দ্য হাংরি ভয়েজার্স হলো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি খাবারদাবারের সাইট। ২০২৩ সালে এই সাইটের পক্ষ থেকে ২৫টি দেশ ঘুরে ২৮টি খাবারের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। দ্য হাংরি ভয়েজার্স টিমের বাছাই করা খাবারগুলো নিয়ে প্রথম পর্বটি পড়ুন নিচে।
কার্বোনাড ফ্লামান্ড (Carbonade Flamande) - বেলজিয়াম
ব্রাসেলসের পাথর বিছানো রাস্তায় হাঁটছিলাম। হঠাৎ চোখে পড়ল, নুইটনিগেন আউট নামের একটি রেস্তোরাঁ। তেমন জাঁকজমক নয়, ছোট রেস্তোরাঁই। রেস্তোরাঁয় ঢুকে বসতে বসতেই, ওয়েট্রেস বলল, তাদের এখানে রয়েছে পৃথিবীর সেরা খাবার, যার নাম “কার্বোনাড ফ্লামান্ড”। শুনে অবাক লাগল, কী বলছে এটা! পৃথিবীর সেরা খাবার!
এতটা আত্মবিশ্বাসী দাবি অগ্রাহ্য করা ঠিক হবে না। দেখা যাক, কী আছে এই খাবারে। কিছুক্ষণ পরে খাবার এল। নরম গরুর মাংস, তার উপরে ঘন, গাঢ়, সুগন্ধি সস। মুখে দেওয়ার পর মনে হলো, মাংসটা যেন চিবাতে হচ্ছে না, নিজ থেকেই গলে যাচ্ছে। এর সঙ্গে ছিল বেলজিয়ান বিটার। এটা অসাধারণ স্বাদের আরামদায়ক একটা খাবার ছিল।
প্যাড থাই (Pad Thai) - থাইল্যান্ড
আমরা আগে অনেক প্যাড থাই খেয়েছি। কিন্তু থাইল্যান্ডে গিয়ে প্যাড থাই খাওয়ার পরে মনে হলো, এতদিন কী খেয়েছি? চাল দিয়ে তৈরি নুডলস, তেঁতুলের টক-ঝাল সস, চিংড়ি বা টোফু দিয়ে বানানো খাবারটি ছিল একদম সতেজ এবং হালকা। সামান্য লেবুর রস ছিটিয়ে দেওয়ায় এর স্বাদ যেন কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এর সঙ্গে একটু বাদাম ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।
দুটি ভিন্ন রেস্তোরাঁয় অসাধারণ দুটি প্যাড থাই খেয়েছিলাম: থিপসামাই এবং প্যাড ফাই তা লু। দুটোই এত ভালো ছিল যে কোনটি সেরা, তা বলা কঠিন।
কার্বোনারা (Carbonara) - ইতালি
রোমে গিয়ে আমরা সেই জায়গার বিখ্যাত খাবারের খোঁজ করছিলাম। স্থানীয় একজন বললেন, “রোমের সবচেয়ে ভালো কার্বোনারা খেতে চাইলে আমার সঙ্গে আসুন।” আমরা তার পেছনে হাঁটতে লাগলাম। পৌঁছে দেখলাম, ছোট একটা ঘর মাত্র, দুটি টেবিল, একজন রাঁধুনি। আমরা কার্বোনারা অর্ডার করলাম।
কার্বোনারা হচ্ছে এক ধরনের পাস্তা। কার্বোনারাতে পাস্তার সঙ্গে পেকোরিনো বা পারমেজান চিজ এবং গুয়ানচিয়ালে বা প্যানচেটা দেওয়া হয়। কার্বোনারা সাধারণ উপকরণে তৈরি খাবার। কিন্তু খেতে গিয়ে মনে হলো, সাধারণ জিনিস কি অসাধারণ হতে পারে। কার্বোনারা ছিল ক্রিমের মতো মসৃণ।
হ্যাগিস (Haggis) - যুক্তরাজ্য
এডিনবার্গের সরু পাথরের গলি ধরে আমরা হাঁটছিলাম। ঠান্ডা বাতাস, আকাশে মেঘ। হাঁটতে হাঁটতে এক জায়গায় চোখে পড়ল আর্কেড বার হ্যাগিস অ্যান্ড হুইস্কি হাউস।
আমরা হ্যাগিস খেতে মনস্থ করি। হ্যাগিসের উপাদান ছিল ভেড়ার হৃদপিণ্ড, যকৃত আর ফুসফুস। সব কিছু ভেড়ার পাকস্থলীতে ভরে রান্না করা। উপকরণ শুনে অনেকেরই খাবারটির প্রতি ভালোবাসা জন্মানোর কথা নয়। কিন্তু খাওয়ার সময় ব্যাপারটা পুরো উল্টো। হ্যাগিস এক দুর্লভ স্বাদের খাবার। এর নিজস্ব স্বাদের সঙ্গে মাখনের মতো নরম আলু আর হুইস্কি সস বেশ ভালোভাবে মিশে গিয়েছিল।
ফো (Pho) - ভিয়েতনাম
ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ের অলিগলিতে পা রাখলেই চোখে পড়বে এক চেনা চিত্র: রাস্তার ধারের ছোট ছোট প্লাস্টিকের টুলে বসে মানুষ পরম তৃপ্তিতে ধোঁয়া ওঠা “ফো” খাচ্ছে। ভিয়েতনামের বাসিন্দাদের কাছে সকাল বা দুপুরের খাবার মানেই এই সুস্বাদু নুডলস স্যুপ।
মুরগি, হাঁস কিংবা মিটবল, কত রকমের ফো-ই যে আছে! রাস্তার পাশের ছোট ছোট দোকান, তারই সামনে দিয়ে সাঁই সাঁই করে ছুটে চলা শত শত মোটরসাইকেল। আর এর মাঝে বহু মানুষ খেয়ে চলেছে বিশাল একেক বাটি ফো। ধনেপাতা, বাসিল, পেঁয়াজকলি আর পাতলা নরম গরুর মাংসে ভরপুর সেই ঝোল। প্রতিটি চামচে টাটকা হার্বস আর গভীর স্বাদের মিশ্রণ বুঝিয়ে দেয় কেন এটি ভিয়েতনামের জাতীয় অহংকার।
আসাদো (Asado) - আর্জেন্টিনা
আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে গরুর মাংস বা বিফ নিছক কোনো খাবার নয়, বরং এটি একটি সংস্কৃতি। দেশটির যেকোনো প্রান্তে গেলেই বোঝা যায় তারা মাংসের রান্নার ব্যাপারে কতটা আবেগপ্রবণ। আর সেই আবেগের মুকুটহীন সম্রাট হলো “আসাদো”, খোলা আগুনের আঁচে ধীরে ধীরে পোড়ানো ঐতিহ্যবাহী বারবিকিউ।
আর্জেন্টিনায় আসাদো মানে শুধু খাওয়া-দাওয়া নয়, বরং ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রিয়জনদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সামাজিক উৎসব। বুয়েনস এইরেসের বিশ্বখ্যাত “ডন জুলিও” রেস্তোরাঁয় আসাদোর আসল স্বাদ নেওয়ার জন্য ভিড় জমায় শত শত মানুষ। মুখের ভেতর মিলিয়ে যাওয়ার মতো সেই মাংসের স্বাদ সহজে ভোলার নয়।
পো-তো-ফ্যু (Pot-au-Feu) - ফ্রান্স
ফরাসি রান্নার বিশ্বজোড়া খ্যাতির পেছনের জাদুকরী রূপটি প্যারিসে গিয়ে টের পাওয়া যায়। সেখানকার “লে রয় দু পো-তো-ফ্যু” রেস্তোরাঁয় ঐতিহ্যবাহী “পো-তো-ফ্যু” খাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল চমৎকার।
এটি মূলত দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে সেদ্ধ করা নরম মাংস, পেঁয়াজ ও আলু দিয়ে তৈরি একটি সমৃদ্ধ ও তৃপ্তিদায়ক ঝোল। মুচমুচে টোস্ট ও মোটা দানার লবণ দিয়ে হাড়ের ভেতর থেকে মজ্জা বের করে টোস্টে মাখাতে হয়, আর ওপর থেকে ছিটিয়ে নিতে হয় সেই লবণ। হাড়ের মজ্জার সেই নোনতা ও মাখনের মতো ঝোলের সঙ্গে মিশে তৈরি হয় এক স্বর্গীয় স্বাদ।
পেপিয়ান (Pepian) - গুয়াতেমালা
গুয়াতেমালার স্থানীয় খাবার মানুষকে ধারণার চেয়েও অনেক বেশি মুগ্ধ করে। প্রতিটি পদের পেছনে যে কী পরিমাণ যত্ন আর মশলার নিখুঁত হিসাব থাকে, তা না খেলে বিশ্বাস করা কঠিন।
মাটির বড় পাত্রে করে পরিবেশন করা এই ঘন স্ট্যুতে থাকে টমেটো, মরিচ, পেঁয়াজ এবং নানা গোপন মশলার চমৎকার মিশ্রণ, যার সঙ্গে যোগ করা হয় সেদ্ধ করা নরম চিকেন আর প্ল্যানটেইন বা কাঁচাকলা। ঝোলের ভেতরে মশলার সেই গভীরতা আর মাটির সোঁদা গন্ধ পুরো খাবারে এক দারুণ ঐতিহ্যবাহী আবহ তৈরি করে। ঝাল, মশলা আর স্বাদের এমন মেলবন্ধন সত্যিই অতুলনীয়।
এখানে পড়ুন: ইয়র্কশায়ার পুডিং
এখানে পড়ুন: কলার মোচার ঘন্ট ও বড়া