রসিঘর

মৈত্রী হলে গনরুমে আমাদের ফিস্টি


  • নওরিন নাহার মুনা  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় |
  • প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৬, ০০:০২
মৈত্রী হলে গনরুমে আমাদের ফিস্টি
ছবি: সাবরিনা ইসলাম সেফা

ক্যাম্পাসের শেষ দিনগুলোতে এসে যখন ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে থাকি, তখন সবার আগে মনে পড়ে যায় মৈত্রী হলের গনরুমের দিনগুলোর কথা! কী করিনি তখন! রাতভর আড্ডা, হাসি-তামাশা, গানের পর গান, চোর-পুলিশ, ট্রুথ অ্যান্ড ডেয়ার, আর উনো খেলা, বন্ধুদের প্র্যাংক কল করে মজা নেওয়া! আরও কত কিছু। গনরুমের স্মৃতিতে আরও আসছে রান্নাবান্নার কথা। একসাথে রান্না করা, একসাথে খাওয়া – সবাই যেন একটি পরিবার হয়ে উঠেছিলাম।

সময় বয়ে যাচ্ছিল। এক পর্যায়ে স্বাভাবিক সিট পাওয়ার সময় চলে এলো হলে। ২০২২ সালের মার্চ মাস তখন। সবাই ঠিক করলাম গনরুম ছেড়ে যাওয়ার আগে শেষবারের মত রুমমেটরা একসাথে একটা পুরো দিন নিজেদেরকে সময় দেবো, রুম ৩২৭ কে সময় দেবো; সারাদিনব্যাপী একেকজন পালা করে রান্না করবো, সবাই মিলে মজা করবো, আনন্দ করবো।

আমরা বেছে নিলাম শুক্রবার। অন্যান্য দিনগুলোতে ক্লাস থাকে। দুদিন আগে থেকে ঠিক করলাম কী কী রান্না করবো। রান্না চলবে দিনব্যাপী; যেনতেন কথা নয়। কে রান্না করবে, কী কী রান্না করবে, দুপুরে কী রান্না হবে, বিকেলে নাস্তা কী হবে, রাতে কী হবে সব ঠিকঠাক করতে হলো। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নয়-দশজনের এক দল বাজার করতে বের হলাম! চাল, সবজি, মাংস, ফলমূল, কোমল পানীয় – মোটকথা যা যা লাগতো সব কিনে আনলাম।

বাজার থেকে ফিরে শুরু হলো রুম সাজানো। মনে পড়ে শান্তা, সীমা আর বর্না খুব আগ্রহ নিয়ে সাজানো-গুছানোর কাজটা করছিল।

এলো শুক্রবার। আমাদের দিন শুরু হলো। সকালের প্রথম পরিবেশনে ছিল ছিটে রুটি আর ঝাল মাংস। এটা জেবিনের দায়িত্বে ছিল। মাংস রাতেই রান্না করে রেখেছিল সে, সকালে উঠে সবার জন্য ছিটে রুটি বানালো। আমি যে এলাকার মানুষ সেখানে ছিটে রুটি দেখিনি। প্রথমবারের মতো ছিটে রুটি খেলাম। এরপরে চা।

এরপরে শুরু হলো মহাভোজের প্রস্তুতি। মেনুতে ছিল ফ্রাইড রাইস, চিলি চিকেন, ভেজিটেবলস আরও কিছু। আমি বেছে নিয়েছিলাম ডেজার্ট বানানোর কাজটা – ফ্রুট কাস্টার্ড। আমার জোগাড়যন্ত্র শেষ করে বড় শেফদের জায়গা করে দিলাম!

রান্না হবে রুমের ছোট্ট হিটারে। ভাবা যায়! শান্তা করেছিল চিলি চিকেন। অর্পিতার হাতের রান্না সেই আমার প্রথম খাওয়া। সে ফ্রাইড রাইস বানিয়েছিল। সবাই মিলে কাটাকুটি, হাসি-ঠাট্টা করতে করতে রান্না। কী যে ভালো লাগছিল বলে বোঝানো যায় না।

Image
 ছবি: নাজিজ আফরোজ শান্তা

তো সবারই রান্নার হাত কাঁচা। তাতে কী? ফিস্টি হচ্ছে সেটাই বড় কথা। সমানতালে চলছে ফটো তোলা আর ভিডিও। একজন আবার আরেকজনকে শেখাচ্ছে – কোনটা কীভাবে রাঁধতে হয়!

দুপুরে পরিপূর্ণ আনন্দের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেলো।

রাতের আয়োজনে ছিল ভাত, ডাল ভর্তা, ডিম ভুনা, বেগুন ভাজি। নওশিন করেছিল আলু ভর্তা। এই কাজে তার দুরন্ত উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। সীমা করেছিল লেন্টিল স্যুপ! তার যে কতো অভিযোগ ছিল এ নিয়ে—তাকে কেন ভালো খাবারের পদ দেওয়া হলো না ইত্যাদি ইত্যাদি! রাতের খাবার হয়ে গেলো একপর্যায়ে। তাই বলে “খেলা” শেষ নয়।

সারাদিন রান্নাবান্না, হাসিতামাশা করতে করতে সবাই ক্লান্ত। ব্যাপক ক্লান্তি নিয়েই শুরু হলো মুভি দেখা। থ্রিলার! সবার একসাথে গল্পের মোড় নিয়ে অনুমান, ভয় পাওয়া, চিৎকার। চললো সমানে।

Image
 ছবি: লেখক 

হেরাক্লিটাসের একটা কথা আছে, “কোনো মানুষই এক নদীতে দুইবার পা রাখতে পারে না।” কারণ দ্বিতীয়বারে নদীটি বা মানুষটি কেউই আগের মতো থাকে না। আমাদের হয়েছে তেমন অবস্থা। এখন সেই সময়গুলো, গণরুমে সেদিনের সেই মানুষগুলো সুন্দর স্মৃতি হয়ে আছে। অনেকে হল ছেড়ে দিয়েছে, কেউ পরিবার শুরু করছে, অনেকে চাকুরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে যাই হোক, আমাদের গনরুমের ঐ সময়টা, ঐ সময়ের মানুষগুলো আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অনেকখানি জায়গা জুড়ে রয়েছে। স্মৃতির পাতাগুলো উল্টোলেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। ভালো থাকুক আমার গনরুমের দিনগুলো। ভালো থাকুক আমার গনরুমের বন্ধুগুলো। ওরা শুধু রুমমেট ছিল না, ওরা আমার বন্ধুও ছিল। 


ক্যাটাগরি: রসিঘর

         

  রেটিং: ৪.৫

এই বিভাগের আরও পোস্ট

রাজস্থানী মালাই ঘেওয়র

রাজস্থানী মালাই ঘেওয়র

  • অনন্যা উর্মি|
  •  ০১-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: রসিঘর

কলার মোচার ঘন্ট ও বড়া

কলার মোচার ঘন্ট ও বড়া

  • অনন্যা উর্মি |
  •  ১৩-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: রসিঘর

৪.৩

ছাদে বসেই শুরু হলো মহাভোজ

ছাদে বসেই শুরু হলো মহাভোজ

  • ইশরাত জাহান|
  •  ১৪-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: রসিঘর

মৈত্রী হলে গনরুমে আমাদের ফিস্টি

মৈত্রী হলে গনরুমে আমাদের ফিস্টি

  • নওরিন নাহার মুনা|
  •  ২২-০৬-২০২৬
ক্যাটাগরি: রসিঘর

৪.৫

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।