ক্যাম্পাস

এর আগে আমার নিরক্ষর মৎস্যজীবী বাবাকে কেউ "বাবু" ডাকেনি


  • ইন্দ্রজিৎ বিশ্বাস  |
  • প্রকাশ : ৩০ মে ২০২৬, ০০:৪৩
এর আগে আমার নিরক্ষর মৎস্যজীবী বাবাকে কেউ "বাবু" ডাকেনি
ছবি: এআই

কিছু কিছু ঘটনা মানুষের জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। আমার জীবনেও তেমন একটি ঘটনা ঘটেছিল ২০১৮ সালে, যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাই। এই অর্জন শুধু আমার জীবনই বদলে দেয়নি, বদলে দিয়েছিল আমার পরিবার ও আশপাশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও। দুঃখের চেয়ে সুখের পরিমাণ যেন হঠাৎ করেই বেড়ে গিয়েছিল।

২১ সেপ্টেম্বর ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিই। ফল প্রকাশিত হয় ২৪ সেপ্টেম্বর। আমি ১৪৫তম মেধাস্থান অর্জন করি। সেদিনের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমার মা-বাবা আনন্দে কেঁদেছিলেন। বাবা মাটিতে গড়াগড়ি করে কেঁদেছিলেন। অথচ এই মানুষটিই একসময় আমার কোচিংয়ের খরচ জোগাড় করতে অন্যের কাছে টাকা ধার চেয়েও অপমানিত হয়েছিলেন। গরিব বলে কেউ তাকে টাকা ধার দেয়নি।

আমি একজন নিম্নবিত্ত মৎস্যজীবী পরিবারের সন্তান। আমাদের বাড়ি নড়াইলের এক গ্রামে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পর আমাদের পরিবারে যেন নতুন আলো আসে। গ্রামের মানুষ আমাকে দেখতে ও কথা বলতে বাড়িতে আসত। সবাই প্রশংসা করত। আমার মা এসব খুব একটা বুঝতেন না, কারণ তিনি কোনোদিন স্কুলে যাননি। শুধু এটুকু বুঝতেন—তার ছেলে ঢাকায় পড়ার সুযোগ পেয়েছে।

মায়ের সেই আনন্দের পেছনে ছিল অনেক কষ্টের স্মৃতি। ২০১৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় আমি ফেল করেছিলাম। আমাদের গ্রামের ১৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে একমাত্র আমিই অকৃতকার্য হয়েছিলাম। তখন কিছু মানুষ বাজে কথা বলেছিল। তখন আমার মা কেঁদেছিলেন অপমানে ও কষ্টে। সেদিনই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, একদিন মায়ের মুখে হাসি ফোটাব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়ার পর মায়ের কান্না ছিল আনন্দের কান্না। সন্তানের সাফল্যের কান্না।

এরপর গ্রামের ছোট ভাইবোনরা আমার কাছে পড়াশোনার পরামর্শ নিতে আসতে শুরু করে। আমি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করতাম কীভাবে উচ্চশিক্ষার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। এতে আমি ভীষণ আনন্দ পেতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হওয়ার আগে প্রায় তিন মাস সময় পেয়েছিলাম। এই সময়ে জেলার বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে ছোট ছোট সেমিনার করেছি। সবার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে তখন দারুণ ভালো লাগত।

একবার মামাবাড়ি বেড়াতে গিয়ে নতুন এক অভিজ্ঞতা হয়েছিল। গ্রামের অনেক মানুষ আমাকে আগে থেকেই চিনত। মামাবাড়ির লোকজন এত প্রশংসা করেছিল যে, যারা কখনো আমাকে দেখেনি তারাও আমাকে চিনে ফেলেছিল। রাস্তায় দেখলেই বলত, “এই নাকি তোমার সেই ভাগনে?” তাদের গর্ব আমাকে ভীষণ আনন্দ দিয়েছিল।

আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই। ২০১৯ সালের ৪ জানুয়ারি ক্যাম্পাসে আসি এবং জগন্নাথ হলে সিট পাই। এখানে এসে সমমনা অনেক বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ আমাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। ক্যাম্পাসে ঘুরতে গিয়ে অনেক বিখ্যাত মানুষের দেখা পেয়েছি, যাদের আগে শুধু টেলিভিশনের পর্দায় দেখতাম। তাদের কারও কারও সঙ্গে ছবিও তুলেছি।

দ্বিতীয় বর্ষে থাকাকালে করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। সবাই বাড়ি ফিরে যায়, আমিও যাই। সেই সময়ে বন্ধুদের নিয়ে এলাকায় সচেতনতামূলক কাজ করেছি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে করোনা সম্পর্কে সচেতন করেছি, ছোট ছোট সেমিনার করেছি। তখন বুঝেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতি মানুষের কতটা আস্থা ও ভালোবাসা রয়েছে।

আমাদের এলাকায় ‘ORCD’ নামে একটি উন্নয়ন সংস্থা আছে, যা প্রতিষ্ঠা করেছেন অস্ট্রেলিয়ার ‘Swinburne University of Technology’-এর অধ্যাপক মো. আমিরুল ইসলাম। আমি সেই সংগঠনের সঙ্গে কাজ করতাম। একদিন আমরা রাস্তার পাশে বৃক্ষরোপণ করছিলাম। তখন আমিরুল ইসলাম স্যার সবার পরিচয় জানতে চাইছিলেন। আমার পরিচয় শুনে তিনি বললেন, “তুমি গোবিন্দ বাবুর ছেলে!”

এই একটি বাক্য আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অনুভূতি হয়ে আছে। আমার নিরক্ষর মৎস্যজীবী বাবাকে কেউ কোনোদিন ‘বাবু’ বলে সম্বোধন করেনি। একজন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের মুখে বাবার জন্য সেই সম্মানসূচক সম্বোধন শুনে বুক গর্বে ভরে উঠেছিল। তখন মনে হয়েছিল, আমি পেরেছি—আমি আমার বাবা-মায়ের সম্মানের কারণ হতে পেরেছি।

ছোটবেলা থেকেই টিউশন করিয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছি। পরিবারের ছয়জন সদস্যের ভরণপোষণ সামলে বাবার পক্ষে আমার পড়ার খরচ বহন করা সম্ভব ছিল না। তাই নিজের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয়েছে। সবসময় স্বপ্ন দেখতাম, একদিন বড় কিছু করব এবং বাবা-মায়ের গর্বের কারণ হব। আজ যখন দেখি মানুষ বাবাকে সম্মান করে, সুন্দরভাবে কথা বলে, তখন মনে হয় আমার পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। এমনকি গ্রামের মন্দির কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্বও বাবাকে দেওয়া হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পর আমাদের পরিবারের সামাজিক মর্যাদাও অনেক বেড়ে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে অনেক সুন্দর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি সংগঠনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এতে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও নেতৃত্বদানের দক্ষতা বেড়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেছি, যা আমাকে আরও আত্মবিশ্বাসী করেছে। বিভিন্ন শিক্ষা সফরে অংশ নিয়ে যেমন আনন্দ পেয়েছি, তেমনি জ্ঞানও অর্জন করেছি।

তবে এই জীবনে কষ্টও ছিল। আর্থিক সংকট সবসময় সঙ্গী ছিল। টিউশন করিয়ে নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি বাড়িতেও টাকা পাঠাতে হতো। ফলে অনেক সুন্দর বিকেল হারিয়ে গেছে। বন্ধুরা যখন আড্ডা দিতে বা ঘুরতে যেত, তখন আমাকে বলতে হতো, “তোরা যা, আমার টিউশন আছে।” অনেক সময় টাকার অভাবে বন্ধুদের সঙ্গে ট্যুরেও যেতে পারিনি। তখন খুব খারাপ লাগত।

এভাবেই আনন্দ, সংগ্রাম, স্বপ্ন আর ত্যাগের মধ্য দিয়ে কেটে গেছে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পাঁচটি বছর।


ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

         

  রেটিং: ৪.৪

এই বিভাগের আরও পোস্ট

বাইরে ঝুম বৃষ্টি, হাতে গরম কফির মগ, আর রুমমেটরা মিলে গল্প

বাইরে ঝুম বৃষ্টি, হাতে গরম কফির মগ, আর রুমমেটরা মিলে গল্প

  • জাওয়াহ বিনতে মিজান স্বর্ণা|
  •  ২২-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

৫

ঢাবিতে সোনাঝরা দিনগুলি

ঢাবিতে সোনাঝরা দিনগুলি

  • ঐশী কর্মকার|
  •  ০৭-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

৫

আমাদের নন-স্টপ আড্ডার বিশ্ববিদ্যালয়

আমাদের নন-স্টপ আড্ডার বিশ্ববিদ্যালয়

  • চিররঞ্জন সরকার|
  •  ২৪-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

৪.৫

ফিরে দেখা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ফিরে দেখা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

  • মো. মিজানুর রহমান |
  •  ১৮-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

২

এইসব রঙিন দিন কিছুদিন পর স্মৃতি হয়ে যাবে

এইসব রঙিন দিন কিছুদিন পর স্মৃতি হয়ে যাবে

  • সুপ্তি রায় |
  •  ১৮-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

৪.৭

আড়াই দশক পরে উচ্চশিক্ষায় ফেরা

আড়াই দশক পরে উচ্চশিক্ষায় ফেরা

  • শাহানা বেগম|
  •  ১০-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

৫