রসিঘর

ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের প্রকৃত মালিক কে?


  • সাইদুর রহমান  ঢাকা, বাংলাদেশ |
  • প্রকাশ : ২৪ মে ২০২৬, ২৩:৫৫
ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের প্রকৃত মালিক কে?
ছবি: এআই

সর্বগুনে গুণান্বিত বলতে কোনো কিছুর সাথে যদি উপমা দিতে হয়, তাহলে সেটা নিঃসন্দেহে আলুর সাথেই দেওয়া যায়। রন্ধনশৈলীর ক্ষেত্রে আলু নামক জিনিসটা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমাদৃত। আলু দিয়ে যে কত পদ তৈরি করা যায়! আলুভর্তা, আলুভাজি, আলু কুচি কুচি করে কেটে সালাদ হিসেবে ব্যবহার করা, আবার আস্ত সেদ্ধ আলু লবণ দিয়ে মাখিয়েও খাওয়া হয়। একে মাঝেমধ্যে খাবারের প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, আবার কিছু খাদ্যের সৌন্দর্যবর্ধক হিসেবেও আলু ব্যবহার করা হয়। তবে আলুর বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত নানান পদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় যে পদ রয়েছে, তা হলো ফ্রেঞ্চ ফ্রাই। ফ্রেঞ্চ ফ্রাই হলো মুচমুচে আলুভাজা, যা জিভে জল আনা এক মোহনীয় স্ন্যাকস। পিটকো, জাগরন জোশ এবং কুকিং উইথ ক্লাস এর তথ্য অবলম্বনে জীবনজয়ী প্রতিবেদন। খাঁটি বাংলায় আলুভাজি হলেও যেনতেন করে ভাজলেই কিন্তু ফ্রেঞ্চ ফ্রাই হয় না। বেছে নেওয়া আলুকে লম্বা লম্বা চিকন চিকন করে কেটে ডুবো তেলে ভেজে বাইরের অংশটা মুচমুচে এবং ভেতরে নরম রেখে গরম গরম পরিবেশন করতে হবে। তাহলে সেটা হবে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই। ফ্রেঞ্চ ফ্রাই শব্দটি শুনলেই মনে পড়ে ফরাসি জাতির কথা। স্বাভাবিকভাবেই কারও মনে হতে পারে যে ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের জন্ম ফ্রান্সের মাটিতেই হয়েছে। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের জন্মভূমি কিন্তু ফ্রান্স নয়। কিছু কিছু সূত্রমতে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই মূলত ১৯ শতকের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে উৎপত্তি হয়েছে। আবার কিছু সূত্র মনে করে, এর উৎপত্তি মেক্সিকোতে। আবার আয়ারল্যান্ডের প্রধান খাদ্য আলু হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের উৎপত্তিস্থল হিসেবে আয়ারল্যান্ডকেও ভাবা হয়। তবে বেশির ভাগ সূত্রে প্রমাণিত যে ফ্রান্সের পাশের দেশ বেলজিয়াম এই ‘ফ্রেঞ্চ ফ্রাই’–এর আদি ও আসল উৎপত্তিস্থল। বেলজিয়ামের দক্ষিণাঞ্চলের কিছু অঞ্চলে ফরাসি ভাষাকে কথা বলার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ‘মিউজে’ নদীর তীরে অবস্থিত বেলজিয়ামের এমনই একটি গ্রামের মানুষজন মূলত প্রধান খাদ্য হিসেবে মাছ শিকার করে খেত এবং মাছকে শিকার করে খাওয়ার আগে তা লম্বাভাবে কেটে ভালো করে ভেজে নিত। কিন্তু যখন তীব্র শীত হতো এবং বরফে নদী ঢেকে যেত, তখন মাছ শিকার করাটা খুব কষ্টসাধ্য হয়ে যেত। ঠিক তখনই যক্ষের ধন হিসেবে তাদের প্রেক্ষাপটে চলে আসে আলু। তারা আলুকে লম্বা ও চিকন করে কেটে ভেজে শীতকালে বেঁচে থাকার মাধ্যম হিসেবে খাওয়া শুরু করল। সেখান থেকেই মূলত ফ্রেঞ্চ ফ্রাই নামক খাদ্যটির উৎপত্তি। তবে এটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে গেল মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধে। আমেরিকার সৈন্যরা বেলজিয়ামের মাটিতে যুদ্ধ করতে এল এবং ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের মজাদার স্বাদের সাথে পরিচিত হলো। সহজলভ্য হওয়ায় আর তৈরিতে অল্প সময় লাগার কারণে এটি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। যুদ্ধক্ষেত্রে খাবার তৈরির কাজে সময় নষ্ট করা ছিল বোকার মতো কাজ। মার্কিন সৈন্যরা যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে গিয়েই ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খোঁজা শুরু করে দিল। কিন্তু সেখানে তখনো ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা আলুভাজির ব্যবহার শুরু হয়নি। তাদেরই কারও কারও হাত ধরে এবং তাদের দেওয়া ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের বর্ণনা অনুসারে আমেরিকাতে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ছড়িয়ে পড়ল। এভাবেই আমেরিকার মাটিতে বাণিজ্যিকভাবে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বিক্রি শুরু হয়ে গেল। আজকের আধুনিক বিশ্বের খাবার টেবিলে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই জিনিসটি কিন্তু চমৎকার সাইড ডিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পাশ্চাত্যের স্টেক, বার্গার বা মোগল রেসিপি শর্মার সাথে কিছু আলুভাজি থাকলে ব্যাপারটা জমে ক্ষীর। সে যাই হোক, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই যদি নামে ফ্রেঞ্চ হয়ে থাকে, তবে তা কেন ফ্রান্সের নয় এবং ফ্রান্সের সাথে আলুর সম্পর্কটাই বা কী? ফ্রান্সের সাথে আলুর সম্পর্কের শুরুটা কিন্তু তেমন একটা সুখকর ছিল না। ১৭৪৮ সাল থেকে ১৭৭২ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সে আলু মানুষের খাওয়ার জন্য নিষিদ্ধ ছিল। কারণ, বিশ্বাস করা হতো যে এটি কুষ্ঠরোগের কারণ এবং রোগ ছড়ায়। আলুকে নায়কের জায়গায় নিয়ে এলেন প্রুশিয়ান কারাগারে আলু খেয়ে বেঁচে থাকা এক ফার্মাসিস্ট, যাঁর নাম ‘আতয়ান অগাস্টিন পারমেন্টিয়ার’। তিনি দুর্ভিক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আলুকে সমর্থন করেছিলেন। খাদ্যসংকট সমাধান করতে সক্ষম খাদ্য হিসেবে আলু উপস্থাপনের জন্য ১৭৭২ সালে পারমেন্টিয়ার একটি পুরস্কার পেয়েছিলেন। ১৭৮৫ সালে লুই পঞ্চদশ নিজেই পারমেন্টিয়ার আয়োজিত একটি নৈশভোজে ঘোষণা করেছিলেন, ‘দরিদ্র মানুষের রুটি আবিষ্কার করার জন্য একদিন ফ্রান্স আপনাকে ধন্যবাদ জানাবে।’ ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের আগে ফ্রান্সে আলুকে ঘৃণা করা হতো। এটিকে কেবল পশুদের জন্য উপযুক্ত বলে মনে করা হতো এবং এটি কুষ্ঠরোগের কারণ বলেও গুজব ছড়ানো হয়েছিল। প্রথমে ফরাসি মাটিতে উৎপন্ন হওয়া আলুর মধ্যে কিছুটা তেতো ভাব ছিল। পরে সঠিক মাটি এবং চাষ করার জন্য সঠিক অঞ্চল খুঁজে বের করার মাধ্যমে আলুকে খাদ্যসংকট মোকাবিলা করার জন্য প্রধান অস্ত্রে পরিণত করা হলো দেশটিতে। তবে তত দিনে বিপ্লব ঠেকাতে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল বৈকি! ফরাসি বিপ্লবে লুই পরিবারের কী পরিণতি হয়েছিল, সেটা সবারই জানা। ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা আলুভাজি আবিষ্কারের পেছনে ফরাসিদের সম্পর্কের দড়ি নেহায়েত দুর্বল। ‘ফ্রেন্স ফ্রাই ইজ নট ফ্রেন্স’ উক্তিটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। তবে আরেকটি উক্তি হচ্ছে ‘আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারী’। ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়েছে যে প্রতিবছর জুলাইয়ের দ্বিতীয় শুক্রবারকে ‘ফ্রেঞ্চ ফ্রাই দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। খাদ্যরসিকেরা তো একে স্বর্গীয় স্বাদের সাথেই তুলনা করেছেন! কেচাপের সাথে গরম গরম ফ্রেঞ্চ ফ্রাই মানেই একটুকরো স্বর্গের স্বাদ।  


ক্যাটাগরি: রসিঘর

         

  রেটিং: ৪

এই বিভাগের আরও পোস্ট

রাজস্থানী মালাই ঘেওয়র

রাজস্থানী মালাই ঘেওয়র

  • অনন্যা উর্মি|
  •  ০১-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: রসিঘর

কলার মোচার ঘন্ট ও বড়া

কলার মোচার ঘন্ট ও বড়া

  • অনন্যা উর্মি |
  •  ১৩-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: রসিঘর

৪.৩

ছাদে বসেই শুরু হলো মহাভোজ

ছাদে বসেই শুরু হলো মহাভোজ

  • ইশরাত জাহান|
  •  ১৪-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: রসিঘর

মৈত্রী হলে গনরুমে আমাদের ফিস্টি

মৈত্রী হলে গনরুমে আমাদের ফিস্টি

  • নওরিন নাহার মুনা|
  •  ২২-০৬-২০২৬
ক্যাটাগরি: রসিঘর

৪.৫

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।