অসাধারণ সাধারণেরা

কী ঘটতে পারত তা মেয়েটির তখনো বোধগম্য হয়নি


  • মীর্জা নাফিস হা-মীম   ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় |
  • প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৬, ২৩:১৪
 কী ঘটতে পারত তা মেয়েটির তখনো বোধগম্য হয়নি
ছবি: এআই

দিনটি ছিল কোনো এক শনিবার। মিরপুর যাওয়ার উদ্দেশ্যে মাস্টার দা সূর্যসেন হল থেকে বের হয়ে নিকটবর্তী শাহবাগ মেট্রো স্টেশনে একটু হন্তদন্ত হয়েই পৌঁছালাম। পৌঁছে দেখি স্টেশনে উপচে পড়া ভিড়। মেট্রো পাস কেনার কাউন্টারের সামনে এক বিশাল লাইন। ভিড়ের মধ্যে ফাইল হাতে একজনের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম আজ কোনো একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনেকের পরীক্ষাকেন্দ্র ছিল। কিছুক্ষণ আগে পরীক্ষা শেষ হয়েছে। এজন্যই স্টেশনে মানুষের এই ঢল। এরপর, ্যাপিড পাস সঙ্গে থাকায় লাইনে না দাঁড়িয়ে চলে গেলাম প্ল্যাটফর্মে।

কিঞ্চিৎ অপেক্ষার পর মেট্রো এল। শশব্যস্ত সবাই গেট খোলার সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড় করে ভেতরে ওঠার চেষ্টায় ব্যস্ত। আমিও এর ব্যতিক্রম ছিলাম না। বাইরে এখনো অনেকে বাকি। মেট্রোর ভেতরে আর এক ইঞ্চি জায়গা ফাঁকা আছে কি না, এই বিষয়টি নিয়ে একটি থিসিস করে ফেলা সম্ভব ছিল হয়তো। থিসিসের আগ্রহেই হয়তো ভেতরে জায়গা নেই দেখেও, সকলে ঠেলাঠেলি করে হলেও একটু পা রেখে দেখতে চাচ্ছিল মেট্রোর ভেতরে। কারো তর সয় না যে!

ঠিক এমন মুহূর্তে স্টেশনের মাইকে ঘোষণা এল, "অনুগ্রহ করে দরজা থেকে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়ান।" "Please stand clear of the doors."

এবার ভেতরে ঢুকতে চাওয়া মানুষদের সঙ্গে, মেট্রোর ভেতর দাঁড়িয়ে শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য হা-হুতাশ করতে থাকাদের ঠেলা-ধাক্কা প্রবলতর হয়ে উঠল।

ঠিক তখনই আমার সামনে থাকা অল্পবয়সী একজন তরুণী সেই ধাক্কায় তাল সামলাতে না পেরে পিছিয়ে আসতে গেলে, তার বাম পাটি পড়ে গেল মেট্রো এবং প্ল্যাটফর্মের মাঝে থাকা সরু জায়গাটুকুতে। মেট্রো চালু হতে আর কিছু সেকেন্ড বাকি। মানে হচ্ছে, ভয়ঙ্কর বিপদটা বুঝে ওঠার আগেই সবকিছু ঘটে চলেছে। মেট্রো চলতে শুরু করা মাত্র একজন জলজ্যান্ত মানুষ তার পা হারাবে। বরণ করে নেবে আমৃত্যু পঙ্গুত্ব। মৃত্যুর আশঙ্কাও ফেলে দেওয়ার মতো নয়। মেয়েটির মা পাশে। তিনি হাউমাউ করে কাঁদছেন। এর মধ্যেই কিছু মানুষ মোবাইলের ক্যামেরা বের করে সামাজিক কাজের প্রস্তুতিও সেরে ফেলছে।

আমার মনের মধ্যে কিছু একটা হলো। ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেলাম মেয়েটির কাছে। আশেপাশের সবকিছু বিচার-বিবেচনা ভুলে হাঁটু গেড়ে বসে আমার এক হাত রাখলাম মেয়েটির ঝুলন্ত পায়ের নিচে রেখে। শরীরের সমস্ত জোর খাটিয়ে দিলাম এক হেঁচকা টান। কীভাবে কী হলো জানি না। হেঁচকা টানে মেয়েটির পা সেই সরু ফাঁকা থেকে উঠে এল। সে একটি ভয়াবহ বিপদের হাত থেকে বেঁচে গেল।

তখন একটি অবর্ণনীয় স্বার্থকতার অনুভূতি দোলা দিল আমার মনে। মন তখন একটি ধন্যবাদের জন্য সাময়িক লোভী হয়ে উঠেছিল। মেয়েটি উঠে দাঁড়াল। পেছনে ঘুরে তাকাল না। ধন্যবাদ দিল না। সে নিচের দিকে তাকাল। অস্ফুট কণ্ঠে বলে উঠল, “স্যান্ডেল!” হ্যাঁ, তার পায়ের স্যান্ডেলটি ঠিক আছে। সে খুশি হল।

আমি নিশ্চিত কী ঘটেছিল এবং কী ঘটতে পারত তা মেয়েটির তখনো বোধগম্য হয়নি। বেচারা স্যান্ডেল খোয়া না যাওয়ায় খুশি! ততক্ষণে আমার ধন্যবাদের লোভটা কেটে গেছে। আমি ভিড়ের মধ্যে মিশে গেছি। পরোপকারের মানসিক তৃপ্তিটা পাচ্ছিলাম আমি। এখনো মেট্রোতে গেলে ঘটনাটা স্মরণ হয়। মনে মনে নিজেকে বলি, যদি আবার কাউকে বিপদে পড়তে দেখি, আবার সাহায্য করব, কিন্তু ধন্যবাদের লোভটা করব না। 


ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

         

  রেটিং: ৫

এই বিভাগের আরও পোস্ট

‘মৃত্যুদেবী’: স্নাইপার লুডমিলা পাভলিচেঙ্কো

‘মৃত্যুদেবী’: স্নাইপার লুডমিলা পাভলিচেঙ্কো

  • জীবনজয়ী ডেস্ক |
  •  ০৮-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

রোজা পার্কস: অসাধারণ এক সাধারণ মানুষ

রোজা পার্কস: অসাধারণ এক সাধারণ মানুষ

  • সুপ্তি রায়|
  •  ৩০-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

 আর্জেন্টিনা: প্লাজা দে মায়োর মায়েরা

আর্জেন্টিনা: প্লাজা দে মায়োর মায়েরা

  • নওসিন সাদিয়া|
  •  ১৫-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

অযোধ্যা: শহর-ই-আউলিয়া

অযোধ্যা: শহর-ই-আউলিয়া

  • স্বর্ণেন্দু দত্ত |
  •  ১০-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

ক্রিস্টোফার ম্যাকক্যান্ডলেস: নিঃশব্দে প্রকৃতির পথে

ক্রিস্টোফার ম্যাকক্যান্ডলেস: নিঃশব্দে প্রকৃতির পথে

  • জাওয়াহ বিনতে মিজান স্বর্ণা|
  •  ০৫-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

জীবনজয়ী জেন গুডঅল: প্রকৃতি, প্রাণী আর মানুষের সেতুবন্ধন

জীবনজয়ী জেন গুডঅল: প্রকৃতি, প্রাণী আর মানুষের সেতুবন্ধন

  • জাওয়াহ বিনতে মিজান স্বর্ণা|
  •  ২৫-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।