সীমা একজন ১৫ বছর বয়সী কিশোরী। পরীক্ষায় ভালো ফল করায় উপহার হিসেবে সে একটি স্মার্টফোন পায়। এরপর থেকেই ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও টিকটকের মতো সমস্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার নিয়মিত বিচরণ শুরু হয়। ঘুম থেকে উঠেই ফোন চেক করা, বন্ধুদের সাথে সরাসরি দেখা-সাক্ষাৎ কমিয়ে মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আড্ডা দেওয়া এবং টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে ভিডিও বানিয়ে রাতারাতি তারকা বনে যাওয়ার খেয়াল তাকে পেয়ে বসে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেসবুক স্ক্রলিং, ইনস্টা রিলস কিংবা ইউটিউব শর্টস দেখা যেন তার জীবনযাত্রাকে আমূল বদলে দেয়। নিজের নিত্যদিনকার সব তথ্য সে সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করে এবং সেখানে পাওয়া গুটিকয়েক লাইক বা কমেন্টেই সে উদ্বেলিত হয়ে পড়ে।
তবে এক পর্যায়ে এসে এই অভ্যাস সীমার জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করে। বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের সাথে তার দূরত্ব তৈরি হয় এবং একাধিকবার অনলাইনে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। একের পর এক এমন নানা সমস্যা সীমাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরতে থাকে।
বৈশ্বিক সংকট ও ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টের মূল্যায়ন
ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২৬-এর তৃতীয় অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ সীমার মতো হাজারো কিশোর-কিশোরী ও তরুণ প্রজন্মের এই দুর্ভোগের চিত্রটিই তুলে ধরে। এটি কোনো একক ব্যক্তির সংগ্রাম নয়, বরং একটি বৈশ্বিক সংকট। গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ও ক্ষতিকর ব্যবহার স্থান-কাল-পাত্র ভেদে বিশাল পরিসরে বিস্তার লাভ করছে।
অপরিমিত স্ক্রলিং, ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতি, পর্নোগ্রাফি ও ভার্চুয়াল আসক্তি এখন আমাদের চিরায়ত সাংস্কৃতিক চর্চা, বিনোদন, খেলাধুলা, সম্মিলিত আড্ডা এবং সুস্থ জীবনযাপনকে প্রতিস্থাপিত করে চলেছে। এটি একটি গোটা প্রজন্মের সুখকে বিনষ্ট করে তাদের মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ করে তুলছে।
উত্তরণের উপায়
বিশ্ব সুখ রিপোর্ট তাই পরামর্শ দেয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহারকে শুধুমাত্র বিশ্বব্যাপী পারষ্পরিক সংযোগ স্থাপনের উদ্দেশ্যে সীমিত পরিসরে রাখা উচিত। তরুণ প্রজন্ম যদি এই প্রতিযোগিতামূলক ভার্চুয়াল জগৎ থেকে বের হয়ে সুস্থ বিনোদন, গান, বই পড়া, সিনেমা দেখা এবং বাস্তব জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলো উপভোগ করায় মনোনিবেশ করে, তবেই তাদের জীবনে প্রকৃত সুখের আগমন ঘটবে। বন্ধু ও পরিবারের সাথে কাটানো গুণগত সময় তরুণদের মানসিক বিকাশকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
বিশ্ব সুখ রিপোর্টের মূল বার্তাটি অত্যন্ত স্পষ্ট: সুখ স্ক্রিনের পর্দায় স্ক্রল করে খোঁজার বিষয় নয়; বরং বাস্তব জীবনে অনুভব করে বেঁচে থাকার মধ্যেই এর প্রকৃত স্বার্থকতা নিহিত।