফর্মে স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে এবং ব্যবহারকারীদের সুরক্ষার বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, একটি সচেতন সমাজই কুতথ্যের সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক। যখন একজন নাগরিক কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তুলবেন, তখনই এই ডিজিটাল বিশৃঙ্খলা অনেকটা কমে আসবে। আমরা যদি সত্য ও তথ্যের প্রতি দায়বদ্ধ থাকি, তবেই ডিজিটাল বিশ্ব আমাদের জন্য সত্যিকার অর্থেই জ্ঞানের একটি নির্ভরযোগ্য ভাণ্ডার হয়ে উঠতে পারবে।



ক্যাটাগরি: বিবিধ

         

  রেটিং: ০

এই বিভাগের আরও পোস্ট

মাদক-নির্ভরতা: অন্তহীন এক চক্র থেকে মুক্ত হতে পেরেছি

মাদক-নির্ভরতা: অন্তহীন এক চক্র থেকে মুক্ত হতে পেরেছি

  • অপু চৌধুরী|
  •  ২৫-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিবিধ

হাইস্পিড জীবন

হাইস্পিড জীবন

  • স্মৃতি রানী বর্মণ|
  •  ১৯-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিবিধ

কেন কুতথ্যের বদলে ছড়াব সুতথ্য?

কেন কুতথ্যের বদলে ছড়াব সুতথ্য?

  • আহমেদ শারজিন শরীফ|
  •  ০৪-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিবিধ

৩.৮

সামাজিক পক্ষপাতের ফাঁদ কীভাবে এড়ানো যায়?

সামাজিক পক্ষপাতের ফাঁদ কীভাবে এড়ানো যায়?

  • সুমাইয়া রহমান তুলি|
  •  ২২-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিবিধ

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।