বিবিধ

ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২৬: পর্ব এক — সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সুখপাখিটির খোঁজে


  • স্মৃতি রানী বর্মণ ও জাওয়াহ বিনতে মিজান স্বর্ণা,  |
  • প্রকাশ : ২৯ জুন ২০২৬, ০০:২৪
ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২৬: পর্ব এক — সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সুখপাখিটির খোঁজে
ছবি: এআই

সুখ বা হ্যাপিনেস (Happiness) অনেকটা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে ওঠা 'স্কিপ অ্যাড' বাটনের মতো। কখন সেই বাটনে চাপতে হবে, তা জানলে যেমন নিশ্চিন্তে ভিডিও দেখা যায়, তেমনি জীবনের সুখের মুহূর্তগুলো চিনতে পারলে জীবনও হয়ে ওঠে সহজ ও আনন্দময়।

ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট (World Happiness Report) (WHR) ২০২৬-এ এমনই এক বাস্তবতার কথা উঠে এসেছে। সুখ বা জীবনসন্তুষ্টি বলতে কী বোঝায়, কীভাবে তা পরিমাপ করা হয়, বিশ্বের কোন দেশগুলো সবচেয়ে সুখী, আর সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে তরুণ প্রজন্ম কতটা সুখী—এসব বিষয় বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে প্রতিবেদনে।

বৈশ্বিক সুখ সূচকে সুখ বলতে বোঝানো হয়েছে একজন মানুষ নিজের জীবনকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন। এ জন্য ব্যবহৃত হয় ক্যানট্রিল ল্যাডার (Cantril Ladder), যেখানে ০ থেকে ১০-এর মধ্যে নিজের জীবনকে একটি অবস্থানে রাখতে বলা হয়। বৈশ্বিক সুখ সূচক ২০২৬ অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপে তরুণদের সুখের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, একই সময়ে দ্রুত বেড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার।

প্রোগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট (Programme for International Student Assessment—PISA) পরিচালিত ৪৭টি দেশের ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে— 

১. যারা দিনে পাঁচ ঘণ্টার বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে, তাদের জীবনসন্তুষ্টি তুলনামূলকভাবে কম।

২. যারা দিনে এক ঘণ্টার কম ব্যবহার করে, তারা তুলনামূলকভাবে বেশি সন্তুষ্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কলেজ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা মূলত অন্যরা ব্যবহার করে বলেই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন; সুযোগ থাকলে অনেকে এটি ব্যবহার করতেন না। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইংরেজিভাষী দেশ ও পশ্চিম ইউরোপের বাইরে সুখ ও সোশ্যাল মিডিয়ার সম্পর্ক এতটা নেতিবাচক নয়।

প্রতিবেদনটি দেখায়, সুখ একটি জটিল ও বহুমাত্রিক বিষয়। তাই কার্যকর নীতিনির্ধারণের জন্য এ বিষয়ে আরও গভীর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

সুখ এবং সামাজিক মাধ্যম: প্রমাণ কী বলছে 

এবারের তালিকায় ফিনল্যান্ড ৭.৭৬৪ স্কোর নিয়ে শীর্ষে রয়েছে। এরপর রয়েছে আইসল্যান্ড, ডেনমার্ক, কোস্টারিকা ও সুইডেন। লাতিন আমেরিকার দেশ কোস্টারিকা প্রথমবারের মতো ৭.৪৩৯ স্কোর নিয়ে শীর্ষ সারিতে জায়গা করে নিয়েছে। অন্যদিকে আফগানিস্তান মাত্র ১.৪৪৬ স্কোর নিয়ে তালিকার সর্বনিম্ন স্থানে রয়েছে, যা সুখী ও অসুখী দেশের মধ্যে বিশাল ব্যবধানের চিত্র তুলে ধরে।

বাংলাদেশের অবস্থান ১২৭তম; দেশের স্কোর ৪.৩১৯।

২০০৬ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ৭৯টি দেশের অবস্থার উন্নতি হয়েছে, আর ৪১টি দেশের অবস্থার অবনতি ঘটেছে। উদাহরণ হিসেবে পূর্ব ইউরোপের সার্বিয়া ও বুলগেরিয়ার অগ্রগতির কথা বলা যায়। বিপরীতে, এশিয়ার আফগানিস্তান ও লেবাননের মতো দেশ পিছিয়ে পড়েছে।

প্রতিবেদনটি আরও দেখায়, সুখ কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ছয়টি বিষয়—সামাজিক সহায়তা, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা, দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ, সুস্বাস্থ্য, মাথাপিছু জিডিপি এবং দানশীলতা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানুষের পাশে মানুষ থাকাই সুখের সবচেয়ে বড় উৎস। পৃথিবীতে এখনও ইতিবাচক অনুভূতি, যেমন আনন্দ বা হাসি, নেতিবাচক অনুভূতির চেয়ে বেশি থাকলেও উদ্বেগ বা ওয়ারি (Worry) ধীরে ধীরে বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবও লক্ষণীয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা তুলনামূলক কম সময় ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, তারা সাধারণত বেশি সুখী। অন্যদিকে, যারা উদ্দেশ্যহীনভাবে স্ক্রল (Scroll) করেন বা দীর্ঘ সময় গেম খেলেন, তাদের সুখের মাত্রা কম। বর্তমানে অনেক কিশোর-কিশোরী নীল আলোর পর্দায় বন্দি হয়ে পড়ছে। তারা ভুলে যাচ্ছে, বাস্তব সমাজে তাদের অবস্থান ও সম্পর্ক ভার্চুয়াল লাইক (Like)-এর চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।

১৩৬টি দেশের মধ্যে ৮৫টিতে তরুণদের সুখের মাত্রা তুলনামূলক বেশি হলেও যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশে তরুণদের সুখের স্কোর গড়ে ০.৮৬ পয়েন্ট কমেছে। নারীরা সাধারণত পুরুষদের তুলনায় কিছুটা বেশি সুখী হলেও তাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপের হারও বেশি। অঞ্চলভেদে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো প্রত্যাশার তুলনায় বেশি সুখী, আর পূর্ব এশিয়া কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। 

প্রতিবেদনে ডিস্টোপিয়া (Dystopia) নামে একটি কাল্পনিক নিম্নতম মানদণ্ডের (স্কোর ১.১৬) সঙ্গে তুলনা করে দেখানো হয়েছে, প্রযুক্তির যুগে অনেক সুবিধা অর্জন করলেও মানুষ ক্রমেই একাকী হয়ে পড়ছে। 

সবশেষে বলা যায়, সুখ কোনো কাঁচের পর্দায় কিংবা অর্থের পাহাড়ে লুকিয়ে নেই। প্রকৃত সুখ রয়েছে বন্ধুর কাঁধে, পরিবারের হাসিতে এবং মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাসে। তাই সুখপাখির সন্ধান পেতে হলে প্রযুক্তির মরীচিকা থেকে মুখ তুলে মানুষের হৃদয়ের দিকেই তাকাতে হবে। 


ক্যাটাগরি: বিবিধ

         

  রেটিং: ০

এই বিভাগের আরও পোস্ট

মাদক-নির্ভরতা: অন্তহীন এক চক্র থেকে মুক্ত হতে পেরেছি

মাদক-নির্ভরতা: অন্তহীন এক চক্র থেকে মুক্ত হতে পেরেছি

  • অপু চৌধুরী|
  •  ২৫-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিবিধ

হাইস্পিড জীবন

হাইস্পিড জীবন

  • স্মৃতি রানী বর্মণ|
  •  ১৯-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিবিধ

কেন কুতথ্যের বদলে ছড়াব সুতথ্য?

কেন কুতথ্যের বদলে ছড়াব সুতথ্য?

  • আহমেদ শারজিন শরীফ|
  •  ০৪-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিবিধ

৩.৮

সামাজিক পক্ষপাতের ফাঁদ কীভাবে এড়ানো যায়?

সামাজিক পক্ষপাতের ফাঁদ কীভাবে এড়ানো যায়?

  • সুমাইয়া রহমান তুলি|
  •  ২২-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিবিধ

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।