বলিউডের সিনেমায় যখনই কোনো নায়কের এন্ট্রি হয়, সাধারণত ব্যাকগ্রাউন্ডে ধুমধাড়াক্কা মিউজিক বাজে, চড়া সংলাপে কেঁপে ওঠে প্রেক্ষাগৃহ, আর পর্দাজুড়ে নায়কের পেশিশক্তি কিংবা আবেগের এক বিশাল বিস্ফোরণ ঘটে। এই চেনা ফর্মুলার বাইরে এমন একজন ছিলেন, যিনি স্রেফ চোখের ইশারায় আর গভীর নীরবতা দিয়ে পুরো প্রেক্ষাগৃহ স্তব্ধ করে দিতে পারতেন। তিনি ইরফান খান।
চলুন যাওয়া যাক ১৯৬৭ সালে রাজস্থানের জয়পুরে। এক সাধারণ টায়ার বিক্রেতার ঘরে জন্ম হয় সাহাবজাদে ইরফান আলী খানের। শৈশবে ক্রিকেটের বাইশ গজে ঝড় তোলার স্বপ্ন দেখলেও, শেষমেশ তিনি গেলেন নয়াদিল্লির বিখ্যাত ‘ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা’ বা এনএসডি-তে। সেখানে পড়াশোনা শেষ করে অনুমেয়ভাবে মুম্বাই গেলেন। লক্ষ্য বলিউড। রূপালি পর্দার দুনিয়ায় নিজের জায়গা পাকা করাটা ইরফান খানের মোটেও সহজ ছিল না। ১৯৮৮ সালে মীরা নায়ারের ‘সালাম বোম্বে!’ ছবিতে একজন সাধারণ চিঠি লেখকের এক ফালি চরিত্রে সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। সেই সামান্য চরিত্রের জোরে হিন্দি সিনেমার বিশাল বাজারে তার ক্যারিয়ারের চাকা ঘোরেনি। দীর্ঘ সময় ধরে তাকে লড়াই করে যেতে হয়েছে।
চমকটি এল ২০০২ সালে, একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবে। তখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ অপরিচিত এক ব্রিটিশ পরিচালক আসিফ কাপাদিয়া তার কম বাজেটের সিনেমা ‘দ্য ওয়ারিয়র’-এর মূল চরিত্রে কাস্ট করলেন ইরফানকে। সামুরাই ঘরানার এই দুর্দান্ত ভারতীয় গল্পটি মুক্তি পাওয়ার পরই বাজিমাত করল। এটি যেমন মর্যাদাপূর্ণ ‘সান সেবাস্তিয়ান চলচ্চিত্র উৎসব’-এ জায়গা করে নিল, তেমনই সেরা ব্রিটিশ চলচ্চিত্র হিসেবে জিতে নিল বিখ্যাত ‘বাফটা’ পুরস্কার। এবার বলিউডের মূলধারার সিনেমাওয়ালাদের চোখ পড়ে ইরফানের ওপর। শুরুতে অবশ্য তাকে পুলিশ বা খলনায়কের চেনা ছকেই ব্যবহার করা হচ্ছিল, যার অন্যতম উদাহরণ মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডের পটভূমিতে নির্মিত শেকসপিয়রের ম্যাকবেথের রূপান্তর— ‘মকবুল’।
এরপর ‘রোগ’ কিংবা নাগরিক জীবনের সুরে গাঁথা ‘লাইফ ইন এ... মেট্রো’র মতো সিনেমাগুলোতেও তিনি নিজের অভিনয়শৈলী দেখিয়েছেন। তবে এই চেনা ছকের বাইরে গিয়ে রিতেশ বাত্রার ‘দ্য লাঞ্চবক্স’ সিনেমায় একাকী এক হিসাবরক্ষকের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি বক্স অফিসে যে আলোড়ন তৈরি করেছিলেন, তা ভোলা কঠিন। যেখানে এক অসুখী গৃহবধূর সঙ্গে স্রেফ চিঠির আদান-প্রদানে গড়ে উঠেছিল তার এক অদ্ভুত ও মায়াবী প্রেমের গল্প।
হিন্দি সিনেমায় শুরু থেকে চড়া দাগের আবেগ আর অভিনয়ের প্রাবল্য। ইরফান খান এসে চেনা ব্যাকরণমাফিক গেলেন না। বেশিরভাগ তারকা পর্দায় চিৎকার করে কিংবা অতিমানবীয় পৌরুষ দেখিয়ে হাততালি কুড়ান। আর ইরফানের মূল অস্ত্র নীরবতা, চরম সংযম আর এক ধরনের রহস্যময়তা। তিনি মানুষের মনের ভেতরের জটিল মনস্তত্ত্বকে আড়াল করতেন না। সেসব ফুটে উঠত তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজে। ‘মকবুল’ থেকে শুরু করে ‘দ্য লাঞ্চবক্স’, ‘পিকু’ কিংবা ‘লাইফ অব পাই’— প্রতিটি সিনেমায় তিনি নিজের আবেগকে উগরে দেওয়ার চেয়ে তা ধরে রাখার এবং আড়াল করার কৌশলের ওপর বেশি জোর দিয়েছিলেন। তার এই শান্ত ভঙ্গিই বলিউডের চটকদার প্রদর্শনী আর পশ্চিমা বিশ্বের গৎবাঁধা প্রত্যাশাকে এক তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছিল।
বিশাল ভরদ্বাজের ‘হায়দার’ সিনেমার সেই দৃশ্যটার কথা বলি।
বরফে ঢাকা কাশ্মীরের ধবধবে সাদা ল্যান্ডস্কেপের ভেতর থেকে হেঁটে আসছেন ইরফানের ‘রুহদার’ চরিত্রটি। চোখে সানগ্লাস, মুখ দিয়ে একটিও সংলাপ বেরোচ্ছে না, শুধু চোখের চশমা থেকে আলতো করে বরফটুকু মুছে নিলেন আর স্রেফ নিজের উপস্থিতি দিয়ে পুরো দৃশ্যটার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নিলেন। এই একটি দৃশ্যই কিন্তু প্রমাণ করে যে ইরফান খান আসলে সিনেমার পর্দায় কী অদ্ভুত জাদু নিয়ে হাজির হতেন।
তিন দশকের ক্যারিয়ারে তিনি নীরবতাকেই তার অভিনয়ের সিগনেচার স্টাইল বানিয়ে তুলেছিলেন। মীরা নায়ারের ‘সালাম বোম্বে!’ ছবির সেই ছোট চরিত্রটি থেকেই এর শুরু, যেখানে কোনো বাড়তি মেলোড্রামা ছাড়াই ফুটপাতের এক জীবনের অনিশ্চয়তাকে তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন। আসিফ কাপাদিয়ার ‘দ্য ওয়ারিয়র’-এ এই সংযম আরও গভীর হয়, যেখানে তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন তার জীবনের সমস্ত সহিংসতা আর ক্লান্তির এক জ্যান্ত প্রতীক।
এই সংযমের পরম প্রকাশ আমরা দেখতে পাই বিশাল ভরদ্বাজের শেকসপিয়রের রূপান্তরগুলোতে। ‘মকবুল’-এ ইরফান প্রচলিত ম্যাকবেথের মতো নাটকীয় অভিনয় না করে চরিত্রটিকে এক ভেতরের দ্বন্দ্বের ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন। এক দশক পর ‘হায়দার’-এর ‘রুহদার’ চরিত্রেও তিনি এই নিস্তব্ধতাকেই এক মস্ত বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন।
সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার হলো, এই গভীর অন্তর্মুখী অভিনয়শৈলী যখন মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমায় গেল, তখনও এর ধার একটুও কমেনি। ‘পান সিং তোমার’ সিনেমায় তিনি স্পোর্টস বায়োপিকের চেনা বিজয়ের গল্পকে একপাশে সরিয়ে, রাষ্ট্রীয় অবহেলা আর জাতিগত রাজনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট এক মানুষের রূঢ় বাস্তবতাকে পর্দায় জীবন্ত করেন। আবার ‘দ্য লাঞ্চবক্স’-এ ফার্নান্দেসের চরিত্রে তিনি জমিয়ে রাখা আবেগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেন, যেখানে ভালোবাসা কোনো নাটকীয় ঘোষণা বা মহামিলনের দৃশ্যে নয়, বরং নীরবতা আর অপূর্ণতার মাঝেই ডালপালা মেলেছিল। এমনকি ‘পিকু’ বা ‘কারিব কারিব সিঙ্গল’-এর মতো হালকা রোমান্টিক ছবিতেও তিনি সস্তা রোমান্সের লোভ সামলেছেন। তার চরিত্রগুলো আবেগহীন ছিল না, বরং ছিল শান্ত ও গভীর, যা হিন্দি সিনেমা সাধারণত এড়িয়ে চলে।
‘লাইফ অব পাই’, ‘নিউ ইয়র্ক, আই লাভ ইউ’ কিংবা ‘পাজল’-এর মতো সিনেমার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্তরে খ্যাতি পাওয়ার পরও ইরফান নিজেকে কখনো কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে বেঁধে ফেলেননি। তিনি বলিউডের অতিশয়োক্তি এবং ওয়েস্টার্ন স্টেরিওটাইপ— দুই পক্ষের ফর্মুলাকেই বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের অভিনয়ের মৌলিক ভাষা ধরে রেখেছিলেন। ভিন্ন ভিন্ন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ও ঘরানার চলচ্চিত্রে কাজ করলেও ইরফান খান আসলে একটিমাত্র নান্দনিক সমস্যার সমাধান খুঁজেছেন: কীভাবে মানুষের ভেতরের জীবনকে আঘাত না করে তা পর্দার সামনে দৃশ্যমান করা যায়। আর এই খোঁজের মধ্য দিয়েই তিনি ভারতীয় সিনেমাকে স্রেফ ‘অভিনয় প্রদর্শন’ থেকে ‘অভিনয়ের অন্তর্দৃষ্টি’র দিকে নিয়ে গেছেন।