রুম ফিস্ট! আমাদের হল জীবনের এমন এক ঘটনা, যা কোনো বিশেষ উপলক্ষ ছাড়াই ঘটে। মন চাইল, ব্যস কাউকে ডেকে বলা, “আপু, চলেন রুম ফিস্ট করি!” তারপর শুরু হয় আয়োজন। তবে ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বরের ফিস্টটা ছিল একটু অন্যরকম।
এই প্রথমবার, আমাদের রুমের ছয়জনই একসঙ্গে ফিস্টে অংশ নিয়েছিল। শুধু অংশ নেওয়া না, প্রত্যেকের ঘাড়ে ছিল একেকটা রান্নার দায়িত্ব। সিনিয়রদের দায়িত্বে পড়েছিল ঝরঝরে ভাত। আমরা জুনিয়ররা সামলেছিলাম মাছ-মাংস-তরকারি। আমার দায়িত্ব পড়ল বেগুন ভাজা। বুশরার মাছ ভর্তা। সুবর্ণা করবে মুরগির ঝোল। আর প্রজ্ঞার হাতে গেল টমেটো ভর্তা। সালাদটা সবাই মিলে।
ওই দিন বঙ্গমাতা হলের রান্নাঘর ছিল আমাদের ৬০৪ নম্বর রুমের দখলে। একজন বেগুন কেটে নুন-হলুদ মাখাচ্ছে, আরেকজন টমেটো পোড়াচ্ছে, কেউ একজন হাতায় তেল মেখে দাঁড়িয়ে আছে কড়াইয়ের সামনে। চলছে গল্প, চলছে হাসাহাসি। আমরা মোটামুটি লেভেলের একটা শোরগোল ফেলে দিয়েছি। যেন রান্নাঘরে একটা মিনি উৎসব চলছে!
প্রজ্ঞা বলল, “আমি এমন টমেটো ভর্তা খাওয়াবো, অন্য পদগুলোর কথা ভুলেই যাবে সবাই।” সবাই আমরা হেসে উঠলাম।
আমি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলাম, “আচ্ছা! শোনো তাহলে, আমার বেগুন ভাজা খেয়ে সবাই বলবে বেগুন ভাজা এত মজারও হয়?”
সুবর্ণা একটু চুপচাপ স্বভাবের। আমরা সবাই বলাবলি করছিলাম, “সুবর্ণার রান্না সবার সেরা হবে।” সে লাজুক হাসি দিয়ে বলল, “আপু, আপনারা আমার রান্নার এত প্রশংসা করেন, সত্যি কি এত মজা?”
সবাই একসঙ্গে বললাম, “অনেক মজা!”
আর আমাদের মাছ ভর্তার মাস্টারশেফ বুশরা? সে তখন কাঁটার যন্ত্রণায় বেহাল!
রান্নাঘরে হাসি গড়াগড়ি খাচ্ছে।
রান্না শেষ হলে সবার মাথায় একটাই বুদ্ধি খেলে গেল—এই রাতটাকে স্মরণীয় করতে হবে। সিনিয়র দুই আপু তো শিগগির চলে যাবে! তাই সবাই একটু ফ্রেশ হয়ে, বিভিন্ন ঢঙে, বিভিন্ন রঙে ছবি তুললাম। ব্যাচমেট, সিনিয়র-জুনিয়রা নানা কায়দায় ছবি।
ঠিক হলো, খাবারটা হলের ছাদে বসে খাব। পাশের এক রুম থেকে পাটি ধার করে, খাবার-প্লেট হাতে, সবাই উঠে গেলাম ছাদে। শুরু হলো মহাভোজ। একেকজনের রান্না খাওয়া হচ্ছিল, আর তাকে প্রশংসার ফুলঝুরি দিয়ে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছিল।
খাওয়ার পর আড্ডা-গল্প। স্বপ্ন, চাওয়া-পাওয়া, না-পাওয়ার আলাপ। ক্যাম্পাস জীবনের অভিজ্ঞতা। ভবিষ্যৎ কেমন হবে, কে কী হতে চায়—এসব আলাপও হলো। রাত ক্রমশ গভীর হয়। দুটোর সময় সবাই ফিরে এলাম রুমে। সিনিয়র আপুরা দুজন মিলে বাসন পরিষ্কার করলেন, আমরা পিছনে দাঁড়িয়ে রইলাম।
মনে হচ্ছিল, রাতটা যদি গল্প-হাসাহাসিতে কাটিয়ে দিতে পারতাম! কিন্তু সকাল তো আর বসে থাকবে না, সবাইকে ব্যস্ততার জগতে ফিরতেই হবে। রাতটার গল্প আজও মনে পড়ে। সিনিয়র দুই আপু হলে ছেড়ে চলে গেছেন। তাতে কী? রান্না ঘিরে কাটানো সময়টা আমি জানি আমাদের সবার মনে অমলিন আছে।