অসাধারণ সাধারণেরা

অযোধ্যায় হাসিম চাচা আর রামচন্দ্র: এক রিকশায় বাদী-বিবাদী


  • স্বর্ণেন্দু দত্ত  কলকাতা |
  • প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৬, ২২:০৫
অযোধ্যায় হাসিম চাচা আর রামচন্দ্র: এক রিকশায় বাদী-বিবাদী
ছবি: এআই

[স্বর্ণেন্দু দত্ত। কলকাতাভিত্তিক গবেষক ও সাংবাদিক। ২০২৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে তার বই "অযোধ্যার বিনির্মাণ: সমন্বয় থেকে একাধিপত্য"। বস্তুনিষ্ঠতার স্বীকৃতিস্বরূপ এই বইয়ের জন্য পেয়েছেন মুজফফর আহমদ স্মৃতি পুরস্কার। বইটি লেখার সূত্রে টানা এক দশকজুড়ে অযোধ্যায় যাওয়া-আসা করেছেন স্বর্ণেন্দু দত্ত। সময় নিয়ে সেখানে থেকেছেন। ফলত অযোধ্যার সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সুধী সমাজের সঙ্গে তার ওঠাবসা হয়েছে। এই সংসর্গের সুবাদে স্বর্ণেন্দু দত্ত দেখা পেয়েছেন হিন্দু-মুসলিমে নিবিড় সম্প্রীতিময় এক জগতের। অযোধ্যা নিয়ে ভারতবর্ষ তথা উপমহাদেশজুড়ে সাম্প্রদায়িকতার প্রচুর বিষবাষ্প ছড়ালেও, খোদ অযোধ্যাবাসীর বড় অংশটি ঘৃণার সংস্কৃতিতে বসবাস করেন না। এই হচ্ছে স্বর্ণেন্দু দত্তের অনুধাবন। জীবনজয়ীর জন্য স্বর্ণেন্দু দত্তের লেখায় এই অনুধাবনের একটা চিত্র পাবেন পাঠক।]

প্রায় দেড় দশক আগে এক নির্বাচনের সময়ে প্রথম দেখা অযোধ্যাকে। উত্তর প্রদেশের মত বিশাল রাজ্যের পূর্বপ্রান্তের এক কোনায় ছোট্ট এক জনপদ। মূলত গ্রামীণ এলাকা। পৌরসভার হলেও, অযোধ্যাকে শহর বলার থেকে বড় আকারের গঞ্জ বলাই শ্রেয়। অন্তত সেই সময়ের নিরিখে। বাসিন্দাদের অধিকাংশ গরিব, অতি গরিব। এরা জীবিকার জন্য মন্দির-নির্ভর আর্থিক কর্মকাণ্ডের উপরে অনেকাংশে নির্ভরশীল। মন্দির-মসজিদ নিয়ে বিতর্ক, হিংসা, পাঁচশো বছরের পুরনো এক স্থাপনা ভেঙে ফেলা, তাকে ঘিরে আবারও হিংসা-রক্তপাত-মৃত্যু। অযোধ্যা শুনলে মনে হত যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র। মনে হত এখানে হিন্দু-মুসলিম পরস্পরের মুখ দেখে না, পাশাপাশি থাকে না। সুযোগ পেলেই মেতে ওঠে হিংসায়, জড়িয়ে পড়ে সংঘাতে।

ঘটনাক্রমে অযোধ্যা দেখানোর দায়িত্ব নিলেন এক তরুণ সাধু। শীতের মরসুম শেষে পরনে গেরুয়া ধুতি-চাদর, কপাল ভর্তি চন্দন। বাইক সওয়ারিকে সাধু দশরথের ভবন, কৈকেয়ীর বাড়ি, কনক ভবন আরও নানা মন্দির ঘুরিয়ে নিয়ে চললেন রামলালার দর্শনে। বাবরি মসজিদ ভেঙে সেই ধ্বংসস্তূপের উপরে রাতারাতি বানানো হয়েছিল অস্থায়ী মন্দির। তাতেই অধিষ্ঠিত রামলালা বা শিশু রামের মূর্তি। নিরাপত্তার বহর দেখে তখন মনে হয়েছিল যেন সিনেমায় দেখা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প একখানা।

সেখান থেকে বেরিয়ে তরুণ সাধু নিয়ে এলেন এক ছোট্ট ডিসপেনসারিতে। অযোধ্যার পাঁজিটোলায় ডাঃ শ্রীনিবাস বিশ্বাসের ডিসপেনসারি। বহুকাল আগে পশ্চিমবাংলার নদীয়া জেলা থেকে অযোধ্যায় যায় তাঁর পরিবার। ডিসপেনসারিটি আদতে একটি আড্ডাখানা। স্থানীয় অনেকেই জড়ো হয়েছেন সান্ধ্যকালীন আড্ডায়। ডাক্তারবাবুও আছেন সেই আড্ডাতে। কোনো রোগী এসে পড়লে, আড্ডার ফাঁকে দেখে ওষুধ দিয়ে দিচ্ছেন। আড্ডায় একজনকে দেখলাম। নীল চেক লুঙ্গি, মলিন সাদা পাঞ্জাবি আর নামাজি টুপি মাথায় এক বৃদ্ধ। লক্ষ্মণ কিলা মঠের তরুণ সাধুকে দেখেই জড়িয়ে ধরলেন তিনি। পরস্পর কুশলসংবাদ নিলেন। অযোধ্যা নিয়ে মনের মধ্যে তৈরি ধারণায় প্রথম ধাক্কা সেটাই। বৃদ্ধ আর কেউ নন, ১৯৫০ সাল থেকে বাবরি মসজিদের পক্ষ নিয়ে আইনি লড়াই করে আসা হাসিম আনসারি। নব্বই পার করা আনসারি এলাকার সকলেরই ‘হাসিম চাচা’।

কথা এগুতেই হাসিম চাচা বললেন, অযোধ্যার মানুষের মন্দির-মসজিদ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। এসব রাজনীতির লড়াই। অযোধ্যার বাসিন্দাদের এই সংঘাতে কোনো লাভ হয়নি, শুধু ক্ষতিই হয়েছে। অর্ধ-শতাব্দীর বেশি সময় ধরে মন্দির-মসজিদের মামলা লড়ার পরেও হাসিম চাচার অপার বিশ্বাস ছিল বিচার ব্যবস্থার উপরে। স্বগতোক্তিতে বলেছিলেন, ‘‘রামলালা বর্ষায়-শীতে তাঁবুতে (অস্থায়ী ছাউনি) থাকেন, ভালো লাগে না। ওঁর ঘর হয়ে যাক। আল্লাহরও ঘর মিলে যাক।’’ আজীবন আদালতের উপরে আস্থা রাখা হাসিম চাচার বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে পারেনি সর্বোচ্চ আদালত। সে অন্য কথা। সেই রায় ঘোষণার সময়ে তিনি আর জীবিত ছিলেন না। কিন্তু হাসিম চাচা আর রামচন্দ্র পরমহংসের আইনি লড়াইয়ের কথা মনে রেখেছে অযোধ্যা। পাঁজিটোলার বাসিন্দারা সে কথা বলেন এখনও। অযোধ্যার মন্দির শহর থেকে ফৈজাবাদের সদর শহর ছয়-সাত কিমি। মন্দির আর মসজিদের হয়ে লড়াই করা গেরুয়াধারী পরমহংস আর টুপি-লুঙ্গির আনসারি—একই রিকশায় চেপে অযোধ্যা থেকে ফৈজাবাদের আদালতে যেতেন, ফিরতেনও একই রিকশায়! বছরের পর বছর এটাই চলেছে। দুই পক্ষই নিজ নিজ ধর্মস্থানের জন্য আইনি লড়াইয়ের পক্ষ, কিন্তু তার জন্য পারস্পরিক ঘৃণা ছিল না।

ধীরেন্দ্র কে. ঝা, কৃষ্ণা ঝা তাঁদের অসাধারণ অনুসন্ধানমূলক কাজ ‘Ayodhya The Dark Night : The Secret History of Rama's Appearance in Babri Masjid’-এ দেখিয়েছেন এই রামচন্দ্র পরমহংসও ছিলেন বাবরি মসজিদে রামের মূর্তি রাখার অন্যতম ষড়যন্ত্রী। অবশ্য শেষ সময় তিনি গা ঢাকা দেন। তবে পরবর্তীকালে এই কাজের ‘কৃতিত্ব’ নিতে তিনি কোনো চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি। গত শতকের আটের দশক থেকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতৃত্বে রামমন্দির নামে আন্দোলন শুরু হলে ‘রামজন্মভূমি আন্দোলন ন্যাস’ বা ট্রাস্ট গঠিত হয়। তারও ‘মুখ’ ছিলেন এই রামচন্দ্র পরমহংস। তারপরেও তার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয়নি হাসিম চাচার। ২০০৩ সালে রামচন্দ্র পরমহংসের যেদিন জীবনাবসান হলো, সেদিন সারারাত মৃতদেহের সামনে বসেছিলেন হাসিম আনসারি। অযোধ্যায় সাধুদের মৃত্যু হলে জলসমাধি দেওয়া হয়। দেহটিকে বসিয়ে ফুলমালায় শ্রদ্ধা জানানোর পরে সরযুতে নিয়ে গিয়ে ভারী জিনিস বেঁধে ডুবিয়ে দেওয়া হয়, দাহ করা হয় না। পরের দিন পরমহংসের শেষকৃত্য হওয়ার পরেই ঘরে ফিরেছিলেন হাসিম চাচা। এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে বাবরি মসজিদের পক্ষে সব থেকে প্রবীণ মোকদ্দমাকারীর নিস্পৃহ জবাব ছিল, উনি তো আমার বন্ধু ছিলেন। 

এই সম্পর্ক শুধু এই দুই ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা নয়। নয়ের দশকে যখন বাবরি মসজিদকে ঘিরে বাইরের ভিড় বারেবারে উন্মত্ততা ছড়িয়েছে অযোধ্যায়, সেখানের বাসিন্দারা একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। এখন যেখানে রামমন্দির, সেখানে এক সময়ে ছিল বাবরি মসজিদ। অযোধ্যা শহরে যেটুকু মুসলমানের বাস, তা এই মন্দিরের তিন দিকেই। তাদের সঙ্গে কথা বললে জানা যায়, ১৯৯২-এর সেই উন্মত্ত সময়ে কীভাবে হিন্দুত্ববাহিনীর হাত থেকে মুসলিমদের বাঁচিয়েছে প্রতিবেশী হিন্দুরাই।

বাইরে থেকে দেখলে আসলে অযোধ্যার কিছুই দেখা হয় না। 


ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

         

  রেটিং: ৪

এই বিভাগের আরও পোস্ট

‘মৃত্যুদেবী’: স্নাইপার লুডমিলা পাভলিচেঙ্কো

‘মৃত্যুদেবী’: স্নাইপার লুডমিলা পাভলিচেঙ্কো

  • জীবনজয়ী ডেস্ক |
  •  ০৮-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

রোজা পার্কস: অসাধারণ এক সাধারণ মানুষ

রোজা পার্কস: অসাধারণ এক সাধারণ মানুষ

  • সুপ্তি রায়|
  •  ৩০-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

 আর্জেন্টিনা: প্লাজা দে মায়োর মায়েরা

আর্জেন্টিনা: প্লাজা দে মায়োর মায়েরা

  • নওসিন সাদিয়া|
  •  ১৫-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

অযোধ্যা: শহর-ই-আউলিয়া

অযোধ্যা: শহর-ই-আউলিয়া

  • স্বর্ণেন্দু দত্ত |
  •  ১০-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

ক্রিস্টোফার ম্যাকক্যান্ডলেস: নিঃশব্দে প্রকৃতির পথে

ক্রিস্টোফার ম্যাকক্যান্ডলেস: নিঃশব্দে প্রকৃতির পথে

  • জাওয়াহ বিনতে মিজান স্বর্ণা|
  •  ০৫-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

জীবনজয়ী জেন গুডঅল: প্রকৃতি, প্রাণী আর মানুষের সেতুবন্ধন

জীবনজয়ী জেন গুডঅল: প্রকৃতি, প্রাণী আর মানুষের সেতুবন্ধন

  • জাওয়াহ বিনতে মিজান স্বর্ণা|
  •  ২৫-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।