এক
কয়েক বছর আগের কথা। চাঁদ সেদিন পূর্ণিমা ছুঁইছুঁই। আগামী একটি বছর সুখ-সমৃদ্ধির প্রত্যাশায় দেবী দুর্গার বিসর্জন হয়েছে কয়েকদিন আগে। চারদিকেএকটা উৎসব উৎসব ভাব রয়ে গেছে এখনো। আমি ফালি দেওয়া এক মাটির রাস্তায় পা ফেলে ফেলে হাঁটছি। আমার পায়ে চটি। নিঃশব্দে, সাবধানে পা ফেলছি। যদি প্রকৃতির আয়োজন নষ্ট হয়ে যায়! এই ভয়ে। আমার ডানে-বাঁয়ে, উত্তর-দক্ষিণে বিস্তীর্ণ ধানখেত। ধানগাছের মাথায় থোকা থোকা ধানের শিষ, নাকি বলব থোক থোক স্বর্ণ! অগ্রহায়ণ আসন্ন। এখানে জনবসতি কম। শস্যের মাঠ লাগামছাড়া বিস্তীর্ণ।
এদিকে লাজহীন চন্দ্র তার মোলায়েম আলো দিয়ে কী এক অনাসৃষ্টি করে রেখেছে! তার ওপর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। জোনাকির আলো। অপার্থিব ব্যাপার-স্যাপার! এসব দেখতে দেখতে আমার মন খারাপ, আমার এখন মগজ খারাপ। আমার কোনো কিছুই এখন আমার হাতে নেই। আমি এখন প্রকৃতিতে মিশে গেছি। মূলত সারা জীবন এটাই হতে চেয়েছি আমি।
এখানে পড়ুন: ফুল তরু লতা ও আমার জীবন
দুই
রাশেদ আমার চাচাতো ভাই। বয়সে আমার ছোট। এক বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করে। খুব সুদর্শন, লম্বায় অমিতাভ বচ্চনের মতো। দেখতে সে এক কথায় অতি চমৎকার।
হঠাৎ একদিন রাশেদ অসুস্থ হলো। সাত দিনের মাথায় মারাত্মক অসুস্থ। জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় আনা হলো। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জানা গেল, তার শরীরে ক্যানসার বাসা বেঁধেছে। ডাক্তারের অভিমত, ক্যানসারের চিকিৎসা শুরু করার আগে রাশেদের বকেয়া কিছু শারীরিক সমস্যার সমাধান করতে হবে।
রাশেদকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। রাতে ওর সঙ্গে আমি থাকি। সারা রাত যন্ত্রণায় ঘুমাতে পারে না। মাঝেমধ্যে রাশেদকে জড়িয়ে ধরে থাকি আমি। রাশেদ নিজে কাঁদে, আমাকেও কাঁদায়। এভাবে বেশ কয়েক রাত চলে যায়। রাশেদকে ওর রোগ সম্পর্কে জানানো হয় না। এর মধ্যে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। আজ উন্নতি তো কাল অবনতি।
এক রাতে ডাক্তার জানালেন, রাশেদের অবস্থা সংকটাপন্ন। স্বজনদের অনুমতি পেলে তিনি চিকিৎসার প্রটোকল অনুসরণ করতে চান। ডাক্তারের গাম্ভীর্য ও মুখের অভিব্যক্তি দেখে আমরা বুঝতে পারলাম, হতে পারে আজ রাতই রাশেদের শেষ রাত। কত স্মৃতি মনে হতে লাগল আমার, রাশেদকে ঘিরে। সামান্য লাঠি লজেন্সেই কী খুশি হতো!
সারা রাত জেগে থাকলাম আর সৃষ্টিকর্তার কাছে রাশেদকে ভিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রার্থনা করলাম। মুহুর্মুহু ফোন আসে। সবাই রাশেদের খবর জানতে চায়। হাসপাতালে উপস্থিত কারও মুখেই কোনো কথা নেই। আমাদের সময় থমকে দাঁড়াল। দম বন্ধ অবস্থা। পরদিন অপরাহ্ণে ডাক্তার জানালেন, রাশেদের অবস্থার উন্নতি হচ্ছে, ওর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা আছে। আমার চোখ থেকে জল পড়ছেই, পড়ছে।
তিন
কক্সবাজার যাচ্ছি কাজে। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাস। ঢাকা থেকে বের হওয়ার পথে যাত্রাবাড়ীর হানিফ ফ্লাইওভারে মহাজ্যামে আটকে গেলাম। আটকে গেলাম তো আটকে গেলাম। বের হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। চুপচাপ থাকলেও সবার মুখে বিরক্তির ছাপ। যাহোক, সবকিছুরই একটা শেষ থাকে। আমরাও একসময় জ্যামের চক্র থেকে বের হলাম।
সোনারগাঁয়ে পৌঁছে এক রেস্তোরাঁয় নাশতা-পানি সেরে কিছুটা ঠিকঠাক হলাম। দুপুরে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে, বড় পুকুরের সঙ্গে লাগানো অনেকগুলো ছোট ছোট হোটেলের একটিতে হাঁসের মাংস দিয়ে ভাত খেলাম। পরে খেয়াল করলাম, সেখানে সারি করে ট্রাক রেখে ড্রাইভার-হেলপাররা হেব্বি খাওয়াদাওয়া করছে। দাম হাতের নাগালে থাকলে আর কী! তবে তরকারির ঝাল লাগামছাড়া।
চলতে চলতে একসময় কর্ণফুলী নদীর কাছাকাছি পৌঁছালে আমাদের গাড়িচালক বললেন, ‘ভাই, আমরা কর্ণফুলী টানেল দিয়ে যাব, নাকি ব্রিজ দিয়ে যাব?’ আমাদের দলনেতার নির্দেশ পেয়ে আমাদের গাড়ি ছুটল টানেলের দিকে।
প্রশস্ত, মনোরম রাস্তা ধরে আমরা টানেলে প্রবেশ করলাম। ঢোকার আগে মনে হলো, আমরা যেন গাড়িসমেত কর্ণফুলীতে ডুব দিচ্ছি। শিহরিত হলাম। টানেলের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় কোনোভাবেই বোঝার উপায় নেই যে আমরা কর্ণফুলী নদীর অনেক নিচ দিয়ে চলছি। বাংলাদেশে বসে ধনী দেশের বন্দোবস্ত ভোগ করছি। ভালো লাগবে না তো কী!
এখানে পড়ুন: সাবাতিনা, তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও?