ধরুন, এক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দিলেন। এবার একজন এসে এই পোস্টের ব্যাপারে তার অনুভূতি জানালেন। অনুভূতি প্রকাশের নামে আসলে তিনি ওই ব্যক্তির উদ্দেশে একগাদা হেইট স্পিচ তথা ঘৃণাকথা উগরে দিলেন। তাঁর দেখাদেখি আরেকজন। অতঃপর আরও একজন। এরপর ঝাঁকে ঝাঁকে। প্রথম ব্যক্তি পোস্টে কী লিখেছেন, তা আর বিবেচ্য রইল না। অনুভূতি প্রকাশকারীরা কী মনে করছেন, তা-ই প্রধান হয়ে উঠল। দু-একজন হয়তো আক্রান্ত ব্যক্তির পক্ষে কিছু কথা বলতে চাইলেন। কিন্তু ঘৃণাজীবীদের সমন্বিত হামলার মুখে তাঁরা গুটিয়ে গেলেন। পোস্ট দেওয়া ব্যক্তি এবার ইন্টারনেট দুনিয়ায় একা হয়ে গেলেন।
ঘৃণাকথা একপর্যায়ে এসে আর পোস্ট দেওয়া ব্যক্তির ওপর বাক্সন্ত্রাসে আটকে রইল না। পোস্ট দেওয়া ব্যক্তির জাতি, ধর্ম বা লিঙ্গীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আঘাতের পর আঘাত চলতেই থাকল। একপর্যায়ে ঘৃণাকথায় তাড়িত হয়ে এক ঝাঁক উন্মত্ত মানুষ পোস্ট লেখা ব্যক্তির ও তাঁর স্বজনদের ওপর হামলা শুরু করে দিলেন।
অনলাইনে এমন দৃশ্য এখন নতুন নয়। এটা নিউ নরম্যাল বা নয়া বাস্তবতা হয়ে উঠেছে, তাও অনেক দিন। ঘৃণাকথা মোকাবিলা নিয়ে জাতিসংঘ এবং ইউনিয়া (UNIA)-এর পরামর্শ অবলম্বনে পড়ুন জীবনজয়ীর প্রতিবেদন।
ঘৃণাকথা শুধু কঠিন বা রূঢ় কথা নয়। এর মধ্যে থাকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে তার পরিচয়ের কারণে হেয় করার চেষ্টা। কখনো ধর্মকে লক্ষ্য করা হয়। কখনো জাতি বা বর্ণকে আক্রমণ করা হয়। আবার লিঙ্গ বা ব্যক্তিগত পরিচয়ও বিদ্রূপ বা হুমকির কারণ হয়। এসব কথা শুধু একজন মানুষকে আঘাত করে না। ধীরে ধীরে সমাজে অবিশ্বাসও বাড়ায়।
অনলাইনে ভুল তথ্য দ্রুত ছড়ায়। তাই কোনো উত্তেজনাপূর্ণ পোস্ট দেখেই প্রতিক্রিয়া দেওয়া ঠিক নয়। আগে দেখতে হবে তথ্যটি সত্য কি না। পোস্টের ছবিটি পুরোনো হতে পারে। ভিডিওর কিছু অংশ কেটে দেওয়া হতে পারে। কোনো বক্তব্যের আসল অর্থও বদলে দেওয়া হতে পারে। তাই উৎস দেখা জরুরি। নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে একই তথ্য আছে কি না, তাও দেখা দরকার। যাচাই ছাড়া শেয়ার করলে ভুলের সঙ্গে আমরাও জড়িয়ে যাই।
ঘৃণাকথা ছড়াতে দেখলে প্রতিবাদ করা দরকার। তবে সেই প্রতিবাদে সংযম থাকতে হবে। কটুকথার জবাবে কটূক্তি করলে বিদ্বেষ আরও বাড়ে। ব্যক্তিকে আক্রমণ না করে বক্তব্যের ভুল দিকটি তুলে ধরা ভালো। তথ্য ভুল হলে সঠিক তথ্য দেওয়া যায়। শান্ত ভাষা অনেক সময় ক্রোধের ভাষার চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়।
সব জায়গায় তর্কে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কিছু মানুষ ইচ্ছা করে অন্যকে উসকে দেন। তখন দীর্ঘ তর্ক তাঁদের উদ্দেশ্যই পূরণ করে। তর্কে না জড়িয়ে পোস্টটি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মকে রিপোর্ট করা জরুরি। পেজ বা গ্রুপের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে জানানো যায়। কোনো মন্তব্য নিয়ম ভাঙলে সেটি সরিয়ে দেওয়ার অনুরোধও করা যায়।
অনলাইনের অ্যালগরিদমও মাথায় রাখা দরকার। একটি পোস্টে যত বেশি প্রতিক্রিয়া আসে, সেটি তত বেশি মানুষের সামনে যেতে পারে। তাই ঘৃণামূলক পোস্টে অযথা ভিড় বাড়ানো সব সময় ভালো ফল দেয় না। কোথায় কথা বলতে হবে এবং কোথায় নীরবে রিপোর্ট করতে হবে, তা বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
অনেক সময় ঘৃণাকথা সরাসরি হুমকিতে রূপ নেয়। এতে কারও ক্ষতি করার কথা বলা হতে পারে। কোনো গোষ্ঠীর ওপর আক্রমণের আহ্বান আসতে পারে। তখন বিষয়টি হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। স্ক্রিনশট রাখা দরকার। পোস্টের লিংকও সংরক্ষণ করা যায়। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাহায্য চাইতে হবে। এমন আক্রমণের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়ানো জরুরি।
এখানে পড়ুন: সামাজিক পক্ষপাতের ফাঁদ কীভাবে এড়ানো যায়?
অনলাইনের একটি বিদ্বেষপূর্ণ বাক্যও একজন মানুষের মনে গভীর আঘাত দিতে পারে। তিনি লজ্জা পেতে পারেন। ভয় পেতে পারেন। নিজেকে একা ভাবতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে মানসিক শক্তি জোগানো বড় দরকার হয়ে ওঠে। তাঁর কথা সবাইকে জানানোর ব্যবস্থা করতে হবে। ঘৃণাজীবীদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করতে হবে।
ঘৃণার বিপরীতে অন্য ভাষাও তৈরি করা যায়। সেখানে সহমর্মিতার জায়গা তৈরি করা যায়। সত্য তথ্য তুলে ধরা যায়। ভিন্ন মানুষের জীবন সম্পর্কে জানার আগ্রহ বাড়ানো যেতে পারে। ভালো গল্পও ছড়িয়ে দেওয়া যায়। এতে মানুষ বুঝতে শেখে যে ভিন্নতা মানেই শত্রুতা নয়।
ঘৃণাভাষা নিবারণে পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও আছে। শিশুদের ছোট থেকেই সম্মানের ভাষা শেখাতে হবে। কারও পরিচয় নিয়ে হাসাহাসি যে বিনোদন নয়, তা বোঝাতে হবে। ভিন্ন মত শুনে রাগ না করে ভাবতে শেখাতে হবে। কারণ অনলাইনের আচরণ অনেক সময় বাস্তব জীবনের শিক্ষারই প্রতিফলন।
ঘৃণাকথা ঠেকানো শুধু বড় বড় রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক উদ্যোগের ভরসায় বসে থাকার বিষয় নয়। রাষ্ট্র বা সমাজের ব্যর্থতা নিয়ে সর্বক্ষণ প্রতিক্রিয়া জানানোই শেষ কথা নয়। বরং যে যার জায়গা থেকে যতদূর সম্ভব, ভূমিকা রাখা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে পড়ুন: নিকসেন: কিছু না করার গুরুত্ব!