২০০৯ সাল। শহর
লন্ডন। আমি থাকি
টাওয়ার ব্রিজ থেকে
দুই-তিন মিনিট
দূরে জন ফিশার
স্ট্রিটে। বাসা
দুই রুমের। এক
রুমে আমি, আরেক
রুমে প্যাট্রিশিয়া। আইরিশ
মেয়ে, ছোট করে
ওকে ডাকি ট্রিশ।
লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের কিংস
কলেজে সে ফার্মেসি
পড়ে। বাসা-লাইব্রেরি
মিলিয়ে দিনে কমপক্ষে
১৫ ঘণ্টা চোখের
সামনে বই। খাবার-দাবার পাখির মতো।
সে রান্নাবান্না করে
না, কিন্তু আমার
বাঙালি রান্না ট্রিশের
কি যে পছন্দ!
সেবার ট্রিশ গেছে
বাড়িতে ক্রিসমাসের ছুটিতে।
এদিকে বাঙালি বন্ধু-বান্ধব, বড় ভাই-আপা-দিদিদের মধ্যে
ক্রিসমাসের অন্তত
একটা দিন চুটিয়ে
আড্ডা দেওয়ার ইচ্ছা।
দেখা হলে আলাপ,
ফোনে আলাপ। লম্বা
আড্ডা প্রসঙ্গে আলাপে
অবধারিতভাবে আসে
খাবার-দাবার প্রসঙ্গ।
খাবার-দাবার হতে
হবে ব্যাপক পরিমাণে।
কেউ একজন বললো,
খাওয়া-দাওয়া এমন
পরিমাণে হতে
হবে যেন একপর্যায়ে
এসে সেটা সারা
গায়ে মাখামাখি হয়ে
যায়! কথার সূত্র
ধরে ঠিক হয়
যে 'খা-মাখা'
অনুষ্ঠিত হবে
বক্সিং ডে’র
দিন। অনুষ্ঠানের শিরোনাম
দাঁড়ালো “বক্সিং
ডে খা-মাখা”। খাওয়া এবং
মাখানো!
অনুষ্ঠানটা কোথায়
হবে তা নিয়ে
চিন্তা ছিল না।
তখন ব্রিকলেন থেকে
বিলেতের প্রথম
বাংলা অনলাইন পত্রিকা
'ইউকেবেঙ্গলি' প্রকাশিত
হতো। ইউকেবেঙ্গলিতে বাঙালিদের
ভালো আনাগোনা ও
আড্ডা। রান্নার দায়িত্ব
অনুমেয়ভাবেই আমার
ওপরেই পড়লো। আমিও
কথা না বাড়িয়ে
প্রস্তুতি শুরু
করে দিলাম। ঠিক
হলো রান্না আমার
বাসাতেই হবে,
পরে গাড়ি করে
নিয়ে যাওয়া হবে
ইউকেবেঙ্গলি অফিসে।
আহারে ট্রিশ! তুমি
নেই, এত খাওয়া-দাওয়া হতে যাচ্ছে!
কিছু খাবার অবশ্য
ওর জন্য ডিপ
ফ্রিজে রেখে দিয়েছিলাম।
প্রথমে মেন্যু নিয়ে
ভাবতে বসলাম। বক্সিং
ডে বলে কথা,
পশ্চিমা খাবার
দিয়েই খা-মাখা
হবে ঠিক করলাম।
কয়েকদিন ভাবাভাবির
পরে মেন্যু দাঁড়ালো
লম্বা-চওড়া। এতকিছু
বানিয়ে শেষ করতে
পারবো তো! মেন্যু
তৈরি শেষ, এবার
বাজার। দেখেশুনে, দুই-তিন দিন সময়
নিয়ে মনের মতো
করে কেনাকাটা সারলাম।
রান্না করতে করতে
মাটিতে মিশে যাবার
জোগাড় হলেও, বক্সিং
ডে বিকেলের মধ্যে
সব রেডি হয়ে
যায়। সন্ধ্যার দিকেই
সবাই আড্ডাস্থলে। তারপরে
ক্রমাগত আড্ডা
ও খাওয়া-দাওয়া।
সারা রাত। আসলেই
খা অ্যান্ড মাখা
হয়েছিল সেদিন।
জীবনজয়ীর জন্য
কয়েক পর্বে খাবার-দাবারগুলোর নাম
ও তৈরির উপায়
লিখছি। অবসরে বা
উৎসবে উপভোগ করতে
পারেন সবাই।
প্রধান পদ ও সাইড ডিশ:
ইয়র্কশায়ার পুডিং
উইথ চিকেন সসেজ
গ্রিন সালাদ ও
গ্রিলড মিক্সড পিপারস
রুই মাছের শাসলিক
স্যামন গ্রিল উইথ
ব্ল্যাক পিপার
অ্যান্ড লেমন,
তন্দুরি স্পাইস
ও মাস্টার্ড
গ্রিলড চিকেন, রোস্ট
পটেটোস ও স্টিমড
বিনস
রেড অনিয়ন ফ্রুটি
স্টাফিং
ল্যাম্ব রোস্ট
উইথ গার্লিক বাল্বস
অ্যান্ড ন্যাচারাল
ইয়োগার্ট
মরোক্কান স্টাইল
কুসকুস (Couscous)
সালাদ ও চাটনি: মোজারেলা চিজ-চেরি টমেটো সালাদ
এবং টমেটো-তেঁতুল-প্লামের চাটনি।
ডেজার্ট ও
ড্রিংকস: স্পঞ্জ
কেক উইথ হুইপড
ক্রিম ও মিক্সড
ফ্রুটস এবং জিঞ্জার
গার্ডেন ককটেল।
প্রথম কিস্তির লেখাতে আজ থাকছে খা-মাখার জন্য তৈরি করা দুটি নিবলসের (ক্যানাপি এবং চিকেন ইয়াকিতোরি ও ডো বলস) প্রস্তুতপ্রণালী। পরবর্তী পর্বগুলোতে বাকি নিবলস ও অন্যান্য পদগুলোর প্রস্তুতপ্রনালী দেয়া হবে।
প্রস্তুতপ্রণালী
ক্যানাপি (Canape)
৫-৬ জনের
জন্য
ক্যানাপি হচ্ছে
ছোটছোট সাইজের একবারে
মুখে দেয়ার মত
সাজানো-গুছানো অ্যাপিটাইজার। স্লাইস করা
শসার ওপরে নরম
চিজ, স্যালাড পেঁয়াজ,
গ্রিলড প্রন এবং
মেক্সিকান ফ্রুটি
পেপার দিয়ে এটি
সাজানো হবে।
উপকরণ: মাঝারি বা
বড় সাইজের চিংড়ি
আধা কেজি, বাটার
বা তেল ১
টেবিল চামচ, গোলমরিচ
গুঁড়ো ১ চা
চামচ, হট চিলি
সস ১ টেবিল
চামচ, রসুন কুচি
১ টেবিল চামচ,
পেঁয়াজ কুচি ১
টেবিল চামচ, কুচানো
পার্সলে বা
ধনেপাতা ২
টেবিল চামচ, কচি
শসা ২৪টি স্লাইস,
লবণ বা হিমালয়ান
পিঙ্ক সল্ট ২
চা চামচ, ক্রিম
চিজ পরিমাণমতো, মেক্সিকান
চিলি বা ক্যাপসিকাম
স্লাইস, লেবুর রস
১ চামচ, এবং
সাজানোর জন্য
লম্বা ও চিকন
করে ফালি করা
সবুজ পেঁয়াজ পাতা।
প্রণালী: প্রথমে চিংড়ি
পরিষ্কার করে
এক চা চামচ
বাটার ও সামান্য
লেবুর রস দিয়ে
অল্প সময়ে সেদ্ধ
করে নিন। এবার
চিংড়িতে গোলমরিচ,
চিলি সস ও
রসুন কুচি দিয়ে
আরও এক থেকে
দেড় মিনিট নেড়েচেড়ে
নামিয়ে নিন। অন্য
একটি পাত্রে ক্রিম
চিজের সঙ্গে কিছুটা
পার্সলে, পেঁয়াজ
পাতা কুচি ও
এক চিমটি মরিচ
গুঁড়ো কাঁটাচামচ দিয়ে
ফেটিয়ে স্মুথ করে
নিন।
পরিবেশনের পাত্রে
লম্বা পেঁয়াজ পাতা
বিছিয়ে তার ওপর
শসার স্লাইসগুলো সাজান।
শসার ওপর ক্রিম
চিজের মিশ্রণ দিয়ে
তার ওপর একটি
করে চিংড়ি বসিয়ে
দিন। সবশেষে ক্যাপসিকাম
বা চিলি স্লাইস
ও পেঁয়াজ পাতা
দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন
করুন। (টিপস: শসা
ও চিজের প্রিপারেশনটি
পরিবেশনের ১-২ ঘণ্টা আগে
ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা
করে নিলে ভালো
হয়)।
চিকেন ইয়াকিতোরি ও ডো বলস (Chicken Yakitori & Dough Balls)
৮-১০ জনের
জন্য
চিকেন ইয়াকিতোরি
উপকরণ: চামড়া ও
হাড় ছাড়া চিকেন
থাই ৪টি (১
ইঞ্চি কিউব কাটা),
সয়া সস হাফ
কাপ, পানি হাফ
কাপ, রাইস ভিনেগার
হাফ কাপ, তিলের
তেল ২ টেবিল
চামচ, মধু ১
চা চামচ, ব্রাউন
সুগার ২ চা
চামচ, ভেজিটেবল অয়েল
১ চা চামচ,
গোলমরিচ ও
লবণ স্বাদমতো, কর্নফ্লাওয়ার
২ টেবিল চামচ,
সাজানোর জন্য
টোস্টেড তিল
ও পেঁয়াজ পাতা
কুচি এবং বাঁশের
কাঠি।
প্রণালী: চিকেন কিউবগুলো
লবণ ও গোলমরিচ
দিয়ে মেখে কাঠিতে
গেঁথে নিন। সয়া
সস, পানি, মধু,
ভিনেগার, চিনি,
তিলের তেল ও
কর্নফ্লাওয়ার একসঙ্গে
ফুটিয়ে ঘন সস
তৈরি করে নিন।
গ্রিল প্যান হাই
হিটে গরম করে
তেল ব্রাশ করুন।
চিকেন স্টিকগুলো গ্রিল
করার সময় ব্রাশ
দিয়ে ঘন করে
তৈরি করা সসটি
মাখিয়ে রান্না শেষ
করুন। ওপরে তিল
ও পেঁয়াজ পাতা
কুচি ছড়িয়ে দিন।
ডো বলস উইথ গার্লিক বাটার
উপকরণ: ময়দা ৬০০
গ্রাম, ড্রাইড ইস্ট
১৫ গ্রাম, চিনি
২ টেবিল চামচ,
লবণ ২ চা
চামচ, বাটার ১০০
গ্রাম এবং হালকা
গরম পানি ৩৫০
মিলি। গার্লিক বাটারের
জন্য: বাটার ১০০
গ্রাম ও মিহি
থেঁতো করা রসুন
কোয়া ৭-৮টি।
প্রণালী: হালকা গরম
পানিতে বাটার গলিয়ে
নিন। একটি বড়
পাত্রে ময়দা, ইস্ট,
চিনি ও লবণ
মিশিয়ে বাটার পানির
মিশ্রণ দিয়ে ১০
মিনিট ভালো করে
মেখে নরম ও
বাউন্সি ডো
বানিয়ে নিন। ডো-এর গায়ে তেল
মাখিয়ে ঢেকে উষ্ণ
স্থানে দেড়-দুই
ঘণ্টা রাখুন ফুলে
দ্বিগুণ হওয়া
পর্যন্ত। এরপর
ডো থেকে বাতাস
বের করে ছোট
ছোট সুপারি সাইজের
বল বানিয়ে বেকিং
শিটে রাখুন এবং
আরও ৩০ মিনিট
ঢেকে রাখুন।
ওভেন ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে (বা গ্যাস মার্ক ৪) প্রি-হিট করে বলগুলো ২৫-৩০ মিনিট বেক করুন। অন্য একটি প্যানে বাটার ও রসুন গলিয়ে গার্লিক বাটার তৈরি করে নিন। বেকড বলগুলোর ওপর গার্লিক বাটার ব্রাশ করে বাকি বাটারের বাটিসহ পরিবেশন করুন।