বাঙালির কাছে শীতকাল হচ্ছে এক ধরনের সুখময় অপেক্ষা। বছরের বাকিটা সময় বাঙালিরা বলা যায়, নিজেদের শীতকালের জন্য প্রস্তুত করে। সত্যি বলতে কী, বাংলার গ্রাম তার ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি কিছুটা হলেও যেন ফিরে পায় শীতে। এবারের শীত আসতে এখনো কিছুটা দেরি আছে। তবু মনে হলো, আমাদের গ্রামের শীত নিয়ে একটু কিছু লিখি।
দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত নওগাঁ জেলার একেবারে পশ্চিমে, ভারতীয় সীমান্তসংলগ্ন পোরশা উপজেলার একটি গ্রাম কামারধা। সবুজে ঘেরা প্রকৃতির এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই গ্রাম। গ্রীষ্ম থেকে শুরু করে বসন্ত পর্যন্ত সব ঋতুতেই কামারধা সেজে ওঠে নিজস্ব সাজে। কিন্তু শীতকালে মনে হয়, নিজের সেরাটা দিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে এই গ্রাম।
কামারধায় কচি ঘাসের ওপরে জমে থাকা শিশিরবিন্দু সূর্যের রশ্মিতে মুক্তার মতো ঝলমল করে শীতে। সরিষা ফুলের গন্ধে ম-ম করে দিগন্তজোড়া মাঠ। সরিষা ফুলের হলুদ ক্ষেতে মৌমাছি উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য না দেখলে লিখে বোঝানো কঠিন।
শীতে এই গ্রামে মেলে কচি ধনেপাতার চপের সঙ্গে দুধ-চা, উনুনের পাশে বসে চিতই পিঠার সঙ্গে খেজুরের গুড়। খড়ের বিছানায় বসে যাত্রা-নাটকের মহড়া চলে এই গ্রামে।
কামারধায় শীতের আরেক আকর্ষণ হচ্ছে খেজুরের রস। সারারাত ধরে হাঁড়িতে রস টুপটুপ করে পড়ে। ভোরের দিকে হাঁড়ি ভর্তি হয় সুমিষ্ট রসে। একেবারে সকালে এই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় গুড়। সেই গুড়ের গন্ধ অসাধারণ, মনমাতানো। নতুন গুড় দিয়ে তৈরি হয় নানারকমের পিঠে-পুলি। তার সঙ্গে তো রয়েছে নতুন ধানের ধবধবে চালের গুঁড়া। সাধারণত এসব পিঠার গঠন ও ধরন আকর্ষণীয় হয়।
এখানে পড়ুন: জীবনের ছোট ছোট নির্যাস
শীতে শাকসবজিতে কামারধা গ্রামের মাঠ পুরোপুরি ভরে থাকে। লালশাক, পালংশাক, শিম, বরবটি, লাউ, টমেটো, পেঁয়াজ, রসুন এবং মূলাসহ নানা রকম সবজিতে মাঠের পর মাঠ ভরে থাকে।
শীতের মৌসুমে কামারধা গ্রামের সনাতন সম্প্রদায়ের মানুষ মুখিয়ে থাকেন পৌষসংক্রান্তির তিথির জন্য। নানান আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই পৌষসংক্রান্তি পালিত হয়। সাধারণত এর শুরুটা হয় আগের দিন রাত থেকেই। পাড়ার কিশোর-তরুণেরা আগের দিন রাতে বাড়ির বাইরে কাটানোর জন্য সন্ধ্যা থেকেই খড়ের বিছানা তৈরি করতে শুরু করে। মূলত খড়ের আঁটিগুলোকে একত্রিত করে এমন একধরনের বিছানা তৈরি করা হয়, যা শহুরে মোটা তোষকের বিছানাকেও হার মানাতে পারে।
পরের দিন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে সবার প্রথম কাজ হয়ে থাকে কনকনে শীতের মধ্যে পুকুরে গিয়ে স্নান করা। এই পর্ব শেষ করেই আসল মজায় সবাই মেতে ওঠে। পাড়ার সবাই মিলে আগের দিন একটি বিশাল আকারের খড়ের স্তূপ তৈরি করে রাখে। সকালে স্নানপর্ব শেষে সেই খড়ের স্তূপে আগুন জ্বালানো হয়। সবাই বসে আগুনের তাপ পোহায়। অনেকে বিশ্বাস করেন, এই তাপের মধ্য দিয়ে সব রোগবালাই দূর হয়ে যায়। সেই ছোটকাল থেকেই আমি ব্যক্তিগতভাবে এই স্বর্গীয় সুখ উপভোগ করে আসছি।
কামারধায় খুব বেশি খাল-বিল নেই। সে জন্য অতিথি পাখিদের আনাগোনা খুব একটা দেখা যায় না। তবে কামারধার আশপাশে বড় বড় বিল রয়েছে। সেসব বিলে অনেক পাখি আসে। রংবেরঙের পাখি দেখে মন ভরে যায়। পাখিদের কলকাকলিতে কামারধাও মুখরিত হয়।
এখানে পড়ুন: ইন্দ্র ও তার বন্ধুরা
কামারধা গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ কৃষিনির্ভর। শীতের শুষ্ক আবহাওয়া চাষাবাদে কৃষকের জন্য বিশেষ সুবিধা এনে দেয়। জমিতে পরিশ্রম করার পর খেজুরের রস আর গরম ভাত, কাঁচা মরিচ ও লবণের সহজ খাবার কৃষকদের ক্লান্তি দূর করে দেয়। এ এক সহজ-সরল সুখ, যা কামারধার কৃষকেরা অনুভব করতে পারেন।
এ সময় কামারধা গ্রামে আরেকটি মজার ঘটনা ঘটে। তখন পানি শুকিয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে মাছ শিকারের ধুম লেগে যায়। পুঁটি, মলা, ঢেলা, কাচকি, চিংড়ি, আইড়, মাগুর, শিংসহ নানারকম মাছ মেলে ডোবা-পুকুরে। মাছ যতই মিলুক না কেন, তার চেয়ে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে আনন্দ হয় বেশি।
সত্যি বলতে কী, কামারধায় শীত আসে বিপুল বৈচিত্র্য আর প্রাণপ্রাচুর্য নিয়ে। কামারধা গ্রামের মানুষ নিজেদের মতো করে প্রকৃতির পাঠানো উপহারগুলোকে সমাদর করেন।
এখানে পড়ুন: বোর্তে: চেঙ্গিস খানের ভালোবাসা