স্বর্ণেন্দু দত্ত। কলকাতাভিত্তিক গবেষক ও সাংবাদিক। ২০২৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে তার বই "অযোধ্যার বিনির্মাণ: সমন্বয় থেকে একাধিপত্য"। বস্তুনিষ্ঠতার স্বীকৃতিস্বরূপ এই বইয়ের জন্য পেয়েছেন মুজফফর আহমদ স্মৃতি পুরস্কার। বইটি লেখার সূত্রে টানা এক দশকজুড়ে অযোধ্যায় যাওয়া-আসা করেছেন স্বর্ণেন্দু দত্ত। সময় নিয়ে সেখানে থেকেছেন। ফলত অযোধ্যার সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সুধী সমাজের সঙ্গে তার ওঠাবসা হয়েছে। এই সংসর্গের সুবাদে স্বর্ণেন্দু দত্ত দেখা পেয়েছেন হিন্দু-মুসলিমে নিবিড় সম্প্রীতিময় এক জগতের। অযোধ্যা নিয়ে ভারতবর্ষ তথা উপমহাদেশজুড়ে সাম্প্রদায়িকতার প্রচুর বিষবাষ্প ছড়ালেও, খোদ অযোধ্যাবাসীর বড় অংশটি ঘৃণার সংস্কৃতিতে বসবাস করেন না। এই হচ্ছে স্বর্ণেন্দু দত্তের অনুধাবন। জীবনজয়ীর জন্য স্বর্ণেন্দু দত্তের লেখায় এই অনুধাবনের একটা চিত্র পাবেন পাঠক।
গত ১ জুন ২০২৬ প্রকাশিত হয়েছিল স্বর্ণেন্দু দত্তের ‘হাসিম চাচা আর রামচন্দ্র: এক রিকশায় বাদী-বিবাদী’ (পড়তে এখানে ক্লিক করুন)। আজ প্রকাশিত হলো তাঁর দ্বিতীয় লেখা। পড়ুন নীচে।
অগ্রহায়ণ মাসের শুরুতে সরযূ তীরের জনপদে জাঁকিয়ে শীত পড়েছে, ঠান্ডা যেন একেবারে হাড়ের ভেতরে লাগে। তার মধ্যে রামের বিয়ে নিয়ে ব্যস্ততা অযোধ্যার রসিক সম্প্রদায়ের মন্দিরে মন্দিরে। অযোধ্যার চারটি বড় উৎসবের একটি ‘রামবিবাহ’ অর্থাৎ রামের বিয়ে। শ্রাবণ মাসে হয় ঝুলা উৎসব। অনেকটা বাংলার ঝুলনের মতো। অযোধ্যার সমস্ত মন্দির থেকে বিগ্রহ নিয়ে আসা হয় মণি পর্বতের প্রাঙ্গণে। সেখানে dোলনায় বসানো হয় মূর্তিগুলি। মস্ত মেলা বসে সেই সময়। তারপর বিগ্রহ ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে মন্দিরে মন্দিরে বেশ কয়েক দিন ধরে চলে উৎসব। অন্য তিনটির মধ্যে একটি কার্তিক পূর্ণিমায় সরযূতে স্নান। মূলত পূর্ব উত্তর প্রদেশ আর লাগোয়া বিহারের দেহাতি গরিবের ভিড় হয় পুণ্যার্জনের স্নানে। রামের জন্মদিন বা রামনবমী তো অবশ্যই বড় উৎসব। আর চতুর্থটি এই রামবিবাহ।
মন্দিরে থাকা অল্পবয়সী ছেলেরাই রাম-সীতা, ভরত-লক্ষ্মণ-শত্রুঘ্ন ইত্যাদি সাজে। রাজরাজাদের মতো বানানো পোশাক, সাজগোজ করানো হয়। যে মন্দির যত বিত্তবান, তাদের আয়োজনে তত জৌলুস। হাতি, ঘোড়া, রথ সবই আসে বিয়ের এই উৎসবে। সীতার বাপের বাড়ি জনকপুর, মিথিলা থেকেও আসে কন্যাপক্ষ, বিয়ের তত্ত্ব নিয়ে। সব মিলিয়ে হুলুস্থুল আয়োজন।
বছর দশেক আগে সেবার রামের বিয়ে নিয়ে অযোধ্যায় দারুণ সংকট। মাসখানেক আগেই ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে’ পাঁচশো-হাজার টাকার নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। দিনে ২ হাজার টাকার বেশি নগদ তোলার সুযোগ নেই। তার মধ্যেই এসে পড়েছে রামের বিয়ে। ভক্তরা মন্দিরে প্রণামী দেন নগদে। মন্দিরে মন্দিরে সব কাজও চলে নগদেই। ভক্ত বা মন্দির কারও হাতেই টাকা নেই। টাকার সংকটে জেরবার মন্দিরের সাধুসন্তদের মাথায় হাত রামের বিয়ে নিয়ে। চার-পাঁচ দিনের অনুষ্ঠান। নানা প্রান্ত থেকে আসা লোকজনের থাকা-খাবারের বন্দোবস্ত করতে হয়। এই আয়োজন হবে কীভাবে!
অযোধ্যা আর আশপাশের দোকানদার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সহযোগিতাতেই সেবার উতরে গিয়েছিল রামবিবাহ। তাঁদের একজন ছিলেন আনিস মিঞা। অযোধ্যার এক মন্দিরে রামের বারাত বা বরযাত্রার জন্য ঘোড়ার গাড়িটা এনেছিলেন তিনিই। টাকার প্রশ্ন ওঠায় বলেছিলেন, ‘‘টাকা আজ না হয় কাল মিলবে। রামজির বিয়ে তো আটকে রাখা যাবে না। বারাত আমার গাড়িতেই যাবে। ’’ অর্থসংকটে থাকা কোনো পরিবারের পাশে যেভাবে দাঁড়ায় প্রতিবেশীরা, সেইভাবেই অযোধ্যা সেবার দেখেছিল রামের বিয়ে। তবে অন্য বছরের থেকে জৌলুসে ছিল ম্রিয়মাণ।
আনিসের ঘোড়ার গাড়িকেই রথের মতো সাজিয়ে তাতে রাম-সীতার সাজে থাকা কিশোরদের নিয়ে নগর পরিক্রমা শুরু হয়েছিল। পিছনে পায়ে পায়ে ভক্তরা। চার দিন ধরেই হয়েছিল অনুষ্ঠান। আনিসের ঘোড়ার গাড়িতে রামের বারাত যাওয়া অযোধ্যায় কিছু অস্বাভাবিক ছিল না। অযোধ্যার হাজারো মন্দিরে বছরভর যে ফুলমালা লাগে, তার বড় অংশ আসে আশপাশের মুসলিমদের খেত থেকেই। মঠ-মন্দিরে বিগ্রহের যে রঙবেরঙের পোশাক, তার একটা বড় অংশ তৈরি করেন মুসলিম মা-বোনেরাই। এখন অযোধ্যার সাধুরা আর খড়ম পরেন না। একটা সময় পর্যন্ত এই খড়মও তৈরি করতেন মুসলিম কারিগররাই।
এমনকি মন্দিরের পুজোর কাজে হাত লাগায় মুসলমান, সে উদাহরণও আছে। অযোধ্যার রামকোট এলাকার পরিচিত সুন্দর ভবন মন্দির। সেখানের ম্যানেজার ছিলেন চুন্নু মিঞা। কখনও কখনও এমন হয়েছে, আরতির সময়ে মন্দিরে পুরোহিত ছাড়া অন্য কেউ নেই। কাঁসর না বাজিয়ে আরতি হবে কীভাবে! তাই চুন্নু মিঞা কাঁসর বাজাচ্ছেন আর পুরোহিত আরতি করছেন— এই দৃশ্য দেখেছেন ভক্তরা। এই নিয়ে প্রশ্ন করায় পুরোহিত বলেছিলেন, ‘‘শ্রী ভগবান কি বলেছেন মুসলমান কাঁসর বাজালে আমি আরতি নেব না!’’
উল্টোটাও দেখেছে অযোধ্যা। হনুমান মন্দিরের মোহন্ত জ্ঞান দাস অন্য সাধুদের নিয়ে স্থানীয় দরগায় চাদর চড়াতে যান। এমনকি মন্দির পরিসরের বাইরে তিনি রোজার সময়ে ইফতারের আয়োজনও করেছেন।
অওধের প্রথম নবাব সাদাত খান এক বর্ষায় ফারুকাবাদ থেকে নৌকোয় গঙ্গা পার হচ্ছিলেন, মাঝনদীতে একটা মাছ লাফিয়ে তাঁর কোলে এসে পড়ে। তাঁর মনে হয়েছিল এটা শুভ সংকেত। যে মাছটা কোলে এসে পড়েছিল সেটার অবশেষ সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন কোষাগারে। অওধের শেষ নবাব ওয়াজেদ আলী শাহের সময় পর্যন্ত সেটা কোষাগারেই ছিল। তাই অওধের নবাবী আমলের সমস্ত স্থাপত্য সেটা লক্ষ্ণৌয়ের ইমামবাড়া হোক বা অযোধ্যার মন্দির— সর্বত্র দেখা মেলে মাছের। যেসব মন্দিরে নবাবী দান নেই সেখানেও আছে মাছের ছবি।
ফৈজাবাদ-অযোধ্যার সমাজকর্মী খালিক আহমেদের কথায়, মন্দিরে মন্দিরে মাছের প্রতীক আদতে অযোধ্যার সংস্কৃতির চিহ্ন। যা গঙ্গা-যমুনী তহজীব নামেই বেশি পরিচিত। তাই নবাবদের দান নেই এমন মন্দিরেও মাছের প্রতীক আছে অযোধ্যায়। এটা পারস্পরিক সৌহার্দ আর মঙ্গলকামনার প্রতীক। এত কিছু ধ্বংসের পরেও তা রয়েছে অযোধ্যার মানুষের মনে।