নব্বইর দশক পর্যন্ত বাংলাদেশের শিশু-কিশোর, এমনকি অসংখ্য বড় মানুষের মিস–করা–যাবে–না–এমন টিভি অনুষ্ঠানের মধ্যে ‘দ্য থ্রি স্টুজেস’ ছিল অন্যতম। তিন মার্কিন কৌতুকাভিনেতার হাসির ও হাস্যকর কাণ্ডকারখানা নিয়ে তৈরি এই শো দেখতে-দেখতে হাসতে-হাসতে লুটোপুটি খাওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। নব্বইয়ের একেবারে শুরুতে মিস্টার বিন আসার পরে তিন স্যাঙাত, মনে হয়, কিছু বছর একটু আড়ালে পড়ে গিয়েছিলেন। ২০০৫ সালে ইউটিউব চালু হলে স্টুজ মহাশয়েরা আবার প্রবল প্রতাপে ফিরে আসেন। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, ইউটিউব এবং থ্রি স্টুজেস ডট নেটসহ বিভিন্ন সূত্রের আলোকে নিচে পড়ুন জীবনজয়ী প্রতিবেদন।
ইতিহাসের পাতায় থ্রি স্টুজেস
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তথ্যমতে, ‘দ্য থ্রি স্টুজেস’ কেবল একটি কমেডি দল নয়, বরং এটি মার্কিন জনপ্রিয় সংস্কৃতির ইতিহাসে একটি স্থায়ী অধ্যায়। ১৯২০-এর দশকে হাস্য-রঙ্গ-তামাশার ভডভিল অনুষ্ঠানের মঞ্চ দিয়ে তাদের যাত্রা শুরু হয়। সেই সময়ে মঞ্চে শরীরী কৌতুক দেখিয়ে দর্শকদের হাসানোই ছিল তাদের মূল শক্তি।
১৯৩৪ থেকে ১৯৫৯ সালের মধ্যে থ্রি স্টুজেস কলাম্বিয়া পিকচার্সের জন্য প্রায় ১৯০টির মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এই শর্ট ফিল্মগুলো খুব বড় ছিল না, কিন্তু প্রতিটি দৃশ্য ছিল নিখুঁত টাইমিং আর লাগামহীন হাসিতে ভরা।
দলের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও স্মরণীয় তিন সদস্য ছিলেন মো হাওয়ার্ড, ল্যারি ফাইন এবং কার্লি হাওয়ার্ড। পরবর্তীতে কার্লির অসুস্থতার কারণে শ্যাম্প হাওয়ার্ড, জো বেসার এবং কার্লি জো ডেরিটা বিভিন্ন সময়ে দলে যুক্ত হন। তবু দর্শকদের মনে ‘মো-ল্যারি-কার্লি’ যুগই থ্রি স্টুজেসের সেরা সময় হিসেবে গেঁথে আছে।
স্ল্যাপস্টিক কমেডির তিন রাজা
থ্রি স্টুজেসের হাস্যরস ছিল মূলত ‘স্ল্যাপস্টিক কমেডি’, অর্থাৎ কথা কম, শরীরী কাণ্ডকারখানা বেশি। এই কৌতুক ছিল বাস্তবের বাইরে, অনেকটা কার্টুনের মতো, তাই মারধর থাকলেও সেখানে ব্যথা নয়, শুধু হাসিই ছিল।
আই পোকিং তথা একজন আরেকজনের চোখে আঙুল দিয়ে গুঁতো দেওয়া ছিল তাদের সিগনেচার মুভ। এছাড়াও ছিল অতিরঞ্জিত নড়াচড়া; যেমন: কার্লির হঠাৎ মাটিতে গড়িয়ে পড়া, মো-এর রেগে যাওয়া চেহারা, আর ল্যারির অদ্ভুত চুল ও চোখের ভাষার অনন্য মিশ্রণ। আর সাউন্ড ইফেক্টের জাদুতে তো প্রতিটি থাপ্পড় বা ধাক্কার মতো সাধারণ মারধরের মুহূর্তও দমফাটা হাসিতে বদলে যেত। এই কারণেই শিশু থেকে বড় সবাই একসঙ্গে থ্রি স্টুজেস দেখে হাসতে পারত।
যুগের রদবদল, অতঃপর ইউটিউব যুগে প্রত্যাবর্তন
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ‘মিস্টার বিন’ বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠলে সাদাকালো যুগের থ্রি স্টুজেস কিছুটা আড়ালে চলে যায়। তবে এটি স্থায়ী ছিল না। ২০০৫ সালে ইউটিউব চালু হওয়ার পর সেই পুরোনো হাসি নতুন প্রাণ ফিরে পায়।
অফিশিয়াল ‘দ্য থ্রি স্টুজেস’ ইউটিউব চ্যানেলে পুরোনো শর্ট ফিল্ম, কালারাইজড ভিডিও ও ক্ল্যাসিক দৃশ্য আপলোড হওয়ায় নতুন প্রজন্ম তাদের আবিষ্কার করে। ডায়ালগ না বুঝলেও থ্রি স্টুজেসদের ভাবভঙ্গি দেখলেই বোঝা যায় তারা কী বলছে। এজন্য অ-ইংরেজিভাষী দুনিয়াতে দর্শকদের কাছে তিন স্যাঙাত আবার জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। আজও ইউটিউবে তাদের চোখে আঙুল ঢোকানো, পাগলাটে কাণ্ডকারখানা, আর সপাট চড়-থাপ্পড় দেখে হেসে খুন হচ্ছে বাচ্চা ও বুড়োরা।
জীবনজয়ী হাসি
থ্রি স্টুজেস আমাদের শিখিয়েছে্ন, জীবন যতই কঠিন হোক না কেন, একটু বোকামি আর নিখাদ হাসি মানুষকে টিকে থাকতে সাহায্য করে। বাংলাদেশে বিটিভির সাদাকালো পর্দা থেকে শুরু করে আজকের স্মার্টফোনের স্ক্রিনে স্টুজেসদের আবেদন আজও একটুও কমেনি। তারা প্রমাণ করেছেন, খাঁটি হাসির কোনো সময়সীমা নেই। যুগ বদলায়, মাধ্যম বদলায়, কিন্তু থ্রি স্টুজেসের হাসি রয়ে যায় ঠিক আগের মতোই।