সাময়িকী

আমার কিশোরীকাল: এক


  • মনোয়ারা রুপা  |
  • প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০০:০৬
আমার কিশোরীকাল: এক
ছবি: আল মামুন খান এমিল

আমার তখন হাইস্কুলকাল। সত্তরের দশকের শেষের দিক।

খালপাড় ধরে স্কুলে যাচ্ছি। দেখি সারি সারি নৌকা। বেদেরা আসছে খালে। প্রতি বর্ষায় বেদেরা আসে রং-বেরঙের কারুকাজ করা নৌকা নিয়ে। একেকটা নৌকা একেক রকম রহস্যভরা মনে হয় আমার কাছে। বেদেদের জীবন-জীবিকায় আমার খুব কৌতূহল। আজ আর স্কুলে যাচ্ছিনা। খালপাড়ে বসে পড়ি। বেদেদের সংসার দেখি। নৌকার মধ্যে ছোট ছোট কোঠা। কোঠাগুলো কেমন? কীভাবে তারা ঘুমায়? খুব জানতে ইচ্ছে করে আমার।

বেদেরা গ্রামে গ্রামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে লোক ব্যবসা করে। কেউ শিঙ্গা দেয়, দাঁতের পোকা ঝাড়ে, ঝাড়ফুঁক-তন্ত্রমন্ত্র কত কিছু যে করে তারা। কেউ আবার কাঁচের থালাবাসন বেচে। পুরুষরা সাপের খেলা দেখায়। পাখি শিকার করে। একজন দেখি বউকে মার দিচ্ছি। কিছুক্ষণ পর আবার দুজনে নৌকার ভেতর যায়। আবার হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসে। সহজ-স্বাভাবিক তাদের জীবন। আমি চেয়ে চেয়ে দেখি। বেদেদের জীবন আমার কাছে লাগে সারল্য আর সুন্দরে ভরা।

সকালে এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে। চারিদিক বর্ষার পানিতে টইটম্বুর। আমাদের গ্রামটাকে মনে হচ্ছে সদ্যস্নাতা চুলছাড়া এক অন্তঃসত্ত্বা নারী। 

বেদে মেয়েরা গায়ে পড়ে কথা বলে না। আমি যেচে কথা বলতে যাই। খুব একটা সাড়া পাই না। একটা কথা জিজ্ঞাসা করলে একটাই উত্তর দেয়। একজনের সাথে একটু একটু কথা হয়। তার নতুন বিয়ে। সেজন্য সে নৌকায় থাকে। তাদের কাপড় পরা অন্য রকম। শরীর ঢেকে যায় কিন্তু দেহের গঠনটা সুন্দর করে ফুটে ওঠে। মেয়েটা দেবী দুর্গার মতো। বেদে মেয়েরা মনে হয় দেহটাকে ঈশ্বরের দান মনে করে। সেজন্যই তারা এত সুন্দর কি! কে জানে? এদের খিলখিল হাসিতে ভরা বর্ষার প্রকৃতিও বুঝি হেসে ওঠে। 

খালপাড়ে বসে আমি চেয়ে থাকি। বাজারের পথের ছেলেদের দিকে বেদেমেয়ের একটু বাঁকা করে তাকানো, বেণি দোলানো সবই কেমন প্রকৃতির সাথে মিলে যায়। 

সারাটা দিন কেটে যায়। বিকেল গড়িয়ে এখন সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আমি বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকি। স্কুলে যাইনি; কী যে বলব বাড়িতে! 

এখনো কাচারিঘরে হারিকেন দেয়নি। আমরা ছোটরা হারিকেন জ্বালি, লজিং মাস্টার সাবের খাবার রেডি করি। অন্ধকারে হারিকেন নিয়ে ঘাটে যাই। আজ আমার মাস্টারকে খাবার দেওয়ার পালা না। তবে আমার ছোট ভাই মানিক জানে সে না দিলে আমি কাজটা করে দেব।

আমাদের বাড়ির ম্যানেজার হাটে গেছেন। প্রতি শনিবার বাজার তারিখ। বাকিরা বাড়ির পাশের দোকানঘরে। ভাইয়ারা স্কুলের মাঠে। লজিং স্যারকেও দেখছি না।

সন্ধ্যা গড়ানোর সাথে সাথে আমাদের কাচারি লোকজনে ভরে যায়। আমাদের পাশে হিন্দু বাড়ি। তাদের পেশা মাছ ধরা। আমাদের বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় তাদের নৌকা বাঁধা থাকে। বর্ষাকালে তাদের রাস্তা ডুবে যায়, আমাদের বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় নৌকা রেখে তারা জাল পাহারা দেয়। মাছ ধরে। সেই মাছ বাজারে বিক্রি করে। সন্ধ্যায় বাজার করে এখান থেকে নৌকা দিয়ে বাড়ি যায়। বর্ষাকালে সকালে তারা আমাদের কাচারি ঘরে বসে। সন্ধ্যায় বাজার করে এসেও অনেক সময় বসতে হয় বৃষ্টির জন্য। মাঝে মাঝে বৃষ্টি শুরু হলে থামতে চায় না। ধনা কাকা, বেনু কাকা, কানু কাকা বসে বসে বিড়ি খায়। তারা লুকিয়ে বিড়ি খায়না; সবার সামনেই খায়।

কাচারিতে গল্পের আসর সাধারণত শুরু হয় আশেপাশের ভূতেদের নিয়ে। কার বাড়ির তালগাছে ভূত দেখা গেছে, ভূতের সাইজ কত বড় এসব। আমাদের মাস্টার এমন ভূতের গল্প বলত যে ভয়ে রাতে ঘুমাতে পারি না। গল্পের তালে কোনো কোনো দিন তো আমাদের পড়া দিতে ভুলে যান স্যার। পড়া না দিলে কী যে শান্তি, আহা! মনে মনে বলতাম প্রতি রাতে যদি এভাবে বৃষ্টি আর ভূতের গল্প হতো দারুণ হতো।

আজকেও প্রতিদিনের মতো সাত-আটজন বসা। আমরা ভাইবোনরা, আমাদের মাস্টার। হিন্দু বাড়ির কাকারা আছেন ক’জন। এখন বৃষ্টি-বাদল নেই। তাও এরা কিছুক্ষণ বসবে, আশপাশের হালচাল নিয়ে দু-চার কথা বলবে। খুব সাধারণ কথা, কোনো রাজনীতি নয়, কোনো টাকাপয়সা নয়। সব নিজেদের নিয়ে। কোথায় ভূত দেখেছে গতকাল রাতে, তার আকৃতি কেমন ছিল। কোনো গাছের তাল তিতা নয়। এরা খুব ধীর-স্থির। কোনো তাড়া নেই, কোনো দৌড় নেই।

 আমাদের বাড়ির পূর্ব পাশে হিন্দুদের চিতা ছিল এক সময়। আমাদের বাড়িটা হিন্দু বাড়ি ছিল এক আমলে। সবসময় ভূতের গল্প শুনতে শুনতে আমার মনে হয় ভূত বুঝি আমার পেছনে পেছনে হাঁটে। আমি অদেখা ভূতের ভয়ে মাঝেমধ্যে এমন দৌড় দিই, মনে হয় এই বুঝি ভূতবাবাজী আমাকে ধরে ফেলছে।

দশটা বাজলে আমাদের পড়া শেষ। অনেক সময় মা আমাদের এগিয়ে নিতে আসে। কাচারির দুপাশে জঙ্গল, ঝিঁঝি পোকা আর, ব্যাঙের ডাক, আরো কত পোকামাকড়ের ডাক।

বিছানায় শুয়ে আবার আমি বেদেদের নিয়েই ভাবি। সাধারণ কত কিছু অসাধারণ হয় নিজেদের সহজ-সরল চিন্তা-চেতনায়। আমাদের সভ্য সমাজের আধুনিকতার চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক এই বেদেদের চিন্তা-চেতনা, তাদের দৈনন্দিন গৃহস্থালি। নিত্য মারামারি, কোলাহল; আবার কীভাবে ছোট নৌকা-ঘরে তারা মিলেমিশে থাকে আপন স্বার্থ ভুলে। এইরকমই হওয়ার কথা আমাদের সকলের। 

কখন ঘুমিয়ে পড়েছি। মেজ আপার কোরআন পড়ার শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। কী মধুর কোরআনের সুর। মন এবং শরীরকে নমনীয় করে দেয়। একটা প্রশান্তি মেলে। 

বাবার একটা খারাপ সময় যাচ্ছে। বিষয়-সম্পত্তির ব্যাপার হবে। খুব মন খারাপ। আনমনে বিছানার এক কোণে বসে কিছু ভাবছে বাবা। আমার বাবার জীবনটা অনেক কষ্টের। আমি যদি লেখক হতাম তার জীবনী নিয়ে বড় একটা বই লিখতাম। সকাল সকাল বাবার করুণ মুখটা দেখে মন খারাপ হয়ে গেল। একদিন রাজত্ব ছিল, আজ কিছু নেই। বাবার জন্য মায়া হয়।

স্কুলে যেতে দোকান পার হয়ে যেতে হয়। মা বলল, খেয়ে যা। তাড়াতাড়ি বের হয়ে এসেছি না খেয়ে। যদি নৌকাগুলোর কাছে কিছুক্ষণ বসতে পারি। স্কুলে যেতেই হবে আজ। দুইদিন যাইনি। জানাজানি হলে বিপদ। দোকানের সামনে দিয়ে যেতে যেতে এখানে বসা মানুষদের আমি চেহারা না দেখে অনুমানে বুঝতে পারি এরা সবাই সুখী। চা খাওয়া, গল্প-গুজব করা এ পর্যন্তই। এদের বহুবাসনা নেই। কোনো তাড়া নেই।

খালপাড়ে এসে দেখি অনেক নৌকা চলে গেছে। একটা নৌকার গলুইয়ের উপর এক বেদে তার বউয়ের পা ধুইয়ে দিচ্ছে। মেয়েটার বাচ্চা হবে বোঝা যাচ্ছে। লোকটা কত আদর করে তার পা স্পর্শ করছে। এই নৌকা, এই খাল, এই ভরা বর্ষার চারিদিকের সৌন্দর্য। এখানেই বেদে স্বামীর ভালোবাসা প্রকাশ করার উপযুক্ত সময়। স্বামী বউয়ের পেটে হাত রেখে কিছু বুঝতে চায়। আমার মধ্যে একটা শীতল অনুভূতি হয়। 

এরা আজ বা কাল নয়তো পরশু হয়তো চলে যাবে। দূরে কোথাও। এ ঘাট থেকে অন্য ঘাটে। আমার সাথে তাদের কোনো যোগ নেই। তবু কি এক টান অনুভব করি এদের জন্য। কেন কে জানে! হতে পারে কোনো এককালে আমরাও হয়তো যাযাবর ছিলাম। 


ক্যাটাগরি: সাময়িকী

         

  রেটিং: ৪.৯

এই বিভাগের আরও পোস্ট

ফুল তরু লতা ও আমার জীবন

ফুল তরু লতা ও আমার জীবন

  • খালেদ হাসান শান্ত |
  •  ২৫-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৫

সাবাতিনা, তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও?

সাবাতিনা, তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও?

  • সুমাইয়া রহমান তুলি|
  •  ২১-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৪

বিশ্বের প্রথম নারী সরকারপ্রধানদের পথচলা

বিশ্বের প্রথম নারী সরকারপ্রধানদের পথচলা

  • জীবনজয়ী ডেস্ক|
  •  ১৫-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৫

আমার সেরা তিনটি দিন

আমার সেরা তিনটি দিন

  • ইসমাইল সাব্বির|
  •  ১২-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৫

আমার মেয়েবেলা

আমার মেয়েবেলা

  • মৌমিতা সেন |
  •  ০৯-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

০

পুরুষশাসিত চীনে যেভাবে হলো এক নারীর উত্থান

পুরুষশাসিত চীনে যেভাবে হলো এক নারীর উত্থান

  • জীবনজয়ী ডেস্ক |
  •  ০৪-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৩.৭